এক ম্যাচে ব্যাট হাতে ফিফটি ও সেঞ্চুরি, উইকেটের পেছনে নয়টি ডিসমিসাল-টেস্ট ক্রিকেটে এমন কীর্তি আগে দেখেনি বিশ্ব! ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে রেকর্ডবুকে নিজের নাম লিখিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কারও উঠেছে লিটন দাসের হাতে। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে প্রথম পেসার হিসেবে হ্যাটট্রিক করে ইতিহাস গড়েছেন হাসান মাহমুদও। কিন্তু এতসব ব্যক্তিগত অর্জনের মাঝেও দলের প্রাপ্তির খাতায় বড় শূন্যতা। জয়ের খুব কাছে গিয়েও আফগানিস্তানের প্রতিরোধে আটকে গেছে বাংলাদেশ। আজ আবুধাবির টেস্ট শেষ হয়েছে ড্রয়ে, আর রেকর্ডের আনন্দের সঙ্গে মিশে গেছে না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।
ম্যাচের প্রথম চার দিন বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও শেষ দিনের গল্পটা লিখেছে আফগানিস্তান। ৪৭৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে জয়ের চেয়ে ম্যাচ বাঁচানোই ছিল তাদের মূল পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনায় শেষ পর্যন্ত সফল সফরকারীরা। পঞ্চম দিনের খেলা শেষে ৮ উইকেটে ৩৪৬ রান তাদের সংগ্রহ। হাতে থাকা শেষ দুই উইকেট নিয়ে দিনের বাকি সময় পার করে দেয় আফগানিস্তান। ফলে জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় সাত উইকেটের সমীকরণ আর মেলেনি।
এমন ফলাফলে হতাশা লুকাননি অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ম্যাচ শেষে তার কণ্ঠে ছিল সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার আক্ষেপ, তবে প্রতিপক্ষের লড়াইয়ের প্রতি স্বীকৃতিও। শান্ত বলেন, ‘হতাশাজনক, তবে আফগানিস্তান দারুণ ক্রিকেট খেলেছে। আমরা সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারিনি। পেসাররা খুব ভালো বোলিং করেছে। আশা করেছিলাম, স্পিনাররাও ম্যাচে প্রভাব ফেলবে। তারা চেষ্টা করেছে, তবে আফগানিস্তান সত্যিই অসাধারণ খেলেছে।’
বাংলাদেশের হয়ে ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ ছিলেন লিটন দাস। প্রথম ইনিংসে ৫৩ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে খেলেছেন ১০২ রানের দৃষ্টিনন্দন ইনিংস। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি উইকেটের পেছনে আটটি ক্যাচ ও একটি স্টাম্পিং করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে নয়টি ডিসমিসাল। এক টেস্টে দুই ইনিংসে পঞ্চাশোর্ধ্ব রান এবং উইকেটকিপার হিসেবে সর্বোচ্চ ডিসমিসালের নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন এই বাংলাদেশি।
লিটনের আগে এমন কীর্তির মালিক ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডেনিস লিন্ডসে। ১৯৬৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জোহানেসবার্গ টেস্টে দুই ইনিংসে ৬৯ ও ১৮২ রান করার পাশাপাশি আটটি ক্যাচ নিয়েছিলেন তিনি। প্রায় ছয় দশক ধরে অক্ষত থাকা সেই রেকর্ড এবার ছাড়িয়ে গেলেন লিটন। ব্যাটিং ও কিপিং-দুই বিভাগেই এমন ধারাবাহিকতা তাঁকে এনে দিয়েছে ম্যাচসেরার স্বীকৃতি।
তবে ব্যক্তিগত সাফল্যের উচ্ছ্বাসেও দলের জয় না পাওয়ার আক্ষেপ আড়াল করতে পারেননি লিটন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘ম্যাচটা আমরা জিততে চেয়েছিলাম। কিন্তু ক্রিকেটে অনেক সময় এমনটা হয়েই থাকে।’ নিজের ব্যাটিং নিয়ে তার ব্যাখ্যা, ‘একটা নেট সেশন করলেই আমার আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। উইকেটটা ফ্ল্যাট ছিল, প্রথম ইনিংসে সুযোগ হাতছাড়া (সেঞ্চুরি করার) করলেও দ্বিতীয় ইনিংসে আর কোনো সুযোগই নষ্ট করতে চাইনি।’
আবুধাবির প্রচণ্ড গরমে পাঁচ দিন উইকেটকিপিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিং করাও ছিল বড় পরীক্ষা। এর আগে দলের অধিকাংশ ক্রিকেটার জাপানে এশিয়ান কাপে টি-টোয়েন্টি খেলেছেন। সেখান থেকে এসে মরুর প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ টেস্ট ম্যাচ সামলানো সহজ ছিল না। লিটনও স্বীকার করেছেন সেই কঠিন বাস্তবতা, ‘বিষয়টা সত্যিই খুব কঠিন ছিল, কারণ প্রচণ্ড গরম ছিল। এই গরমে টানা পাঁচদিন খেলা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। গরমে আমি মূলত নিজের শক্তির সঠিক ব্যবহারের দিকেই মনোযোগ দিতে চেয়েছিলাম।’
ব্যাট হাতে রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি কিপিংয়েও স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন লিটন। হাসান মাহমুদের ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিকের দ্বিতীয় উইকেটটি এসেছিল তার হাতে ক্যাচ হয়ে। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে প্রথম পেসার হিসেবে হ্যাটট্রিক করার কীর্তি গড়েছেন হাসান। সেই বিশেষ মুহূর্তের ক্যাচটিকেই নিজের সেরা হিসেবে বেছে নিয়েছেন লিটন। বলেন, ‘হাসানের নেওয়া দ্বিতীয় উইকেটটি - হ্যাটট্রিক বলের সময়কার ক্যাচটি -আমার কাছে সেরা ছিল।’
হাসানের এই কীর্তি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস। এত দিন টেস্টে বাংলাদেশের কোনো পেসার হ্যাটট্রিক করতে পারেননি। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছেন হাসান মাহমুদ। তার বোলিংয়ে নতুন করে আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাচ্ছে দল। অধিনায়ক শান্তও পেসারদের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট। হাসান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি যখনই তাকে বল দেই, সে দলের জন্য দারুণ কাজ করে -ঠিক যেমনটা ইবাদত, তাসকিন ও রানাও করে থাকে। আশা করি, গত কয়েক বছরের মতো তারা ভবিষ্যতেও এভাবেই নিজেদের পারফরম্যান্স ধরে রাখবে।’
লিটনের পারফরম্যান্স নিয়েও আলাদা করে প্রশংসা করেছেন অধিনায়ক। শুধু এই ম্যাচ নয়, দীর্ঘ সময় ধরেই উইকেটের পেছনে তার ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরেছেন শান্ত। তিনি বলেন, ‘লিটন যেভাবে খেলেছে, তা সত্যিই অসাধারণ। শুধু এই ম্যাচেই নয়, গত কয়েক বছর ধরেই উইকেটের পেছনে সে দুর্দান্ত পারফর্ম করছে। এই গরমে টানা ১৪০ ওভার কিপিং করাটা তার দৃঢ় মানসিকতারই পরিচয়। আশা করি, সে তার ব্যাটিং ও কিপিংয়ের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবে।’
তবে রেকর্ড আর প্রশংসার বাইরে বাংলাদেশ দলের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে থাকছে শেষ দিনের ব্যর্থতা। চার দিন ধরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে থেকেও শেষ দিনে আফগান ব্যাটারদের আটকে রাখতে পারেনি বোলাররা। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ফিল্ডিংয়ের ভুল, রানআউটের সুযোগ নষ্ট এবং সহজ ক্যাচ ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা জয়ের সম্ভাবনাকে ক্রমেই দূরে সরিয়ে দেয়। অন্যদিকে সেদিকুল্লাহ আতালের শতক এবং শেষ দিকে লোয়ার অর্ডারের দৃঢ়তায় ম্যাচ বাঁচিয়ে নেয় আফগানিস্তান!
