Published on
:
2 min read
প্রশান্ত ঘোষ, ভাঙড়: জমিদারি নেই। নেই সেই প্রতিপত্তি, নেই পাইক-বরকন্দাজের আনাগোনা। কোথাও ভেঙে পড়েছে পুরোনো বাড়ির পলেস্তারা, কোথাও বদলে গিয়েছে নদীর গতিপথ, মুছে গিয়েছে জঙ্গলের স্মৃতি। তবু সময়ের স্রোত থামাতে পারেনি দুর্গাপুজো। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই পুজোই হয়ে উঠেছে ভাঙড়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সম্প্রীতির জীবন্ত দলিল। ভাঙড়ের নাওরা সরকারবাড়ি এবং স্বস্ত্যয়নগাছির মজুমদার বাড়ির দুর্গোৎসব তাই কয়েক শতাব্দীর স্মৃতিকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার গল্প।
প্রায় তিনশো বছর আগে হুগলির জমিদার বিহারীলাল সরকার ভাঙড়–১ ব্লকের নাওরা গ্রামে বসতি গড়েছিলেন। কথিত আছে, তৎকালীন জেলা জজ বিহারীলাল স্বপ্নে বিদ্যাধরী নদীর জলে মা দুর্গাকে দেখেছিলেন। সেই থেকেই শুরু সরকার বাড়ির দুর্গোৎসব। তখন ভাঙড় ছিল জঙ্গলঘেরা, সুন্দরবনের বিস্তৃত এলাকার অংশ। বিদ্যাধরী নদীও বয়ে যেত অন্য পথে। সেই সময়ের স্মৃতি আজও পুজোর রীতিতে স্পষ্ট। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের গরান কাঠ ছাড়া সরকার বাড়ির প্রতিমার কাঠামো তৈরি হয় না। মহালয়ায় নয়, ষষ্ঠীর দিনেই হয় দেবীর চক্ষুদান। অষ্টমীতে পাড়ার নারায়ণী মন্দিরে ঢাক বাজিয়ে পুজো দিতে যান সকলে। দশমীতে কালো কচু, আতপ চাল ও নারকেল বাটার বিশেষ নিবেদন। নেই পশুবলি, রয়েছে চালকুমড়ো ও আখ বলির রীতি।
ভাঙড়–২ ব্লকের স্বস্ত্যয়নগাছির মজুমদার বাড়ির পুজোর সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে জমিদারি আমলের স্মৃতি। প্রায় দুশো বছরের পুরোনো এই পুজোর সাক্ষী ভগ্নপ্রায় জমিদার বাড়ি। একসময়ে পুব, পশ্চিম ও দক্ষিণ—তিন মহলজুড়ে ছিল বিশাল দ্বিতল বাড়ি। আজ একটি মহলের অস্তিত্বই নেই। বাকি অংশটুকুও কালের ক্ষত বয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জমিদারি নেই, অধিকাংশ পরিবারের সদস্যও কর্মসূত্রে ছড়িয়ে পড়েছেন দেশ-বিদেশে। এই পুজোর সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্প্রীতি। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ভাঙড়ে মজুমদারবাড়ির দুর্গোৎসবে হিন্দুদের পাশাপাশি সমান উৎসাহে অংশ নেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। পুজোর আয়োজন থেকে শুরু করে নানা কাজে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকেন তাঁরা। অষ্টমীর দিন একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়ার ছবি আজও এই পুজোর অন্যতম আবেগের মুহূর্ত। ধর্মের বিভাজনের বদলে এখানে উৎসবই হয়ে ওঠে মিলনের সেতু।
দুই বাড়ির পুজোর জৌলুস হয়তো আগের মতো নেই। নেই জমিদারি আভিজাত্য, নেই বিপুল আয়োজন। কিন্তু মানুষের টান, বিশ্বাস আর ঐতিহ্যের জায়গায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। সরকার বাড়ির গরান কাঠের কাঠামো আর মজুমদার বাড়ির ভগ্নপ্রায় জমিদারবাড়ি—দুটিই যেন ভাঙড়ের হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মারক। আর সেই স্মৃতির বুকেই প্রতি শরতে নতুন করে জেগে ওঠেন মা দুর্গা।
