মোঃ অলি উদ্দিন মিলন, বিশেষ প্রতিনিধি:
চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নতুন করে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর অঞ্চলটিতে তীব্র যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংঘটিত এই হামলায় বেসামরিক হতাহতের পাশাপাশি কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশী সদস্য নিহত ও-আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সৌদি কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য আকাশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোতে বিমান চলাচল স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে, যা বৈশ্বিক যোগাযোগ ও রেমিট্যান্সনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
গত কয়েকদিন ধরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যবর্তী সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ আকাশসীমায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। সর্বশেষ হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দাম্মামের ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
বেসামরিক প্রাণহানি ও আঘাত: বিমানবন্দর টার্মিনালে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্র মতে, ঘটনায় হতাহতদের মধ্যে বাংলাদেশী প্রবাসী কর্মী ও অন্যান্য দেশের নাগরিকরা রয়েছেন।
আকাশপথ অবরুদ্ধ: নিরাপত্তার চরম ঝুঁকির কারণে ফ্লাইটরাডার এবং সৌদি সিভিল এভিয়েশন কতৃপক্ষ রিয়াদ ও আশপাশের বিমানবন্দরগুলোর ফ্লাইট অপারেশন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। বিশ্বজুড়ে শত শত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে।
যুদ্ধ / সংঘাত অঞ্চলবর্তমান পরিস্থিতি ও প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্য (সৌদি-হুথি ও আঞ্চলিক সংকট)লোহিত সাগর ও বাব এল-মানদেব প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত এবং বিমানবন্দরে ড্রোন-মিসাইল হামলা।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধদীর্ঘদিন ধরে চলমান এই যুদ্ধে বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য পণ্যের শৃঙ্খলে ধারাবাহিক স্থবিরতা।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলতাইওয়ান প্রণালী ও দক্ষিণ চীন সাগরে পরাশক্তিগুলোর সামরিক বলয় বৃদ্ধির কারণে উত্তেজনা অব্যাহত।
সৌদি আরব বাংলাদেশের একক বৃহত্তম শ্রমবাজার এবং বৈদেশিক মুদ্রার (রেমিট্যান্স) অন্যতম প্রধান উৎস। সেখানে সংঘাত প্রসারিত হওয়ায় বাংলাদেশে বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে:
রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় আঘাত
সৌদি আরবে প্রায় ৩০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশী কর্মরত। ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকা এবং কর্মক্ষেত্রগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলের প্রভাব বাড়তে পারে এবং দেশে বৈধ্য পথে রেমিট্যান্স আসার গতি মন্থর হতে পারে।
জনশক্তি রপ্তানি ও শ্রমবাজার স্থবিরতা
প্রতি মাসে বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কর্মী কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। আকাশপথ বন্ধ এবং সামরিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে নতুন ভিসা পাওয়া এবং ভিসা পেয়েও যাত্রা না করতে পারার কারণে বড় ধরনের ভিসা জটিলতা ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বেন প্রবাসপ্রত্যাশীরা।
সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। সংঘাতের কারণে তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের বাজার ও সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে
সৌদি আকাশপথ বন্ধ থাকার কারণে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে চলাচলকারী বিমানগুলোকে বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে বিমানের জ্বালানি খরচ ও বিমান ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, যা সাধারণ যাত্রী এবং কার্গো পরিবহনের ওপর প্রভাব ফেলবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে দ্রুত কৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে:
প্রবাসীদের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা: সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসকে জরুরি কন্ট্রোল রুম খুলে আহত ও ঝুঁকিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
বিকল্প জ্বালানি উৎস সন্ধান: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আগাম বিকল্প বাজার ও সঞ্চয় বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
কূটনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা: মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক জোট বা সংঘাতে সরাসরি না জড়িয়ে আন্তর্জাতিকভাবে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে অবস্থান বজায় রাখা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের এই নতুন মাত্রা শুধু একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, এটি পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি মোকাবিলার একমাত্র পথ হলো দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আগাম প্রস্তুতি।
এ জাতীয় আরো খবর..
