ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সুস্থ আছেন এবং পূর্ণ কর্তৃত্ব নিয়ে দেশ পরিচালনা করছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আব্দুল মজিদ হাকিম ইলাহি। নিরাপত্তাজনিত কারণে মোজতবা জনসমক্ষে আসছেন না বলেও দাবি করেছেন তিনি।
ভারতের নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ‘এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিট ২০২৬’-এ অংশ নিয়ে এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ইলাহি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। ওই হামলায় তার ছেলে মোজতবা খামেনিও আহত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়। বাবার মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নিলেও এরপর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়ায় তার শারীরিক অবস্থা ও নেতৃত্ব নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে।
এমনকি বাবার শেষকৃত্যেও মোজতবা উপস্থিত ছিলেন না বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই দাবি নাকচ করে ইলাহি বলেন, মোজতবা তার বাবার শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি নিজেও ইরানে ছিলেন এবং মোজতবার দুই ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন বলে জানান এই কূটনীতিক।
তিনি বলেন, নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে মোজতবা সংবাদমাধ্যমের সামনে আসেননি। ফলে তাকে কেউ দেখতে পাননি। তবে তিনি সুস্থ আছেন এবং দায়িত্ব পালন করছেন।
মোজতবার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ইলাহি বলেন, ‘তিনি অত্যন্ত ভালো আছেন এবং খুব সুন্দরভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।’
তিনি আরও জানান, গত সপ্তাহে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে মোজতবার সাত ঘণ্টার বৈঠক হয়েছে। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকারও মোজতবার সঙ্গে দীর্ঘ সময় বৈঠক করেছেন বলে তাকে জানিয়েছেন। এ ছাড়া তার পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি মোজতবার সঙ্গে দেখা করে তার সুস্থতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলেও দাবি করেন ইলাহি।
ইরানের এই কূটনীতিকের দাবি, মোজতবা মাঝেমধ্যে রাতে রাস্তায় বের হন এবং সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলেও অংশ নিয়েছেন।
ইরানের সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে মোজতবা আড়ালে থেকে দেশ পরিচালনা করছেন। একই সঙ্গে তিনি হামলায় পাওয়া ক্ষত থেকে সেরে উঠছেন। দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে ব্যাপক ক্ষমতাও দিয়েছেন তিনি।
তবে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তা ও অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, গুপ্তহত্যার আশঙ্কাই তার জনসমক্ষে না আসার অন্যতম কারণ। তাদের দাবি, মোজতবা গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন, বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবেদন নিচ্ছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোও তিনিই চূড়ান্ত করছেন।
বাবার প্রধান সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও মোজতবা পর্দার আড়ালে থাকতে পছন্দ করতেন বলে জানা গেছে।
গত ২১ জুলাই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছিলেন, সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে তার যোগাযোগ বাড়ছে। তবে আগস্টের শুরুতে তিনি বলেন, মোজতবার সঙ্গে যোগাযোগ করা বেশ কঠিন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ দিকে তাদের বৈঠকে সামরিক পরিস্থিতি ও অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হয়। সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রা, জ্বালানির ব্যবহার এবং বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও আলোচনায় ছিল।
এর আগে গত মে মাসে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, পেজেশকিয়ান মোজতবার সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা বৈঠক করেছেন। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম প্রকাশ্যে আসা বৈঠকের খবর।
ইরান কে চালাচ্ছে, প্রশ্ন ট্রাম্পের
এদিকে ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলতি মাসের শুরুতে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের আট মাস পরও ইরান আসলে কে পরিচালনা করছেন, তা স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের ভাষ্য, ইরানের শীর্ষ ও দ্বিতীয় সারির নেতাদের অনেকে নিহত হওয়ায় দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, তার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ইরান আসলে কে চালাচ্ছেন, তা কেউ জানে না।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনা করছে। তবে ইরানের ক্ষমতাকাঠামোয় তাদের প্রকৃত কর্তৃত্ব কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ভ্যান্সের মতে, ইরান কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
তবে এসব অভিযোগের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, মার্কিন কর্মকর্তারা ভালো করেই জানেন তাদের ইরানি প্রতিপক্ষ কারা এবং ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে।
সূত্র: এনডিটিভি
