দেশে ডেঙ্গু ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিনই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে তাজা প্রাণ। গত ১৬ দিনেই ৯০টি তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গায়ে হলুদের দিনে মৃত্যুবরণ করেন এক বর। ২১ দিনের মধ্যে একই পরিবারের দুই সন্তানকে কেড়ে নিয়ে মা-বাবাকে সন্তানহারা করেছে ডেঙ্গু। চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে একই বাড়িতে একমাসে তিনজনের প্রাণ গেছে ডেঙ্গুতে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৩৩৫ জন রোগীর মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
মা-বাবার দুই সন্তান। নাম মো. নাজমুল হাসান ইফতি (২৪) ও মো. ইনতিসার হাসান ইয়াস (১৬)। নাজমুল পড়তেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে। ইনতিসার পড়তো আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে নবম শ্রেণিতে। ২১ দিনের ব্যবধানে ডেঙ্গুতে এই দুই সন্তানকে হারিয়েছেন মা-বাবা। মা নাজমিন আক্তার বলেন, ছোট মশা আমার পরিবারের সব আনন্দ নিয়ে চলে গেল। পৃথিবীতে আমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো অবলম্বন রইলো না। বাবাও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।
আমাদের গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধায় বিয়ের একদিন আগে ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে আরিফ শাহরিয়ার সৌমিক (২২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গায়ে হলুদের দিন গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। এর আগে গত ৪ দিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন তিনি। শুক্রবার সকালে সৌমিকের বোন শারমিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। শুক্রবারই তার বিয়ে এবং শনিবার দুপুরে শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে বৌভাতের আয়োজনের কথা ছিল। নিহত সৌমিক গাইবান্ধা পৌর এলাকার ডেভিড কোম্পানি পাড়ার সুলতান মিয়ার ছেলে। তিনি ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। সৌমিকের বোন জানান, প্রায় এক মাস আগে ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরেন সৌমিক। এর মধ্যে গত চারদিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন। বৃহস্পতিবার সকালে তার শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে শহরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নেয়ার পর দুপুরে তাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকালের দিকে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে স্বজনরা দ্রুত গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুতে দুই পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ডেঙ্গুতে আরও ৪ মৃত্যু: দেশে একদিনে আরও চারজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৮১ জন। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এসব তথ্য জানিয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৩৩৫ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৮ হাজার ৪৪০। এ পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ২ হাজার ২১০ জন। ২৪ ঘণ্টায় চারজনেরই মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে দু’জনের। মারা যাওয়া চারজনই পুরুষ, তাদের বয়স ২৬ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে নারী-পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান, নারী ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ ও পুরুষ ৪৯ দশমিক ১ শতাংশ।
মশার বিস্তার এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে বিস্তৃত একটি রোগে পরিণত হয়েছে। কোনো সরকারই ডেঙ্গু দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ডেঙ্গু প্রথম ১৯৬০-এর দশকে বাংলাদেশে শনাক্ত হয়। তখন এটি ‘ঢাকা জ্বর’ নামে পরিচিত ছিল। এরপর ২০০০ সালে দেশে ডেঙ্গুর নতুন করে প্রাদুর্ভাব শুরু হয়।
সরকার গত সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসের বিশেষ অভিযান শুরু করে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং সরকারি, বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগকে সমন্বিত করার লক্ষ্যে এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১২ই সেপ্টেম্বর কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আশা করার মতো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। হতাশার চিত্রটাই বেশি। এখন ডেঙ্গু শুধু ঢাকা শহর নয়, গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামে এডিস মশার প্রজনন কীভাবে হচ্ছে, তা জানতেই পারছি না। অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, বর্তমানে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের যে পদ্ধতি, সেটা পদ্ধতিই ভুল। এ পদ্ধতিতে ২০০০ সাল থেকে কার্যক্রম চালিয়েও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। সারা দেশে কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ দরকার।
