জান্নাতুন প্রমী
সময় তার নিয়মে বয়ে যায়। দিন যায়, রাত আসে, ভোর হয়। কিন্তু কিছু শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না। কিছু অভাব সময়কে হার মানিয়ে আজীবন হৃদয়ের গভীরে থেকে যায়। বাবা, আপনাকে হারানোর পর বুঝেছি— মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ভালোবাসা, শিক্ষা আর স্মৃতি কখনো ফুরিয়ে যায় না।
একসময় ভোর হলেই দরজায় আপনার কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাঙতো। আপনি বলতেন—
“উঠ মা, নামাজের সময় হয়ে গেছে।”
কখনো বলতেন—
“দেখ, পাখিরা জেগেছে, ফুলেরা ফুটেছে, তুই এখনো ঘুমিয়ে আছিস?”
আজও ভোর হয়, কিন্তু সেই পরিচিত ডাক আর শোনা যায় না।
আলমারির প্রথম তাকে যত্নে রাখা আপনার সাদা ফতুয়াটা মাঝে মাঝে হাতে নিই। মনে হয়, সময় থেমে গেছে কোথাও। সেই কাপড়ের ভাঁজে যেন এখনো লেগে আছে আপনার উপস্থিতি, আপনার মমতা।
পৃথিবীতে মানুষ অনেক, সম্পর্কও অনেক। কিন্তু বাবার মতো নিঃস্বার্থ আশ্রয় আর কোথাও পাওয়া যায় না। আপনার মতো করে কেউ আর ভালোবাসে না, বুঝে না, সাহস দেয় না।
আপনি শুধু একজন বাবা ছিলেন না— ছিলেন একজন শিক্ষক, একজন পথপ্রদর্শক, একজন নির্মল মানুষ।
আজও আপনার অসংখ্য ছাত্র ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করে—
“হাসেম স্যার আমাদের খুব প্রিয় ছিলেন।”
তারা বলে, আপনি শুধু বইয়ের পাঠ নয়, জীবন শেখাতেন। হাসতে হাসতে, ছন্দে ছন্দে শিক্ষা দিতেন।
আপনার লাগানো গাছগুলোও আজ অনেক বড় হয়েছে। আকাশ ছুঁয়েছে তারা। কিন্তু তাদের ছায়ার নিচে দাঁড়ালে মনে হয়— তারা যেন এখনো অপেক্ষা করে আছে তাদের প্রিয় মানুষটির জন্য। সেই মানুষটির, যিনি মাটি, গাছ আর মানুষ— সবকিছুকে সমান ভালোবাসতেন।
বাবা, আপনি সাত মেয়েকে রেখে কখনো কোথাও দূরে থাকতে পারতেন না। অথচ আজ এত দূরে চলে গিয়েছেন— এমন এক দেশে, যেখান থেকে কেউ ফিরে আসে না।
আপনার অসুস্থ সময়ের ছোট ছোট স্মৃতিগুলো আজও বুকের ভেতর বেঁচে আছে—
ঔষধের সময় মনে করিয়ে দেওয়া, সন্ধ্যায় জানালা বন্ধ করতে বলা, বাজারে যাওয়ার আগে পাঞ্জাবির বোতাম লাগিয়ে দিতে বলা— এসব সাধারণ মুহূর্তই আজ সবচেয়ে অসাধারণ স্মৃতি হয়ে আছে।
আপনি নেই— কিন্তু আপনার সততা আছে।
আপনার শিক্ষা আছে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস আছে।
ছোটবেলা থেকে যখনই কেউ জিজ্ঞেস করতো— “বড় হয়ে কী হতে চাও?”
আমার উত্তর ছিল একটাই—
আমি আমার বাবার মতো মানুষ হতে চাই।
আজও সেই উত্তর বদলায়নি।
ভালো থাকুন বাবা।
আল্লাহ আপনার কবরকে নূরে ভরে দিন, জান্নাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
“হে আমার প্রতিপালক, তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে স্নেহ-মমতায় লালন-পালন করেছেন।”
