রেলগাড়ির কামরায় প্রথম দেখা! কবিতার ‘ক্যামেলিয়া’ তিনি নন, তিনি যেন এযুগের এক ভিন্ন ‘রানার’। দুরন্ত ঘূর্ণি পেরিয়ে বহু শব্দের হিল্লোলে ছুটে চলেন নিরন্তর। প্রত্যেক মুহূর্তে রেলগাড়ির কু ঝিক ঝিক শব্দের ঝংকারে তিনিই যেন বলে চলেন গতির কথা!
পূর্ব রেলের শিয়ালদহ ডিভিশনের লোকো পাইলট, হুগলির মেয়ে পম্পা দাস। জীবন লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়ায় প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েও তিনি দুর্গা! মাঠে, প্রান্তরে অবিরাম চলার স্রোতে পম্পা রক্ষা করেন হাজার হাজার, অথবা লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বপ্ন। গন্তব্যে পৌঁছনোর প্রতিশ্রুতি। প্রতিনিয়ত লোকাল ট্রেনের চালকের আসনে বসে গাঁথেন গতির উপন্যাস। স্টিয়ারিং ধরেন, রেলগাড়ির হর্নের শব্দে তৈরি করেন যেন এক অন্য রাজত্ব।

তারকেশ্বরের কাছের নালিকুল থেকে কলকাতা, শিয়ালদহ স্টেশনের প্রত্যেকটি প্ল্যাটফর্ম— সর্বত্র অবাধ বিচরণ এই দুর্গার। বহু কষ্ট, লড়াইয়ের মধ্যেও তিনি অনন্যা। নিশ্চিত সরকারি চাকরির ভার থাকলেও পম্পা অনেকের চেয়ে আলাদা। শিয়ালদহ ডিভিশনের সকল সহকর্মীর সাহায্যে এই কাজে আজও বলীয়ান তিনি। ২০১৩ থেকে সহকারী লোকো পাইলট হিসাবে কাজের শুরু। ২০২২ থেকে লোকো পাইলট হিসাবে কাজ শুরু পম্পা দাসের। রেলের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রশিক্ষণ, নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা পেরিয়ে এই কাজে সক্ষম পম্পার মতো সকলেই।
রেলের চালক পম্পা বলছেন, “এটা স্বপ্নের কাজ। আমি প্রথমেই প্রযুক্তিগত বিদ্যার জন্য পড়াশোনা করি। উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা। কলেজ শেষের পরে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি। শিয়ালদহ ডিভিশনে জয়েন করার পর দেখি, সকলেই বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেন। সিনিয়ররা সাহায্য করেন সব সময়। ছোটবেলায় সারাদিন খেলে বেড়াতাম। কাঁধে হাত দিয়ে রেলগাড়ি বানাতাম! ছোটবেলায় ভাবিনি ট্রেন চালাব।”
ভয় লাগে না? টেনশন হয় না? উত্তরে পম্পার দাবি, “টেনশন অবশ্যই হয়, কিন্তু এত বছর ধরে এই কাজ করি, আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গিয়েছে। সঠিক প্রশিক্ষণ রয়েছে। অভিজ্ঞতা রয়েছে। যাত্রীদের নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবই, এই আত্মবিশ্বাস সব সময় থাকে।” মহিলা ট্রেনচালক, সমস্যায় পড়েন না? শোনেন কটু কথা? হুগলির মেয়ে বলছেন, “খারাপ কম, ভালো বেশি! এত মানুষ আজকাল আসছেন, সকলে ধন্যবাদ বলে যান, এগুলো দেখে খুব ভালো লাগে। গালাগাল যে একটু-আধটু খাই না, সেটাও নয়!”
পুজোর আবহে কী চান দেবীর কাছে? পম্পার কথায়, “মা দুর্গার কাছে চাই, সবাই ভালো থাকুন। খুশিতে থাকুন। আজকাল খুশির বড় অভাব।”
অবসরে পাহাড়ে যেতে ভালো লাগে তাঁর। বন্ধুর পথে গতির সঙ্গেই চলতে চান! পম্পার মতো চালকদের নিয়ে গর্বিত শিয়ালদহ ডিভিশনের ডিআরএম রাজীব সাক্সেনা। তাঁর কথায়, “শিয়ালদহ ডিভিশনে মহিলা কর্মীদের সংখ্যা পর্যাপ্ত। মোটামুটি ১৫ শতাংশের আশপাশে। সব ক্যাটেগরিতে মহিলা কর্মী রয়েছেন। মহিলা সহকর্মীদের কাজের ক্ষেত্রে সুস্থ পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা আমরা সবসময় করি।”
তাঁর দাবি, “দুর্গাপুজো, দেবী মায়ের পুজো। নারী স্বশক্তিকরণের উদাহরণ এর চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। এটা আমাদের বিশ্বাস দেয়, নারীশক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ! সাধারণ মানুষ ব্যস্ত থাকবেন উৎসবে, আর আমাদের মহিলা সহকর্মীরা কাজ করবেন। টিটি, বুকিং অফিস, লোকো পাইলট, সর্বত্র থাকবেন তাঁরা। আমার আশা সকলে ভালো কাজ করবেন।”