সম্প্রতি কক্সবাজারের ইনানী সমুদ্রসৈকতে কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ওই ঘটনায় দেশজুড়ে পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে সুন্দরবনের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা ২৪টি ইকো-রিসোর্ট ও পর্যটন কেন্দ্রের অগ্নিনিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কোনো ধরনের অনুমোদন বা ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই এসব রিসোর্ট কয়েক বছর ধরে পর্যটকদের আবাসন সেবা দিয়ে যাচ্ছে, যা যে কোনো সময় বড় ধরনের মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
জানা যায়, বাগেরহাটের মোংলা ও খুলনার দাকোপ, কয়রা উপজেলা সংলগ্ন সুন্দরবনের বাফার জোন ও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৫টি রিসোর্ট ও ইকো কটেজ গড়ে উঠেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, এর মধ্যে কোনো ধরনের বৈধ ছাড়পত্র না থাকায় ২৩টি রিসোর্টের কার্যক্রম বন্ধ ও স্থাপনা অপসারণের চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অবৈধ তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য রিসোর্ট ও কটেজগুলোর মধ্যে রয়েছে অরণ্য ছায়া, ইরাবতী ইকো রিসোর্ট, বনলতা ইকো কটেজ, ম্যানগ্রোভ হ্যাভেন রিসোর্ট, জঙ্গলবাড়ি সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ রিসোর্ট, বনবাস ইকো ভিলেজ, বনমালী ম্যানগ্রোভ রিসোর্ট, বনবিবি ফরেস্ট রিসোর্ট, সুন্দরী ইকো রিসোর্ট এবং গোলকানন ইকো রিসোর্ট। কাঠ, বাঁশ, গোলপাতা ও ছনের মতো অতি দাহ্য পদার্থ দিয়ে তৈরি সুন্দরবনের এই কটেজগুলোতে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ব্যবহারের কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স খুলনা কার্যালয়ের তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী দেখা যায়, আইন অনুযায়ী বাণিজ্যিক আবাসন বা রিসোর্ট পরিচালনার জন্য ফায়ার লাইসেন্স এবং নির্দিষ্ট অগ্নিপ্রতিরোধক নকশা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সুন্দরবনের নিকটবর্তী রিসোর্টগুলোর ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নেই।
তবে সুন্দরবন ইকো-রিসোর্ট মালিক সমিতির প্রতিনিধি মোহাম্মদ নান্টু বলেন, ‘আমরা লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য আবেদন করেছিলাম। পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় অনুমোদন মেলেনি। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমরা প্রতিটি কক্ষে নিজস্ব উদ্যোগে অগ্নিনির্বাপণ সিলিন্ডার ও বালু রেখেছি।
খুলনা বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মাসুদ সরদার বলেন, ‘কক্সবাজারের ঘটনার পর আমরা সুন্দরবনের চারপাশের রিসোর্টগুলোর ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক। সুন্দরবনের পাশে গড়ে ওঠা পর্যটন কেন্দ্রগুলোর কোনো ফায়ার লাইসেন্স নেই। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এই দুর্গম এলাকাগুলোতে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছানো অসম্ভব। আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানাব।’
পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা জানান, কক্সবাজারের ঘটনাটি সুন্দরবনের জন্য একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। ফায়ার সার্ভিসের ক্লিয়ারেন্স ও আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর বনের পাশে পর্যটকদের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। প্রশাসন দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সুন্দরবনেও যে কোনো সময় কক্সবাজারের মতো লাশের মিছিল দেখতে হতে পারে এমনটা মনে করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
