কিছু কষ্টের সহজ ব্যাখ্যা থাকে না। প্রিয় মানুষের চলে যাওয়া, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া বা নিজেকে নিয়ে সংশয়— এমন অভিজ্ঞতার পর অনুভূতিগুলোও অপরিচিত মনে হতে পারে।
এই অনুভূতি কাউকে বলা যায় না, আবার নিজের মনের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো গুছিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন সময়ে বই হয়ে উঠতে পারে সঙ্গী।
গল্পের কোনও চরিত্রের কষ্টে নিজের অভিজ্ঞতার ছায়া খুঁজে পাওয়া, কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তিতে মনের কথার সন্ধান পাওয়া বা কোনও মনস্তাত্ত্বিক বই থেকে নিজের অনুভূতি সামলানোর উপায় শেখা, এভাবেই নিজের মনের দিকে নতুন করে তাকাতে সাহায্য করতে পারে।
বই পড়া যখন মনের যত্ন
মানসিক সুস্থতার সহায়ক হিসেবে পরিকল্পিতভাবে বই পড়ার একটি পদ্ধতি রয়েছে, যার নাম ‘বিবলিওথেরাপি’ বা গ্রন্থচিকিৎসা।
এরমূল ধারণা হল, নির্দিষ্ট অনুভূতি, মানসিক সংকট বা জীবনের কঠিন পরিস্থিতি বুঝতে ও সামলাতে বইকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী কেলি হোয়েলিং, রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “আবেগগত সুস্থতা, মানসিক চাপ মোকাবিলা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে সচেতনভাবে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই এই পদ্ধতির মূল কথা।”
গ্রন্থচিকিৎসায় সাধারণত দুই ধরনের বই কাজে লাগানো হয়। প্রথমটি হল আত্মউন্নয়নমূলক বা তথ্যভিত্তিক বই। এসব বইয়ে দুঃখ, উদ্বেগ, সম্পর্কের সমস্যা বা আত্মবিশ্বাসের অভাবের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা থাকে।
পাশাপাশি নিজের চিন্তা ও আচরণ বুঝতে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে কিছু ব্যবহারিক কৌশলও পাওয়া যায়।
দ্বিতীয় ধরনের বই হল উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম। এগুলো সরাসরি সমস্যার সমাধান না দিলেও নিজের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও সম্পর্কের নানান দিক বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
দুই ধরনের বইয়ের উদ্দেশ্য একেবারে আলাদা নয়। কোনও বই পাঠককে সমস্যার সমাধান খুঁজতে সাহায্য করে, আবার কোনও বই নিজের অনুভূতিগুলো চিনতে শেখায়।
কখনও একটি গল্প এমন অভিজ্ঞতার ভাষা দেয়, যা পাঠক এত দিন নিজের মধ্যেই অনুভব করেছেন, কিন্তু প্রকাশ করতে পারেননি।
গল্পের চরিত্রে নিজের প্রতিচ্ছবি
কষ্টের একটি বড় অংশ হল, নিজেকে একা মনে হওয়া। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর মনে হতে পারে, এমন অভিজ্ঞতা বুঝি আর কারও হয়নি।
শোকের সময় অন্যের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধা তৈরি হলে মনে হতে পারে, আশপাশের কেউ বিষয়টি বুঝতে পারবে না।
এমন পরিস্থিতিতে কোনও গল্পের চরিত্রকে একই ধরনের অনুভূতির মধ্য দিয়ে যেতে দেখলে পাঠকের মনে স্বস্তি আসতে পারে। চরিত্রটি হয়ত প্রিয়জনকে হারিয়েছে, কোনও সম্পর্কের ইতি টেনেছে বা নিজের জীবনের অর্থ খুঁজছে।
বইয়ের এমন চরিত্রের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পেলে পাঠক বুঝতে পারেন, তার অনুভূতিগুলো অস্বাভাবিক নয়।
কেলি হোয়েলিং-এর মতে, “নিজের ভয়, শোক, লজ্জা, আকাঙ্ক্ষা বা বিভ্রান্তির প্রতিফলন অন্যের গল্পে দেখতে পাওয়া মনে করিয়ে দেয় যে, এসব অনুভূতি মানবজীবনেরই অংশ। বই কষ্টের কারণ দূর করতে পারে না, তবে সেই কষ্টের মধ্যে নিজেকে একা মনে হওয়ার অনুভূতি কমাতে সাহায্য করতে পারে।”
এখানে বইয়ের বিষয়বস্তুর চেয়ে পাঠকের সঙ্গে সংযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যে গল্প একজনের কাছে গভীর অর্থ বহন করে, অন্যের কাছে সেটি হয়ত সাধারণ মনে হতে পারে।
“তাই আবেগগত স্বস্তির জন্য সবার একই ধরনের বই পড়ার প্রয়োজন নেই। বরং যে লেখা নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে, সেটিই বেশি অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে”, বলেন কেলি হোয়েলিং।
অন্যের জীবন বুঝতে শেখায় বই
বই পড়ার উপকারিতা শুধু নিজের কষ্টের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে অন্য মানুষের জীবন সম্পর্কে জানার সুযোগও তৈরি হয়।
এমন কোনও চরিত্রের গল্প পড়া, যার পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক অবস্থান বা জীবনের সংকট নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, পাঠককে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
মার্কিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অশ্বিনী নাদকার্নি, পড়ার সঙ্গে চিন্তাভাবনার পুনর্গঠন এবং মস্তিষ্কের নতুন সংযোগ তৈরির ক্ষমতার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন।
তার কথায়, “মস্তিষ্কের এই নতুন সংযোগ তৈরির সক্ষমতাকে স্নায়বিক নমনীয়তা বলা হয়। নতুন তথ্য, অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মাধ্যমে নিজের ভাবনার ধরন নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারে।”
কোনও পাঠক হয়ত দীর্ঘদিন ধরে মনে করেন যে, ব্যর্থতা মানেই জীবনে পিছিয়ে পড়া। তবে এমন একটি উপন্যাস পড়ার পর, যেখানে কোনও চরিত্র ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই নিজের জীবনের নতুন পথ খুঁজে পায়, তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
অবশ্য বই পড়লেই চিন্তাভাবনায় নিশ্চিতভাবে পরিবর্তন আসবে, এমন নয়। তবে নতুন অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, যা নিজের এবং অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
কষ্টের বই পড়লে কি মন আরও খারাপ হয়?
দুঃখের গল্প পড়লে কেউ কেঁদে ফেলেন, কেউ নিজের জীবনের পুরানো স্মৃতি মনে করেন, আবার কেউ দীর্ঘদিন এড়িয়ে চলা অনুভূতির মুখোমুখি হন। এমন প্রতিক্রিয়া সব সময় নেতিবাচক নয়।
কখনও গল্পের মাধ্যমে চাপা কষ্ট প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়। নিজের অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সেটিকে স্বীকার করতে পারাও মানসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। শোক বা সম্পর্ক ভাঙার পর কেউ হয়ত একই ধরনের গল্প পড়ে সান্ত্বনা পান, আবার কারও কষ্ট আরও বেড়ে যেতে পারে।
“তাই কোনও বই পড়ার সময় নিজের মানসিক অবস্থার দিকে খেয়াল রাখা দরকার। পড়তে গিয়ে অস্বস্তি অসহনীয় হয়ে উঠলে বইটি কিছুদিনের জন্য সরিয়ে রাখা বা অন্য ধরনের লেখা বেছে নেওয়া যেতে পারে”, বলেন ডা. অশ্বিনী নাদকার্নি।
বই পড়ার উদ্দেশ্য নিজেকে জোর করে কষ্টের মুখোমুখি করা নয়। বরং নিজের অনুভূতিকে বোঝার জন্য একটি নিরাপদ মানসিক পরিসর তৈরি করা।
বাস্তবতা থেকে বিরতি, নাকি পালিয়ে থাকা?
বই পড়া অনেক সময় দুশ্চিন্তা থেকে সাময়িক বিরতি দেয়। কঠিন দিনের শেষে গল্পের জগতে কিছুটা সময় কাটানো স্বস্তিদায়ক হতে পারে। এই বিরতি সব সময় ক্ষতিকর নয়; বরং মানসিক ক্লান্তি কমিয়ে নতুন করে কাজে ফেরার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে বই পড়ার অভ্যাস যখন ঘুম, কাজ, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো বা প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার।
কেলি হোয়েলিং-এর মতে, “পড়া শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিজের জীবনে ফিরে যেতে সাহায্য করছে, নাকি বাস্তব জীবন থেকে ক্রমাগত দূরে সরিয়ে নিচ্ছে— এই প্রশ্নটি নিজেকে করা জরুরি।”
কোনও সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার বদলে প্রতিবার বইয়ের মধ্যে আশ্রয় নেওয়া সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, তবে সমস্যার সমাধান নাও করতে পারে।
তাই বইকে বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় না বানিয়ে, নিজের অনুভূতি বোঝা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই ভালো।
