উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় নিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে একটি মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ ইউক্রেনের অবস্থান শনাক্ত করতে বাংলাদেশিদের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো বলে জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। চক্রটির মাধ্যমে রাশিয়ায় যাওয়া প্রায় ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। আহত অবস্থায় দুজন দেশে ফিরেছেন। আরও দুজন রাশিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ছয়জন এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন। এ ঘটনায় চক্রের হোতা মিজানুর রহমান ও তার সহযোগী মো. আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি।
গতকাল সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান।
এসআরবি কর্মকর্তারা জানান, ভুক্তভোগী রাজন হোসেনকে নির্মাণকাজে চাকরির কথা বলে ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে
রাশিয়ায় পাঠানো হয়। এ কাজে মিজানুর রহমান ও আবু তাহের লেন্টু পারস্পরিক যোগসাজশে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ৭ মে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর রাজনকে দেশটির সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। টানা ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে রাজনসহ ৩০ জন বাংলাদেশিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের তিনটি ভাগে— প্রথম ভাগ, মধ্যভাগ ও শেষভাগে মোতায়েন করা হয়েছিল বলে জানান এসআরবি কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, প্রতিপক্ষের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্ত করতে বাংলাদেশিদের সামনে রাখা হতো। তাদের লক্ষ্য করে প্রতিপক্ষ ইউক্রেনের ড্রোন হামলা চালালে হামলাকারীদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেত। এভাবে বাংলাদেশিদের এক ধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় ১৭ জন বাংলাদেশি নিহত হন বলে জানিয়েছে এসআরবি।
ভুক্তভোগী রাজন হোসেনের বরাত দিয়ে এসআরবি জানায়, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের আঘাতে তার কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। এরপর বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান। পরে আহত অবস্থায় পালিয়ে রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় গত ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন।
দেশে ফেরার পর ক্ষতিপূরণ দাবি করলে মিজানুর রহমান রাজনের পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ করেন, মারধরের চেষ্টা করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় রাজনের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করা হয়। মামলাটির তদন্তে নেমে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসআরবি জানায়, গত মঙ্গলবার গভীর রাতে এসআরবি-১০-এর সিপিসি-৩ ফরিদপুর ক্যাম্পের একটি দল ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার আটাইল এলাকায় অভিযান চালিয়ে মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। একই রাতে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ এলাকা থেকে আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অতিরিক্ত ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় মানবপাচারের ঘটনায় জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল, হারেস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের পাসপোর্ট তৈরি থেকে শুরু করে বিমানে তুলে দেওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মিজানুর রহমান যুক্ত ছিলেন। রাশিয়ায় পৌঁছে প্রত্যাশিত চাকরি না পেয়ে ভুক্তভোগীরা তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তাদের অনুরোধে সাড়া দেওয়া হয়নি।
মিজানুর রহমান জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২১ জন বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয় বলে জানিয়েছে এসআরবি। এ ছাড়া মোস্তাফিজুর রহমান ও আলী নামের আরও দুজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এই মানবপাচারের সঙ্গে বাংলাদেশি চক্রের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি ও কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারী যুক্ত ছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে। রাশিয়ায় অবস্থানরত আরও দুজনের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। তাদের পরিচয় ও ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক।
এসআরবি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুরের বাসিন্দা রয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাদের কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন পরিবারের সদস্যরা স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও অনেকেই মরদেহ দেখার বা দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পাচ্ছেন না। বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেনের আগে এবং যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে এসআরবি।
