রাজধানীতে মানুষের নিরাপদে চলাচলের অধিকার ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত ফাঁকা সড়ক, ফ্লাইওভার, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনসংলগ্ন এলাকায় ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ছিনতাইকারীরা শুধু টাকা, মুঠোফোন কিংবা মূল্যবান সামগ্রী কেড়ে নিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, বাধা পেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করতেও দ্বিধা করছে না। কখনও ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে, কখনও অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতি রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ছিনতাই নতুন কোনো অপরাধ নয়। তবে এর ধরন, সময় ও কৌশলে পরিবর্তন এবং তরুণদের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। প্রকাশিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ছিনতাইয়ে জড়িতদের বড় অংশের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। কিশোরদেরও এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা রয়েছে। অর্থাৎ, একটি তরুণ জনগোষ্ঠীর অংশ অপরাধের ঝুঁকিপূর্ণ পথে এগিয়ে যাচ্ছে। মাদকাসক্তি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অপরাধীচক্রের প্রভাব এবং সামাজিক প্রতিরোধের দুর্বলতা এর পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। তবে কোনো একটি কারণকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণগুলোও চিহ্নিত করতে হবে।
ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের অভিযান ও গ্রেপ্তার অব্যাহত রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট, টহল এবং সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি জোরদারের কথাও জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু গ্রেপ্তারের পরও একই ব্যক্তির বারবার অপরাধে ফিরে আসা প্রমাণ করে, শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। অপরাধীকে আটক করার পাশাপাশি অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো, অপরাধীচক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। অপরাধ করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়া কিংবা গ্রেপ্তারের পর অল্প সময়ের মধ্যে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকলে কঠোর অভিযানের সুফলও সীমিত হয়ে পড়বে।
ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণেও রয়েছে বড় বাধা। গত তিন মাসে ডিএমপির আওতায় এসংক্রান্ত মামলা হয়েছে মাত্র ৬৫টি। অথচ প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অনেকে মামলা করতে আগ্রহী হন না। হারানো মালপত্র উদ্ধারের অনিশ্চয়তা, আইনি প্রক্রিয়ার ঝামেলা এবং প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে আস্থার ঘাটতি তাদের নিরুৎসাহিত করে। ফলে মামলার পরিসংখ্যান দিয়ে প্রকৃত অপরাধের মাত্রা বোঝা কঠিন। এ অবস্থায় থানা পর্যায়ে অভিযোগ গ্রহণ সহজ করতে হবে, ভুক্তভোগীদের দ্রুত সহায়তা দিতে হবে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাদের অবহিত করতে হবে। মামলা কম হওয়াকে অপরাধ কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
রাজধানীর ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সময়ভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন জরুরি। বিশেষ করে ভোরে দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ থেকে নামা যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকা দরকার। টার্মিনাল ও স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশি টহল, কার্যকর আলোকসজ্জা, সচল সিসি ক্যামেরা এবং জরুরি সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ফ্লাইওভারে সুতা বা অন্য বস্তু দিয়ে মোটরসাইকেল আরোহীদের ফাঁদে ফেলার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে ছিনতাইপ্রবণ তিন শতাধিক স্থান চিহ্নিত করার তথ্যের ভিত্তিতে এলাকাভিত্তিক নজরদারি ও নিয়মিত অপরাধ পর্যালোচনা চালু করা যেতে পারে। শুধু ঘটনার পর অভিযান নয়, অপরাধ সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
রাজধানীর মানুষ রাতে কিংবা ভোরে রাস্তায় বের হলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে, এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক পরিস্থিতি হতে পারে না। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তাই ছিনতাই দমনে সাময়িক তৎপরতার বদলে দরকার ধারাবাহিক, তথ্যনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা। অপরাধী গ্রেপ্তার হচ্ছে কি না, তার পাশাপাশি ছিনতাই কমছে কি না, পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যাচ্ছে কি না এবং ভুক্তভোগীরা প্রতিকার পাচ্ছেন কি না- এসব সূচকেও সাফল্য পরিমাপ করতে হবে। রাজধানীর সড়ককে নিরাপদ করতে হলে অপরাধের সুযোগ সংকুচিত করার পাশাপাশি অপরাধীচক্রের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে। মানুষের নিরাপত্তা যেন কেবল আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থাকে, কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে তার প্রমাণ দিতে হবে।
