Published on
:
3 min read
হিলকার্ট রোড ধরে হেলতে-দুলতে যাচ্ছে একটা টয় ট্রেন। লাইনের দু’ধারে অর্জুন, দেবদারু — সবুজে ছেয়ে আছে চারদিক। দূরে চা বাগানের রেখা। পিছনে পাহাড়। স্টিম ইঞ্জিন থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আর কামরার ভিতরে তখন হুল্লোড় চলছে। জোরে ঢাক বাজছে। পোটো পাড়া থেকে দুর্গাঠাকুর নিয়ে আসছে কয়েক জন যুবক। টাউন স্টেশনের পুজোয় ট্রেনে করে জগজ্জননীকে নিয়ে আসার সেই গল্প বলতে বলতে যেন ছোটবেলায় ফিরে গেলেন মাখনলাল সরকার — যিনি নিজেই আস্ত ইতিহাস। ১৯৫২-য় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক কাশ্মীর যাত্রার সঙ্গী ছিলেন। গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন মাখনলাল, যে কথা ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দেয় তাঁর।
বাঙালি কী ‘হইয়াছেন’, তা তো চোখের সামনে জলজ্যান্ত দেখা যাচ্ছে। ‘কী ছিলেন’ তা জানতে পিছনের দিকে তাকাতেই হবে। শিলিগুড়ির দাগা পাড়ার বাড়িতে জীবন-উপেক্ষার তাক থেকে বিস্মৃতির ধুলো ঝেড়ে সেই সব মণি-মানিক্যের ঝাঁপি খুলে বসলেন ৯৭ বছরের মাখনলাল।
পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। চোখে মেরুন ফ্রেমের চশমা। তবে বয়সের ভারে নুয়ে পড়েননি। স্মৃতি যেন টাট্টু ঘোড়ার মতোই টগবগ করে ছুটছে। শৈশব কেটেছে বাংলাদেশের কুমিল্লায়। দেশের বাড়িতে পুজো হতো। সেটা ইংরেজ আমল। কুমিল্লার পুজোর স্মৃতি প্রথম প্রেমের মতো, এখনও অমলিন। তার পরে শিলিগুড়িতে। টাউন স্টেশনের পুজো তাঁর যৌবনের উপবন — এ বারই প্রথম তাঁর দল বিজেপির জমানায় দুর্গাপুজো কাটাবেন তিনি।
এ বার প্রথম কলকাতাতেও পুজো উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন মাখনলাল। বালিগঞ্জ আর ঢাকুরিয়ায়। প্রবীণ বিজেপি নেতাকে পুজো উদ্বোধনে নিয়ে আসা প্রসঙ্গে বালিগঞ্জ ঐক্য সম্মিলনির অন্যতম উদ্যোক্তা বিজয় মজুমদার এই সময় অনলাইনকে বললেন, ‘শ্যামাপ্রসাদের মতো একজন মহান মানুষের সঙ্গী ছিলেন মাখললাল সরকার। সেটা জানার পরে ঠিক করি উনিই এ বার আমাদের পুজোর উদ্বোধন করবেন।’
পুজোর সময়ে কোথায় থাকবেন? প্রশ্ন শুনে শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গীর মুখে হাসি, ‘গাইঘাটায় মেয়ের বাড়ি। পুজোর ক’টা দিন ওখানেই কাটাব।’ নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়ে সুখের মুহূর্ত আর কী হতে পারে!
শ্যামাপ্রসাদের পাড়া ভবানীপুর। সেখানকার ভবানীপুর সর্বজনীন দুর্গোৎসবের কথা কে না জানে। তবে সেই পুজোর সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের কোনও যোগ ছিল কি না, মনে করতে পারলেন না মাখনলাল। কিছুটা ভেবে নিয়ে বললেন, ‘দুর্গাপুজো নিয়ে শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে কোনও দিন কথা হয়নি। আমাদের যা আলোচনা হতো, মূলত রাজনৈতিক বিষয়ে, সংগঠন নিয়ে।’
তখন দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে। একদিকে চরম দারিদ্র, অন্য দিকে, নতুন ভারত গড়ে তোলার কাজ। আক্ষরিক অর্থেই যেন ‘প্রিয়, ফুল খেলিবার দিন নয় অদ্য।’ ১৯৪৫ থেকে আরএসএস-এর সঙ্গে যুক্ত মাখনলাল। ১৯৮০-তে বিজেপির জন্ম। পশ্চিম দিনাজপুর (অধুনা ভেঙে উত্তর এবং দক্ষিণ দিনাজপুর), জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিং সাংগঠনিক সমন্বয়কারী হন তিনি। ১৯৮১-র পরে টানা সাত বছর জেলা সভাপতি ছিলেন। বহু ‘আকাঙ্খিত’ বঙ্গ জয়ের পরে শুভেন্দু অধিকারীদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে এই মাখনলালের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বিজেপি সরকারের প্রথম পাঁচ মাস নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট। দৃঢ় গলায় মাখনলাল বললেন, ‘সকলেই নিজের পরিসরে ভালো কাজ করছেন।’ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুকে বেকারি দূরীকরণে জোর দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।
অশক্ত শরীরেও মাখনলাল ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে প্রাতঃভ্রমণে যান। খাওয়াদাওয়া সব মাপা। লাল চা ছাড়া আর কিছু ছুয়ে দেখেন না তখন। সকালের দিকে দুধ-রুটি অথবা ছাতু খান। নিয়ম করে দুপুর দেড়টায় মধ্যাহ্নভোজ সেরে নেন। বাড়িতে যা হয়, সেটাই তাঁর আহার। রাতে খেয়েদেয়ে সাড়ে ৯টার মধ্যে বিছানায়। তবে বিরাট কোহলিদের ম্যাচ থাকলে রুটিন ভাঙে। ক্রিকেট তাঁর সবচেয়ে প্রিয়।
আগে রেডিয়োয় মহালয়া শুনতেন। স্বপ্নালু চোখে মাখনলাল বললেন, ‘সে এক দিন ছিল। এখন টিভিতেই মহালয়া দেখি।’ এখন দুই ছেলে মানিক ও সানি, দুই পুত্রবধূ তুলি ও জয়িতা। বাবার প্রসঙ্গে ছেলে মানিক সরকার বলেন, ‘আমার বাবা আদর্শবাদী লোক। তাঁর জন্য গর্ব হয়।’
তিন নাতনি রাজন্যা, অর্নিভি ও স্বর্ণভির সঙ্গেই সবথেকে বেশি সময় কেটে যায় মাখনলালের। নাতি-নাতনিদের সঙ্গে তিনি আর খেলতে পারেন না। তবে গল্প করেন। পুরোনো সেই দিনের গল্প। টাউন স্টেশনের দুর্গাপুজোর গল্প, ‘তার পরে বুঝলি, ট্রেনে চেপে দুগ্গাঠাকুর এলেন। আমরা সবাই...।’
