ভারতে খনি ও খনিজসম্পদের ওপর কর আরোপের ক্ষমতা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্যগুলোর মধ্যে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়েছে। পার্লামেন্টে পাস হওয়া খনি ও খনিজ (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধনী আইন–২০২৬ এর মাধ্যমে খনিজসমৃদ্ধ জমির ওপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং রাজ্যগুলোর কর আরোপের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। এতে বিশেষ করে খনিজসম্পদের ওপর রাজস্বের জন্য নির্ভরশীল রাজ্যগুলোর আর্থিক স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়েছে, সংশোধিত আইনে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্ধারিত শর্ত ছাড়া খনিজের অধিকার ও খনিজসমৃদ্ধ জমির ওপর নতুন করে কর আরোপ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি, আইনটি কার্যকর হওয়ার আগে রাজ্যগুলো খনিজের ওপর যে কর আরোপ করেছিল, কিন্তু পুরোপুরি আদায় করতে পারেনি, সেই বকেয়া করও বাতিল করা হয়েছে।
ভারতের মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর দেশে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলোর মধ্যে ক্ষমতা ও সম্পদ বণ্টন নিয়ে মতবিরোধ নতুন নয়। তবে নতুন এই আইন খনি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে ছাড়িয়ে রাজ্যগুলোর রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা এবং আর্থিক স্বাধীনতা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্ক তৈরি করেছে।
সংবিধানের ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, খনি ও খনিজের ওপর আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কেন্দ্র ও রাজ্যগুলোর মধ্যে ভাগ করা রয়েছে। রাজ্য তালিকার–২৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, খনি ও খনিজ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাজ্যগুলোর হাতে রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় তালিকার ৫৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই ক্ষমতা পার্লামেন্ট প্রণীত কেন্দ্রীয় আইনের অধীন। কেন্দ্রীয় তালিকার ৫৪ নম্বর অনুচ্ছেদ পার্লামেন্টকে জনস্বার্থে খনি ও খনিজের নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের পরিধি নির্ধারণের ক্ষমতা দিয়েছে। অন্যদিকে, রাজ্য তালিকার ৫০ ও ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, খনিজের অধিকার এবং জমির ওপর কর আরোপের ক্ষমতাও রাজ্যগুলোর রয়েছে।
সংশোধিত আইনে খনিজের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজ্যগুলোর কর আরোপের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে আইনটি সংবিধানে নির্ধারিত কেন্দ্র-রাজ্য ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাজ্যগুলোর আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে, ২০২৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে একটি সাংবিধানিক অবস্থান তুলে ধরেছিল। আদালত বলেছিল, পার্লামেন্ট জনস্বার্থে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারলেও রাজ্যগুলোর খনিজের অধিকারের ওপর কর আরোপের ক্ষমতা রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় তালিকার ৫৪ নম্বর অনুচ্ছেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে পার্লামেন্ট রাজ্যগুলোর খনিজসমৃদ্ধ জমির ওপর কর আরোপের ক্ষমতা খর্ব করতে পারে না।
সংশোধিত আইনের বিধান সুপ্রিম কোর্টের ওই অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন আইনটির সমালোচকেরা। কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি, বিভিন্ন রাজ্যে খনিজের ওপর ভিন্ন ভিন্ন ও একাধিক ধরনের কর আরোপের ফলে দেশীয় খনিজের দাম বেড়ে যায়। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খনিজের বদলে আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং সরকারি কোষাগারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। তবে অতীতে আরোপিত কিন্তু আদায় না হওয়া কর বাতিল করায় রাজ্যগুলোর সম্ভাব্য রাজস্বের একটি উৎস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ কয়েকটি রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজস্ব আদায়ের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।
খনিজ রাজস্বে বড় নির্ভরতা ওডিশা-ঝাড়খণ্ডের
রাজ্যগুলোর আর্থিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে খনিজ খাতের গুরুত্ব বিভিন্ন রাজ্যের রাজস্বের পরিসংখ্যানে স্পষ্ট। ঝাড়খণ্ড ও ওডিশায় খনিজসম্পদ থেকে পাওয়া আয় রাজ্যগুলোর করবহির্ভূত রাজস্বের প্রায় ৮০ শতাংশ। ফলে খনিজের ওপর কর আরোপ বা সেই কর বহাল রাখার ক্ষমতা সীমিত করা হলে রাজ্য দুটির রাজস্বে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানও খনিজ খাতের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। এসব রাজ্যের করবহির্ভূত রাজস্বের মধ্যে খনিজ থেকে পাওয়া আয়ের অংশ যথাক্রমে ৪৮,৪১ ও ৩৯ শতাংশ। অন্যদিকে, তেলেঙ্গানা ও ছত্তিশগড়ে খনিজ রাজস্ব সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর করবহির্ভূত আয়ের যথাক্রমে ১১ ও ৬ শতাংশ। ফলে রাজস্বের জন্য এই দুই রাজ্যের খনিজ খাতের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম এবং সংশোধিত আইনের তাৎক্ষণিক আর্থিক প্রভাবও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। তবে খনিজের ওপর রাজস্ব নির্ভরতার মাত্রা দিয়ে রাজ্যগুলোর প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ওডিশায় সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান ভিন্ন
খনিজ রাজস্বের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা থাকা সত্ত্বেও সংশোধিত আইন নিয়ে ওডিশায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐকমত্য নেই।
রাজ্যটির বিরোধী দল বিজু জনতা দল (বিজেডি) আইনটির তীব্র সমালোচনা করেছে এবং এ বিষয়ে আলোচনার জন্য বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকার দাবি জানিয়েছে। তবে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের বক্তব্য, সংশোধিত আইন ওডিশার খনিজ রাজস্বের ক্ষতি করবে না। অন্যদিকে, খনিজ রাজস্ব রাজ্যের করবহির্ভূত আয়ের মাত্র ১১ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও তেলেঙ্গানা সংশোধিত আইনকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ) বাইরে থাকা আরও কয়েকটি রাজ্যও একই পথে এগোচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি চার রাজ্যের
কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা, হিমাচল প্রদেশ ও কেরালা সংশোধিত আইনকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার পরিকল্পনা করছে। তাদের যুক্তি, খনিজের অধিকার এবং খনিজসমৃদ্ধ জমির ওপর রাজ্যগুলোর কর আরোপের ক্ষমতা সীমিত করার ফলে রাজ্যগুলোর আর্থিক ক্ষমতা ও ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হবে।
কেরালা এ বিষয়ে অতিরিক্ত একটি আপত্তিও জানিয়েছে। রাজ্যটির মতে, খনিজসমৃদ্ধ জমিকে সংশোধিত আইনের আওতায় আনার ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এর প্রভাব রাজ্যের উপকূলীয় অঞ্চল ও বনাঞ্চলের মতো ক্ষেত্রেও পড়তে পারে।
ঝাড়খণ্ডও আইনটির বিরোধিতা করেছে। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন সতর্ক করে বলেছেন, খনিজ কর থেকে রাজস্ব হারালে লাখ লাখ মানুষ উপকৃত হন, এমন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, সংশোধিত আইনের ফলে অতীতে আরোপিত কিন্তু আদায় না হওয়া নির্দিষ্ট কিছু করের দাবি বাতিল হয়ে যাবে। তবে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যগুলোর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত একই ধরনের সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার উদ্যোগ দেখা যায়নি।
রাজনৈতিক অবস্থানেও নির্ধারিত হচ্ছে বিরোধের ধরন
কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে রাজ্যগুলোর এই বিরোধ ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সামনে এনেছে। রাজ্যগুলোর আর্থিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও সব রাজ্যে তা একইভাবে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতে রূপ নিচ্ছে না। খনিজসম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা রাজ্যগুলোর জন্য বাস্তব আর্থিক স্বার্থ তৈরি করেছে। তবে রাজনৈতিক অবস্থান এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্য সরকারের সম্পর্কের ধরনও নির্ধারণ করছে, সেই স্বার্থ রক্ষায় কতটা সংগঠিতভাবে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হবে।
অর্থাৎ, খনিজ রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা থাকলেই প্রতিটি রাজ্য একইভাবে প্রতিবাদ করবে, এমন নয়। আর্থিক স্বার্থের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমীকরণও বিরোধের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করছে।
আর্থিক ক্ষমতায় কেন্দ্রের প্রভাব বেশি
ভারতের আর্থিক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো পুরোপুরি বিকেন্দ্রীভূত নয়; বরং এখানে ক্ষমতার বণ্টন অসম। বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজ্যগুলোর ব্যয়ের দায়িত্ব বেশি হলেও কর আরোপের ক্ষমতার বড় অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রয়েছে। রাজ্যগুলোর ঋণ নেওয়া এবং কেন্দ্র থেকে অর্থ হস্তান্তর ও আর্থিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় অর্থের ওপর নির্ভরশীলতা কিংবা ঋণ নেওয়ার জন্য কেন্দ্রের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা রাজ্যগুলোর আর্থিক স্বায়ত্তশাসন সীমিত করতে পারে।
রাজ্যগুলো প্রকৃতপক্ষে কতটা আর্থিক স্বাধীনতা ভোগ করে এবং কেন্দ্রীয় সরকার সেই স্বাধীনতার ওপর কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তা দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্র ও রাজ্যগুলোর মধ্যে বিরোধের অন্যতম কারণ।
জিএসটি থেকে শিক্ষানীতি, বারবার সংঘাতে কেন্দ্র-রাজ্য
ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ও রাজ্যগুলোর স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। আইন প্রণয়নের এখতিয়ার, আর্থিক সম্পদ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, এমনকি পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত বিষয়েও বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) বাবদ ক্ষতিপূরণ, অর্থ কমিশনগুলোর কার্যপরিধি নির্ধারণ, জাতীয় শিক্ষানীতি, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং সর্বভারতীয় পরিষেবাগুলোর বিধিতে প্রস্তাবিত সংশোধনীর মতো বিভিন্ন ইস্যুতে এই বিরোধ সামনে এসেছে।
নতুন খনি ও খনিজ আইন কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা এবং আর্থিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে চলমান সংঘাতের ক্ষেত্রে আরও একটি বিরোধের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এর মধ্য দিয়ে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব এবং রাজ্যগুলোর আর্থিক স্বাধীনতার মধ্যকার দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
