বিভিন্ন ওয়েব ব্রাউজারে ‘Pompeii’ লিখে সার্চ করলেই চোখে পড়ে অদ্ভুত কিছু মানুষের অবয়ব। কেউ কুঁকড়ে শুয়ে আছেন, কেউ হাত দিয়ে মুখ ঢেকেছেন, কেউ আবার সন্তানকে আঁকড়ে ধরেছেন। প্রথম দেখায় এগুলোকে পাথরের মূর্তি মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলো কোনো মূর্তি নয়। এগুলো হলো প্রায় ২ হাজার বছর আগে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে নিহত পম্পেই নগরীর মানুষের শেষ মুহূর্তের ছাপ।
ইতালির নেপলস উপসাগরের কাছে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির পাদদেশে গড়ে উঠেছিল পম্পেই। একসময় এটি ছিল সমৃদ্ধ, ব্যস্ত ও অভিজাত এক রোমান নগরী। বাণিজ্য, বিনোদন, স্থাপত্য ও সামাজিক জীবনের নানা নিদর্শন ছড়িয়ে ছিল শহরজুড়ে। কিন্তু ৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ভিসুভিয়াসের ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে মুহূর্তেই পাল্টে যায় সবকিছু। ছাই, পাথর ও উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরির পদার্থের নিচে চাপা পড়ে যায় পুরো শহর।
ব্যস্ত নগরী থেকে মৃত্যুপুরী
অগ্ন্যুৎপাতের দিনটিও অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। বাজারে মানুষের ব্যস্ততা, দোকানে কেনাবেচা, বাড়িতে দৈনন্দিন কাজ–সবই চলছিল স্বাভাবিকভাবে। কেউ হয়তো নিজের কাজে ব্যস্ত, কেউ খাবার খাচ্ছিলেন, কেউবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন।
হঠাৎ ভিসুভিয়াসের বিস্ফোরণ। আকাশ ঢেকে যায় ছাই ও ধোঁয়ায়। শুরু হয় পাথর, ছাই ও উত্তপ্ত আগ্নেয় পদার্থের বৃষ্টি। ১৮ ঘণ্টা ধরে চলে সেই অগ্ন্যুৎপাত। মাটি থেকে প্রায় ৯ মিটার ওপর পর্যন্ত উঠেছিল সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। শহরের বাসিন্দারা আতঙ্কে পালানোর চেষ্টা করেন। কেউ শহর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন, আবার অনেকে আটকা পড়ে যান নিজেদের বাড়ি কিংবা আশ্রয়স্থলে।
আরো পড়ুন: আল্পস পর্বতের অতলে গোপন সভ্যতা
পম্পেইয়ের পাশাপাশি হারকুলেনিয়ামসহ আশপাশের এলাকাও এই অগ্ন্যুৎপাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অগ্ন্যুৎপাতের বিভিন্ন পর্যায়ে শহরের ওপর বিপুল পরিমাণ আগ্নেয় ছাই ও পিউমিস জমা হতে থাকে। পরে উত্তপ্ত গ্যাস ও আগ্নেয় পদার্থের দ্রুতগতির প্রবাহ বহু মানুষের মৃত্যু ঘটায়।
কীভাবে তৈরি হলো ‘পাথরের মানুষ’?
অগ্ন্যুৎপাতের পর আগ্নেয় ছাই ও অন্যান্য পদার্থের নিচে চাপা পড়ে মানুষের দেহ। সময়ের সঙ্গে দেহের জৈবিক অংশ আগ্নেয় লাভার সঙ্গে মিশে ঠাণ্ডা শক্ত জমাটের মতো কঠিন হয়ে যায়। আর দেহের চারপাশে শক্ত হয়ে থাকা ছাইয়ের স্তরে মানুষের শরীরের আকৃতি থেকে যায়। আর সেভাবেই পড়ে থাকে প্রতিটি মানুষের দেহ। আনুমানিক ১৮৬৩ সালের দিকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা আবিষ্কার করেন এগুলো। তবে ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কিছু অ্যামেচার আর্কিওলজিস্ট খুঁজে পেয়েছিল এই দেহাবশেষ ও কিছু নিদর্শন।
.jpg)
এসব অবয়ব দেখে বোঝা যায়, মৃত্যুর সময় মানুষ কী অবস্থায় ছিলেন। কেউ হাত দিয়ে মুখ ঢেকেছিলেন, কেউ মাটিতে পড়েছিলেন, আবার কারও শরীর ছিল প্রতিরোধের ভঙ্গিতে। পরবর্তী সময়ে আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এসব দেহাবশেষের হাড়, দাঁত ও অন্যান্য উপাদান পরীক্ষা করে তাদের বয়স, খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন সম্পর্কে নানা তথ্য জানা সম্ভব হয়েছে।
ছাইয়ের নিচে সংরক্ষিত একটি শহর
পম্পেইয়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, শহরটি শুধু ধ্বংস হয়নি, বরং ধ্বংসের মধ্যেই যেন সময় থমকে গেছে। শহরের বাড়িঘর, রাস্তা, দোকান, দেয়ালের চিত্র, মোজাইক, মন্দির, স্নানাগার, পানির ব্যবস্থা ও বিনোদনকেন্দ্রের অনেক নিদর্শন এখনো দেখা যায়। কোথাও দেয়ালে লেখা রয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা কথা, কোথাও রয়েছে বিজ্ঞাপন বা রাজনৈতিক প্রচারণার চিহ্ন। এসব নিদর্শন প্রাচীন রোমান সমাজকে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পম্পেইয়ের বাড়িগুলোর দেয়ালে পাওয়া মোজাইক ও চিত্রকর্ম থেকে তৎকালীন মানুষের জীবনযাপন, খাবার, পোশাক, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। শহরের বিভিন্ন স্থানে খাবার ও পানীয় বিক্রির দোকানও ছিল।
বিনোদনের শহর
পম্পেইয়ের অ্যাম্ফিথিয়েটারও ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এখানে বিপুলসংখ্যক দর্শক একত্রিত হয়ে বিভিন্ন প্রদর্শনী ও গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই উপভোগ করতেন।
শহরের দেয়ালচিত্রে নারী-পুরুষের সম্পর্ক, দেবদেবীর উপাসনা, উৎসব, খাবার ও বিনোদনের নানা দৃশ্যও পাওয়া যায়। এসব চিত্র প্রাচীন সমাজের সংস্কৃতি ও ব্যক্তিজীবনের কিছু দিককে আমাদের সামনে তুলে ধরে।
পাপের শহর ছিল পম্পেই
পম্পেই নগরীর স্থাপনায় করা মোজাইক থেকে গবেষণায় জানা গেল, এখানকার মানুষ ওয়াইন খেতে খুব পছন্দ করতেন। দিনের তিন বেলার মধ্যে দুই বেলা ওয়াইন এবং এক বেলা অন্য খাবার খেতেন। এ নগরীর মোড়ে মোড়ে ছিল মদের বার। পম্পেই নগরীতে জুয়া খেলা নিষিদ্ধ হলেও কঠোর আইন না হওয়ায় মানুষ সেভাবে তা মানত না।
আরো পড়ুন: যে দেশের রাজধানী তিনটি
শহরটি বাণিজ্যনগরীর পাশাপাশি ধীরে ধীরে সারা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম বিনোদন নগরীর মর্যাদাও অর্জন করতে সক্ষম হয়। কারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিপুল সমাহার কাজে লাগিয়ে রোমানরা এটিকে অপরূপ সজ্জায় সজ্জিত করতে পেরেছিল। গড়ে উঠেছিল নানা ধরনের বিনোদনকেন্দ্র, যার টানে সমগ্র পৃথিবীর ভ্রমণপিপাসু অভিজাত সমাজ ভিড় করতে থাকল সেখানে। সবাই অবসর কাটানোর জন্য ছুটে যেত প্রাচীনকালের আধুনিক সভ্যতার সব ধরনের চিত্তরঞ্জনের সমাহার থাকা এই প্রাণচঞ্চল শহরে। বণিক ও পর্যটকদের জন্য সেখানে গড়ে উঠেছিল অত্যাধুনিক দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা আর প্রমোদকেন্দ্র। সহায়-সম্পদ আর বিত্ত-বৈভবের অভাব ছিল না পম্পেইবাসীর। কিন্তু এত সব নিয়ামতের মধ্যে ডুবে থেকেও পম্পেইবাসী ভুলে গেল মহান স্রষ্টাকে। উদাসীন হলো স্রষ্টার আরোপ করা বিধিনিষেধের প্রতি। ফলে তারা লিপ্ত হলো নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপে। নিজেদের চিত্তরঞ্জনের জন্য উদ্ভাবন করল ঘৃণ্যতম সব পন্থা। খোদা প্রদত্ত নির্দেশাবলি অস্বীকার করে নানা ধরনের অমানবিক, হিংস্র আর নোংরা কর্মকাণ্ডে দিন দিন ডুবে যেতে থাকে পম্পেইবাসী।
নিছক বিনোদনের জন্য জনসমাগম করে, বিপুল জনতার সামনে তারা মানুষ ও পশুতে, কখনোবা মানুষে-মানুষে যুদ্ধ বাধিয়ে দিত। এই মানুষ ও পশু বা মানুষে-মানুষে একে অপরকে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আঘাত করে যতক্ষণ পর্যন্ত না রক্তাক্ত করে কোনো একজনকে চিরতরে দুনিয়া থেকে বিদায় করত, ততক্ষণ পর্যন্ত চলত এই বর্বরোচিত খেলা। আর এই মরণখেলা উপভোগ করত সে সময়ের রোমান অভিজাত শ্রেণির দর্শক, রাজা-মহারাজা ও সমাজপতিরা। মানব হন্তারক সেজে সেখানে তারা খুঁজ বেড়াত নিজেদের চিত্তবিনোদন।
যৌনতায় ছিল এরা অন্ধ, অর্থাৎ যৌনান্ধ বলা যেতে পারে। শুধু যৌনকার্য সম্পাদনের জন্য প্রতিটি বাড়িতে নির্মিত হতো আলাদা স্থাপনা। বাড়িঘরের দেয়ালে দেয়ালে অঙ্কিত হতো নগ্ন দেহচিত্র। শুধু যে নিজেরা যৌনতায় ডুবে থাকত, তা নয়। সেই সঙ্গে নিজের ছেলে-মেয়েদের দিয়েও বণিক ও পর্যটকদের যৌন বিনোদনের ব্যবস্থা করতে তারা পিছু হটতো না। এতটাই নিচু পর্যায়ে হয়ে গিয়েছিল তারা। এমনকি তারা নিজেরা পশুপাখির সঙ্গেও নিজেদের বিকৃত যৌন পিপাসা মেটাত।
এভাবেই দিন দিন তৎকালীন আসমানি ধর্ম থেকে বিচ্যুত হতে থাকে তারা। ক্রমান্বয়ে শহর ছেড়ে চলে যেতে থাকেন সব ধর্মযাজক ও ধর্ম প্রচারক। এমনই এক অমানবিক, ঘৃণ্যতম ও বর্বরোচিত সমাজব্যবস্থা যখন সেখানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, তখনই নেমে এল মহান স্রষ্টার ক্রোধের আগুন বা আজাব। জীবন্ত মমিতে পরিণত হলো অনাচার আর পাপাচারে লিপ্ত থাকা মানুষগুলো।

শহরের নিচে লুকিয়ে ছিল উন্নত জীবনযাত্রা
পম্পেইয়ের ধ্বংসাবশেষ থেকে বোঝা যায়, শহরটির অবকাঠামোও ছিল বেশ উন্নত। রাস্তার পাশে পানির ব্যবস্থা, নালা ও ড্রেনেজের নিদর্শন পাওয়া গেছে। বাড়িঘর, দোকান, স্নানাগার ও বিভিন্ন জনসমাগমস্থল মিলিয়ে এটি ছিল পরিকল্পিত ও প্রাণবন্ত নগরী।
শহরের অবস্থানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ভূমধ্যসাগরের বাণিজ্যপথের কাছাকাছি হওয়ায় পম্পেই ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। কৃষি, বিশেষ করে আঙুর চাষ ও ওয়াইন উৎপাদনের সঙ্গেও অঞ্চলটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
বহু শতাব্দী মাটির নিচে
অগ্ন্যুৎপাতের পর পম্পেই দীর্ঘ সময় মানুষের চোখের আড়ালে থেকে যায়। শহরটির অবস্থান সম্পর্কে প্রাচীন কিছু ধারণা থাকলেও এর বিস্তৃত ধ্বংসাবশেষ উন্মোচনের কাজ শুরু হয় অনেক পরে।
১৬ শতকে নির্মাণকাজের সময় পম্পেইয়ের কিছু নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে ১৮ শতকে পরিকল্পিত খনন শুরু হওয়ার পর শহরটির প্রকৃত গুরুত্ব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। এরপর প্রায় তিন শতাব্দী ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা চলছে।
আরো পড়ুন: পৃথিবীর যে দেশে এখনো ২০১৯ সাল!
খননের ফলে একে একে বেরিয়ে আসে বাড়িঘর, রাস্তা, মন্দির, দোকান, দেয়ালচিত্র, ভাস্কর্য, রান্নাঘর, মুদ্রা, দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী এবং মানুষের দেহাবশেষ। প্রতিটি নিদর্শন যেন ২ হাজার বছর আগের একটি করে গল্প।
ইতিহাসের এক টাইম ক্যাপসুল
পম্পেইকে অনেক সময় একটি ‘টাইম ক্যাপসুল’ বলা হয়। কারণ, অন্য অনেক প্রাচীন নগরীর ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে স্থাপনা পরিবর্তিত বা ধ্বংস হয়ে গেলেও পম্পেইয়ের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়ের শহুরে জীবন প্রায় হঠাৎ করেই থেমে গিয়েছিল। এই কারণেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে পম্পেই এত গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার দেয়াল, রাস্তা, রান্নাঘর কিংবা সাধারণ একটি দোকানও প্রাচীন রোমানদের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে। মানুষের শেষ মুহূর্তের অবয়বগুলোও তাই শুধু ভয়াবহতার নিদর্শন নয়; এগুলো ইতিহাসের মূল্যবান দলিল।
এখনো শেষ হয়নি অনুসন্ধান
২ হাজার বছর আগে ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে পম্পেই ধ্বংস হয়েছিল। কিন্তু সেই ধ্বংসই শহরটিকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে দিয়েছে। আজ পম্পেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা ও পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসে সেই ধ্বংসাবশেষ দেখতে। তারা দেখে ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা রাস্তা, বাড়ি, অ্যাম্ফিথিয়েটার, দেয়ালচিত্র আর মানুষের শেষ মুহূর্তের অবয়ব।
তবে পম্পেই শুধু পর্যটনের জায়গা নয়। এটি প্রকৃতির শক্তি, নগরসভ্যতার ভঙ্গুরতা এবং ইতিহাস সংরক্ষণের এক অনন্য উদাহরণ। যে শহরে এক দিন মানুষের কোলাহল ছিল, সেখানে এখন নীরবতা। শুধু নীরবতাই নয়। সেখানে আছে ধর্মবিমুখ হয়ে গেলে শেষ পরিণতি কেমন হতে পারে, সেই চিহ্ন। যেন তারা কথা বলছে বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে। যেন তাদের মতো পরিণতি না হয়।
ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাত পম্পেইকে মুছে দিয়েছিল, কিন্তু ইতিহাস থেকে মুছে দিতে পারেনি। বরং ছাইয়ের নিচে চাপা পড়া সেই শহরই আজ হয়ে উঠেছে অতীতকে জানার এক অনন্য দরজা। যেখানে প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি দেয়াল এবং প্রতিটি দেহাবশেষ বলে যায়, সময় চলে যায়, কিন্তু ইতিহাস থেকে যায়।
তারেক/
