শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে উৎসবের জোয়ারে ভাসছে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার। শত শত বছরের ইতিহাস, পরিবারগুলোর অকৃত্রিম সংহতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে জমে উঠেছে এবারের উৎসব।
চার পুরুষের পুরনো চুন-সুরকির বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভোরের শরৎকালীন হাওয়া গায়ে মাখছিলেন ষাটোর্ধ্ব নিত্যানন্দ শাঁখারী। হাতের পুরনো কাঁসার থালায় ধূপ আর লাল পদ্ম সাজাতে সাজাতে স্মৃতির সাগরে ডুব দেন তিনি। তার ছোটবেলায় এই সরু গলিতেই কাঠের পিঁড়িতে বসে দাদু শাঁখা কাটতেন, আর মা-ঠাকুমারা ব্যস্ত থাকতেন পূজার নাড়ু বানাতে। আজও সেই সরু গলি, দুপাশে উঁচু উঁচু পুরনো বাড়ি, আর বাতাসে ধুনো-ধূপের চেনা সুবাস। যুগ বদলালেও পরিবর্তন আসেনি তাদের পারিবারিক আবেগে।
পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারের প্রতিটি কোণে এখন আনন্দের শিহরণ, ঢাকের বাদ্য আর কাঁসরের ঝংকার। পরশু মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আনুষ্ঠানিক আবাহন ঘটেছে। সে হিসাবে গতকাল মহাসপ্তমীর দিন গড়িয়ে আজ সোমবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান দিন ‘মহাষ্টমী’— অর্থাৎ উৎসবের তৃতীয় দিন। কুমারী পূজা আর সন্ধিপূজার সার্বিক আয়োজন নিয়ে এখন ব্যস্ততম সময় পার করছে এখানকার পরিবারগুলো।
বাড়ির আঙিনায় পূজামণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে উৎসবের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে নিত্যানন্দ শাঁখারী বলেন, ‘আমাদের এই ভিটেয় পূজার বয়স কত, তা সঠিক বলা কঠিন। তবে বাবা-দাদাদের মুখ থেকে শুনেছি, প্রায় ২০০ বছর ধরে এই একখণ্ড উঠানেই আমরা দুর্গা প্রতিমা বসিয়ে আসছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা শহর কত বদলে গেছে, বড় বড় দালান উঠেছে; কিন্তু শাঁখারীবাজারের পূজার প্রাণের
টানটা একই রয়ে গেছে। এখানে পূজা মানে শুধু একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, আমাদের পুরো পরিবারের এক ছাদের নিচে ফেরার দিন।’
পূজা এলেই শাঁখারীবাজারের এই সংকীর্ণ গলিগুলো রূপ নেয় এক বিরাট সামাজিক ক্যানভাসে। খুবই সামান্য জায়গা; কিন্তু মানুষের হৃদয়ের বিস্তার যেন অগাধ। গলিজুড়ে সারি সারি মন্দিরে ও সাময়িকভাবে নির্মিত ছোট-বড় পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গা সপরিবারে অধিষ্ঠিত হন। আধুনিক নগরায়ণ কিংবা বহুতল ভবনের ভিড়েও এখানকার প্রতিটি বাড়ির গৃহকোণে লুকিয়ে থাকে পূজার আসল রূপ। ষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রতিটি দিনই এখানে ভক্তি ও আনন্দ উৎসবে মুখরিত থাকে।
পাড়ার তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুস্মিতা শাঁখারী নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে বলেন, ‘শাঁখারীবাজারের পূজার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো— এখানকার পারিবারিক আবহ। ঢাকার অন্যান্য জায়গায় হয়তো বড়
জমকালো মণ্ডপ হয়; কিন্তু আমাদের এখানে একটা বাড়ির পুজো মানে পুরো গলির উৎসব। আমরা সব ভাই-বোন একসঙ্গে ধুনুচি নাচের প্রস্তুতি নিই, মণ্ডপে মণ্ডপে প্রসাদ বিলাই। আমাদের শিকড় যে কতটা গভীরে, তা এই কয়েকটা দিন এখানে না থাকলে বোঝা যাবে না।’
শাঁখারীবাজারের পূজার অন্যতম আকর্ষণ এর অকৃত্রিম হৃদ্যতা ও জমজমাট বেচাকেনা। এই সংকীর্ণ গলিগুলো পাইকারি ও খুচরা কেনাকাটার এক বিশাল বাজারে পরিণত হয়। পসরা সাজিয়ে বসেন শাঁখা, সিঁদুর, লাল-সাদা সুতি ও জামদানি শাড়ি, পিতল-কাঁসার থালা-বাসন থেকে শুরু করে হরেক রকমের পূজার অনুষঙ্গ ও মুখরোচক মিষ্টির বিক্রেতারা। দোকানগুলোতে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। শাঁখারীবাজারের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী কাচের ও খোদাই করা শাঁখা কেনার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে নারীরা ছুটে আসেন। বিক্রেতাদের ব্যস্ততা আর ক্রেতাদের দরদাম হাঁকাহাঁকিতে মুখর থাকে প্রতিটি দোকান।
স্থানীয় প্রাচীন পূজা কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য প্রদীপ কুমার দে বলেন, ‘শাঁখারীবাজারের পূজা দেখতে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মানুষ আসেন। এখানকার গলি হয়তো ছোট; কিন্তু আমাদের হৃদয়ে কোনো সংকীর্ণতা নেই। আমরা এই সম্প্রীতি ও উৎসবের ধারা অক্ষুণ্ন রেখেছি।’
