লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে সুপারির মৌসুম ঘিরে জমে উঠেছে হাটবাজার। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক বাগান- সবখানেই চলছে সুপারি সংগ্রহ, বাছাই, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যস্ততা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা আসছেন সুপারি কিনতে। মৌসুমে রায়পুরে সুপারিকে কেন্দ্র করে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। এ বাণিজ্যে লাভবান হচ্ছেন বাগানমালিক ও ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি সুপারি পাড়া শ্রমিকদেরও দৈনিক আয় হচ্ছে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা।
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সুপারি সংগ্রহের মৌসুমে রায়পুরের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাড়তি গতি আসে। উপজেলার রাখালিয়া, হায়দরগঞ্জ, খাসেরহাট, মোল্লারহাট, বাসাবাড়ি ও দেনায়েতপুরসহ বিভিন্ন এলাকার হাটবাজারে চলছে জমজমাট কেনাবেচা। সড়কের পাশে অস্থায়ী বাজারগুলোতে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে পাকা সুপারি। ভোর থেকেই শুরু হয় বাগান থেকে সুপারি সংগ্রহ ও বাজারে আনার কাজ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি। স্থানীয় গৃহস্থ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন গ্রাম ও বাড়ির বাগান থেকে সুপারি সংগ্রহ করে হাটে নিয়ে আসেন। সেখান থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা সুপারি কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করেন। সুপারি সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন ও সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি উপকৃত হচ্ছেন শ্রমজীবী মানুষও।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি পোন বা ৮০টি পাকা সুপারি ২০০ থেকে ২৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কাউন বা ১ হাজার ২৮০টি সুপারির দাম পড়ছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা। তবে সুপারির আকার, মান, পাকার অবস্থা, সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে দাম ওঠানামা করে।
রায়পুরে তিন দশকের বেশি সময় ধরে সুপারির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ব্যবসায়ী স্বপন ভূঁইয়া। মৌসুমে স্থানীয় হাটবাজার থেকে সুপারি সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করেন তিনি। স্বপন ভূঁইয়া বলেন, সুপারির মৌসুমে কেনাবেচার পরিমাণ বেড়ে যায়। বিভিন্ন এলাকা থেকে সুপারি সংগ্রহ করে বাছাই ও সংরক্ষণের পর পরিবহনের মাধ্যমে গন্তব্যের বাজারে পাঠাতে হয়। প্রতিবছর তার মাধ্যমে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার সুপারি কেনাবেচা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
সুপারি পেড়েই দিনে আয় তিন হাজার টাকা
সুপারির মৌসুমে ভালো আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে গাছ থেকে সুপারি পাড়া শ্রমিকদেরও। স্থানীয়দের ভাষ্য, অভিজ্ঞ শ্রমিকরা প্রতিদিন গাছে উঠে সুপারি পেড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। সুপারি পাড়ার পাশাপাশি বাছাই, পরিবহন ও সংরক্ষণের কাজেও যুক্ত থাকেন অনেকে। মৌসুমি এ আয়ের ওপর নির্ভর করে চলে বহু শ্রমজীবী পরিবারের সংসার।
তিনভাবে বাজারজাত হয় সুপারি
লক্ষ্মীপুরে সুপারি সাধারণত পাকা, পানিতে ভেজানো ও রোদে শুকানো- এই তিনভাবে বাজারজাত করা হয়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত সুপারির প্রায় ৬০ শতাংশ পানিতে ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। বাকি সুপারি কাঁচা অবস্থায় অথবা রোদে শুকিয়ে বিক্রি করা হয়। সংরক্ষণের পদ্ধতি, বাজারের চাহিদা ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে সুপারির বেচাকেনায় দামের পার্থক্য দেখা যায়।
সাধারণত কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসে সুপারি সংগ্রহের ব্যস্ততা সবচেয়ে বেশি থাকে। পরে সংরক্ষণ করা সুপারি বাজারে আসতে থাকলে জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে বাজারদরে পরিবর্তন হতে পারে। ব্যবসায়ীরা জানান, চাহিদা ও সরবরাহের পাশাপাশি সংরক্ষণ ব্যয় এবং পরিবহন খরচও সুপারির দামের ওপর প্রভাব ফেলে।
জেলায় ৭১০ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর লক্ষ্মীপুরে ৭ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে সুপারিবাগান ছিল। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৭ হাজার ২৫০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। গত মৌসুমে জেলায় সুপারি উৎপাদিত হয়েছিল ৪২ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন।
লক্ষ্মীপুর সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি, কমলনগর ও চন্দ্রগঞ্জ এলাকায় ব্যাপকভাবে সুপারির চাষ হয়। জেলার উৎপাদিত সুপারির উল্লেখযোগ্য অংশ আসে রায়পুর উপজেলা থেকে। এ কারণে জেলার সুপারি উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থায় উপজেলাটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
রায়পুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাজেদুল ইসলাম বলেন, সুপারিকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুরে বড় ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে। চলতি মৌসুমে সুপারির দাম তুলনামূলক ভালো পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা প্রতিটি সুপারি সর্বোচ্চ দুই টাকা পর্যন্ত দামে কিনছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ বলেন, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস সুপারি সংগ্রহের প্রধান সময়। এ সময় সুপারি সংগ্রহ, বাছাই, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আসে। লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সুপারির অর্ধেকের বেশি আসে রায়পুর উপজেলা থেকে। চলতি মৌসুমে জেলায় পাকা, শুকনা ও ভেজানো সুপারি মিলিয়ে প্রায় ৭১০ কোটি টাকার বেচাকেনার সম্ভাবনা রয়েছে।
