তাইজুল ইসলামের ঝুলিয়ে দেওয়া বলটি মিড উইকেটের ওপর দিয়ে উড়িয়েই মুষ্ঠিবদ্ধ হাত বাতাসে ছুড়লেন কাইস আহমেদ। ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন ক্রিজে থাকা সঙ্গী জিয়া-উর-রেহমান। ডাগ আউটে থাকা সবাই ততক্ষণে দাঁড়িয়ে তালি দিচ্ছেন। সবার মুখে চওড়া হাসি। হাসিমুখে তালি দিচ্ছিলেন খেলা দেখতে আসা তারকা রাশিদ খানও। কোচ রিচার্ড পাইবাস ও সহকারী কোচ টবি র্যাডফোর্ডের হাসি তো থামছিলই না। জয়ের উদযাপন তো এমনই হয়!
ম্যাচে যদিও কোনো দল জেতেনি, কোনো দল হারেনি। ইতিহাসে এই টেস্ট লেখা থাকবে ‘ড্র’ হিসেবে। তবে ড্র ম্যাচেও তো অনেক সময় জয়-পরাজয়ের ব্যাপার থাকে! এই টেস্ট যারা দেখেছেন, তারা জানেন, ওই ড্র আসলে আফগানিস্তানের জন্য জয়ের মতোই, বাংলাদেশের জন্য যা একরকম পরাজয়ই।
আবু ধাবি টেস্টের শেষ দিনে অবিশ্বাস্য ব্যাটিং বীরত্বে ড্র আদায় করে নিয়েছে আফগানিস্তান। ৪৭৯ রানের লক্ষ্য তো ধরাছোঁয়ার বাইরেই ছিল। কিন্তু গোটা শেষ দিন লড়াই করে ম্যাচ শেষ করেছে তারা চতুর্থ ইনিংসে ৮ উইকেটে ৩৪৬ রান করে।
ম্যারাথন ব্যাটিংয়ে স্মরণীয় এক সেঞ্চুরি উপহার দিয়েছেন সেদিকউল্লাহ আটাল। টেস্টে তো বহুদূর, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও তার কোনো শতরান ছিল না। ১৯ ম্যাচে ফিফটি ছিল কেবল ৫টি, ব্যাটিং গড় ২৬.৪৫। সেই ব্যাটসম্যান ৫১৪ উইকেট ব্যাটিং করে ৩৩২ বল খেলে করেছেন ১১১ রান।
শেষ সেশনে তার বিদায়ের পরও অবশ্য ম্যাচে বাকি ছিল ২৩ ওভারের বেশি। বাংলাদেশের জয়ই তখন মনে হচ্ছিল সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল। কিন্তু লোয়ার অর্ডারে ইয়ামিন আহমাদজাই, কাইস ও জিয়ার বীরোচিত ব্যাটিংয়ে ম্যাচ বাঁচায় আফগানিস্তান।
জায়েদ স্টেডিয়ামের উইকেটে শেষ দিনেও ছিল না প্রাণের ছোঁয়া। বোলারদের জন্য ছিল না তেমন কোনো সহায়তা। তবে জিততে না পারার দায়টা বাংলাদেশের বোলার-ফিল্ডারদেরও নিতে হবে। বোলিংয়ে ধার ছিল না তেমন। আটালের বিদায়ের পর একের এক সুযোগ এসেছে। কিন্তু ক্যাচ পড়েছে, পরপর দুই দলে সহজ রান আউটের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে, বল স্টাস্পে লাগলেও বেলস পড়েনি, একটুর জন্য ক্যাচ হাতে আসেনি দফায় দফায়। শেষ পর্যন্ত তাই হতাশাই সঙ্গী হয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দলের। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আফগানদের কৃতিত্বই সবচেয়ে বেশি।
৩ উইকেটে ১৩২ রান নিয়ে দিন শুরু করে আফগানিস্তান। ফিল্ডারের থ্রোয়ে চোট পেয়ে দিনের তৃতীয় ওভারেই ক্রিজ ছেড়ে যান হাশমাতউল্লাহ শাহিদি। তাতে বিচলিত না হয়ে লড়াই চালিয়ে যান আটাল ও ইকরাম আলিখিল। বলের পর বল ছেড়ে দিয়ে কিংবা ঠেকিয়ে উইকেটে পড়ে থাকেন দুজন।
আটাল প্রথম টেস্ট ফিফটিতে পা রাখেন ১৬৬ বলে। ফিফটির পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে তাইজুলকে দুটি ছক্কা মারেন তিনি ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে।
এরকমই আরেকটি শটের চেষ্টায় বড় এক সুযোগ দেন তিনি। কিন্তু ম্যাচজুড়ে দুর্দান্ত কিপিং করা লিটন এবার ব্যর্থ হন সহজ স্টাম্পিংয়ের সুযোগ কাজে লাগাতে।
লাঞ্চের কয়েক মিনিট আগে এই জুটি ভাঙেন ইবাদত হোসেন চৌধুরি। যদিও উইকেটটি লিখে রাখা উচিত লিটনের নামের পাশে। ডানদিকে ঝাঁপিয়ে অসাধারণ ক্যাচ নেন বাংলাদেশের কিপার। জুটি থামে ১৪৭ বলে ৬৬ রানে।
একই রকম প্রতিরোধ গড়ে ওঠে পরের জুটিতেও। রান করা নামক ব্যাপারটি পুরোপুরি ভুলে গিয়ে মাথা নিচু করে উইকেট আঁকড়ে রাখেন ইসমাত আলম। প্রথম রানের দেখা পান তিনি ৪৫ বল খেলে!
আরেক প্রান্তে রক্ষণের পাশাপাশি আলগা বল পেলে কাজে লাগান আটাল। দ্বিতীয় নতুন বলেও বাংলাদেশ পারেনি জুটিতে ফাটল ধরাতে। হাসানের বলে বাউন্ডারি মেরে আটাল শতরানে পৌঁছে যান ২৭৭ বলে।
শেষ পর্যন্ত এই জুটি ভাঙেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ইসমাতের ব্যাটের কানা ছুঁয়ে লিটনের পায়ে লেগে উঠে যাওয়া বল মুঠোবন্দি করেন নাজমুল হোসেন শান্ত।
আফগান লড়াই থামেনি সেখানেও। চোট পাওয়া শাহিদি ফেরেন ব্যাটিংয়ে। আরেকটি জুটি গড়ে ওঠার আভাস মেলে। তবে প্রথম সেশনের মতো দ্বিতীয় সেশনেও উইকেট ধরা দেয় বিরতির একটু আগে। বলা যায়, উইকেট ছুড়ে আসেন শাহিদি। ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে মিরাজকে তুলে মারার চেষ্টায় ধরা পড়েন তিনি মিড অনে।
সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত উইকেট ধরা দেয় চা বিরতির পর। তখনও পর্যন্ত গোটা ম্যাচে ৫৮ ওভার বল করেও উইকেট না পাওয়া তাইজুল ইসলাম পেয়ে যান বড় উইকেটটিই। শর্ট লেগে ধরা পড়েন আটাল।
বাংলাদেশের উল্লাস দেখে মনে হচ্ছিল, জয়টা তখন তারা সময়ের ব্যাপারই মনে করছিলেন। উইকেট বাকি তখন আর কেবল তিনটি। কিন্তু আফগান লড়াইয়ের শেষ অধ্যায় তখনও বাকি।
পেসার আহমাদজাই হয়ে ওঠেন যেন পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান। কাইস ক্রিজে গিয়ে পাল্টা আক্রমণে বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ শট খেললেও টিকে যান। চাপের মধ্যে ভেঙে পড়ে বাংলাদেশও। রান আউটের সহজ সুযোগ হাতছাড়া হয় পরপর দুই বলে। মিরাজের বলে কাইসে ক্যাচ ছাড়েন হাসান মাহমুদ। অষ্টম উইকেট জুটি খেলে ফেলে একশর বেশি বল।
একদম শেষ বেলায় অবশ্য নাটক জমে ওঠে বেশ। আহমাদজাইয়ের ৮৫ বলে বীরত্বপূর্ণ লড়াই শেষ হয় মিরাজের বলে শর্ট লেগে ক্যাচ দিয়ে। ম্যাচে তখনও বাকি পাঁচ ওভার।
কিন্তু আর কোনো উইকেট নিতে পারেনি বাংলাদেশ। শেষ সময়ে পায়ে ক্র্যাম্প করায় মাঠেই চিকিৎসা নেন কাইস। মাঠের ভেতরে আর বাইরে সবার হাসিমুখই বলে দিচ্ছিল, সেই ক্র্যাম্প আসলে সময়ক্ষেপণের কৌশল।
আফগানদের সব কৌশলই কাজে লেগে যায়। শেষ ওভারে তাইজুলকে দুটি ছক্কা মেরে অবিস্মরণীয় ম্যাচের শেষটাও দারুণভাবে করেন কাইস।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৩৪৬
আফগানিস্তান ১ম ইনিংস: ২৪০
বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ৩৭২/৭ (ডি.)
আফগানিস্তান ২য় ইনিংস: (লক্ষ্য ৪৭৯) ১৪২ ওভারে ৩৪৬/৮ (আগের দিন ১৩২/৩) (আটাল ১১১, শাহিদি ৩৬, আলিখিল ৩৩, ইসমাত ৪, আহমাদজাই ১৯, কাইস ৪৯*, জিয়া ০*; হাসান ২৬-৫-৬৬-১, ইবাদত ২১-৭-৫০-৩, মিরাজ ৩৩-১০-৭৩-৩, তাইজুল ৪৮-১৭-১১২-১, নাঈম ১৪-২-২৯-০)।
ফল: ম্যাচ ড্র।
ম্যাচ অব দা ম্যাচ: লিটন কুমার দাস।
