
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটির সরকার ঋণের নিট সুদ পরিশোধে ব্যয় করেছে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি ডলার। দৈনিক হিসাবে এ ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ২৯০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় নিট সুদ ব্যয় বেড়েছে ৮ শতাংশ। বিপুল সরকারি ঋণ ও উচ্চ সুদহারের কারণে দেশটির বাজেটের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। খবর ফরচুন।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া ২০২৬ অর্থবছরে সরকারের মোট সুদ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি ডলারে। এ সময় গড় সুদহার ছিল ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ওই সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) দ্রুত সুদহার বাড়াতে শুরু করে।
এদিকে গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতিও বেড়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি ডলারে, যা আগের অর্থবছরের ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি ডলারের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি।
এ সময় সরকারের রাজস্ব আয় ৩ শতাংশ বেড়ে ৫ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বিপরীতে সরকারি ব্যয় ৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলারে। রাজস্ব আয়ের তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়ায় বাজেট ঘাটতির পরিমাণও বেড়েছে।
সরকারের মোট সুদ ব্যয় ও নিট সুদ ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মোট সুদ ব্যয় হলো সরকারি ঋণের বিপরীতে পরিশোধ করা সুদের পরিমাণ। অন্যদিকে, নিট সুদ ব্যয় হিসাব করা হয় সুদ পরিশোধ থেকে সুদ বাবদ পাওয়া আয় বাদ দিয়ে। ২০২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের নিট সুদ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি ডলারে।
দেশটির মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ এখন ৪০ ট্রিলিয়ন বা ৪০ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা সরকারি ঋণের পরিমাণও দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় সমান। ফলে সুদহার উচ্চ পর্যায়ে থাকলে বিপুল ঋণের বিপরীতে সরকারের ব্যয় আরও বাড়বে। এতে আগামী বছরগুলোয় বাজেটের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ব্যয়ের খাত হয়ে উঠতে পারে সুদ পরিশোধ।
সরকারি ঋণের সুদ ব্যয় কতটা বাড়বে, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে বাজারের সুদহারের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বাজেট ঘাটতি মেটাতে স্বল্পমেয়াদি ঋণ গ্রহণ বাড়িয়েছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কিছু ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। তবে স্বল্পমেয়াদি ঋণের মেয়াদ দ্রুত শেষ হওয়ায় সেগুলো পুনরায় নিতে হয়। বাজারে সুদহার বেশি থাকলে নতুন ঋণ গ্রহণের ব্যয়ও বেড়ে যায়।
বর্তমানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা সরকারি ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আগামী ১২ মাসের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হবে। এর পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। ফলে এসব ঋণ পুনরায় গ্রহণ অথবা পুনঃঅর্থায়ন করতে হবে। উচ্চ সুদহারের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সরকারের সুদ পরিশোধের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস (সিবিও) গত ফেব্রুয়ারিতে পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০৩৬ সালে দেশটির বার্ষিক ঋণের সুদ ব্যয় বেড়ে ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। তবে এরপর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম ও বন্ডের ইল্ড বেড়েছে। এতে আগের পূর্বাভাসের তুলনায় সুদ ব্যয় আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
দায়িত্বশীল বাজেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা সংস্থা কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের (সিআরএফবি) হিসাব অনুযায়ী, বন্ডের ইল্ড সিবিওর পূর্বাভাসের চেয়ে ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি থাকলে চলতি দশকের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সুদ ব্যয় বেড়ে ২ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে।
ঋণের চাপ সামাল দিতে অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশে উন্নীত করা গেলে প্রবৃদ্ধির মাধ্যমেই ঋণের বোঝা সামলানো সম্ভব হবে। গত মাসে সাউদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটিতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধের পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি আবার গতি পেতে পারে।
তবে বর্তমানে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এ লক্ষ্যের নিচে রয়েছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুন সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে, ওয়াল স্ট্রিটের পূর্বাভাসে পুরো বছরের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি ব্যয় ও ঋণের সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ সামলে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সুদহার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে ঋণ পুনঃঅর্থায়নের ব্যয় বাড়বে। পাশাপাশি বাজেটের বড় অংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় হলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থসূচক/
The post যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ছাড়িয়েছে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার, সুদ পরিশোধে দৈনিক ব্যয় ২৯০ কোটি appeared first on অর্থসূচক.
