নাটোরের সিংড়ায় চলনবিলের কৃষকদের মধ্যে সার নিয়ে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। রবি-বোরো মৌসুমের শুরুতেই এক বস্তা সার সংগ্রহ করতে ভোররাত থেকে সারাদিন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। দিন শেষে অনেক কৃষককে আবার খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, টিএসপি সার যেন সোনার হরিণ। চলনবিলে সরিষা, ভুট্টা, আলুসহ রবিশস্যের আবাদ শুরু হলেও সারের অভাবে অনেক কৃষক জমি পতিত রেখেছেন। দেশীয় ইউরিয়া সারের সংকট না থাকলেও এ সার সংগ্রহ করতেও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার লালোর ইউনিয়নের বামন মাঝগ্রাম বাজারে মেসার্স এসআর ট্রেডার্সের সামনে পাঁচ শতাধিক কৃষকের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। তাদের অনেকে ইউরিয়া সার নিতে ভোররাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কৃষকদের চাহিদা ৪ থেকে ১০ বস্তা হলেও দেওয়া হচ্ছে মাত্র এক থেকে দুই বস্তা। অথচ কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে ইউরিয়া সারের কোনো সংকট নেই।
লাইনে দাঁড়ানো বড়বারইহাটি গ্রামের কৃষক ইকবাল হোসেন বলেন, টিএসপি, ডিএপি, পটাশ ও ইউরিয়া সার সংগ্রহ করতে পৃথক জায়গায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। দেশীয় পণ্য ইউরিয়া সার নিতে কৃষকদের এত হয়রানি কেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মহনপুরের কৃষক আবুল খয়ের ও রফিকুল ইসলাম বলেন, গত তিন দিন ঘুরেও আমরা সার পাইনি। সোমবার সকাল থেকে দুই বস্তা টিএসপি সারের জন্য অপেক্ষা করছি।
ডাকমন্ডব গ্রামের কৃষাণী নার্গিস বেগম ও দুলেনা বেগম বলেন, আমাদের বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকায় বাধ্য হয়ে নিজেরাই সার নিতে এসেছি। কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে এক বস্তা করে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের হয়রানি দেখার কেউ নেই।
মেসার্স এসআর ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপক জয়দেব সাহা ও মিন্টু সাহা বলেন, কৃষকদের ভোগান্তি হলেও কিছু করার নেই। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার অনুমতি ও নির্দেশনা মেনেই সার বিতরণ করছেন তারা।
বড়বারইহাটি গ্রামের কৃষক আছের আলী, খোরশেদ আলম ও মতিউর রহমান, হামির ঘোষ গ্রামের জালাল উদ্দিন এবং হাপুনিয়া গ্রামের আশরাফুল ইসলামসহ অন্তত ১৫ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃষি কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া কোনো ডিলার সার দিচ্ছেন না। একজন কৃষক তার চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের সার একই ডিলারের দোকান বা গুদাম থেকে নিতে পারছেন না। বরং কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় বিভিন্ন দিনে আলাদা আলাদা স্থান থেকে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে কৃষকদের বাড়তি অর্থ ও সময় ব্যয় হচ্ছে, পাশাপাশি ভোগান্তিও বাড়ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, সার বিতরণে অনিয়ম ঠেকাতে ডিলারদের ওপর কিছুটা চাপ রাখতে এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সব কৃষকই সার পাবেন। বরাদ্দ ধাপে ধাপে উত্তোলন করতে হচ্ছে বলে পর্যায়ক্রমে সার বিতরণ করা হচ্ছে। অনেক কৃষক একসঙ্গে আসায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিনয় কুমার বলেন, কৃষকদের মধ্যে সারসংকটের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় দীর্ঘ লাইন ও ভিড় হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল রিফাত বলেন, সার বিতরণে কৃষকদের হয়রানি করা হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সার নিয়ে কোনো অনিয়ম হলে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।