আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য সর্বদাই একটি স্পর্শকাতর ও সংকটময় অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করে এই অঞ্চলের অস্থিরতা এখন সর্বাত্মক রূপ ধারণ করেছে। বর্তমানে লোহিত সাগর থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালি এবং ইয়েমেন থেকে ইরান পর্যন্ত যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তা
বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য এক নজিরবিহীন হুমকি। তবে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের একের পর এক হামলার মুখে নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াতে চায় না সৌদি আরব। রিয়াদ আর এমন যুদ্ধের বোঝা বইতে নারাজ, যা তার সামর্থ্যরে বাইরে চলে যায়।
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপসাগরীয় রাজনীতির সহযোগী অধ্যাপক লুসিয়ানো জাকারা আল জাজিরাকে বলেন, হুথিরা একসঙ্গে একাধিক কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে, ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা থেকে শুরু করে সরকারি বাহিনীর পাল্টা আক্রমণ ঠেকানো পর্যন্ত। তার ভাষ্য, তারা দেখাতে চাইছে যে একই সময়ে বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালানো এবং সৌদি আরবের ভেতরের নানা স্থানে পৌঁছানোর সক্ষমতা তাদের আছে, অর্থাৎ তারা যতটা ভাবা হয় তার চেয়ে শক্তিশালী।
জাকারার মূল্যায়নে, সৌদি আরব আবারও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে আটকা পড়তে চায় না, যা আগের মতোই তাদের সামর্থ্যরে বাইরে। হুথিরা মাঠে প্রমাণ করেছে যে তাদের পরাজিত করা যাবে না। তাই সৌদিরা এখন সরকারি বাহিনীকে সানা পুনরুদ্ধারে চাপ দিতে চায়। রিয়াদ চায় সরকারি সেনাদের সমর্থন দিয়ে যেতে, যাতে হুথিদের সামরিক স্থাপনা যতটা সম্ভব ধ্বংস করা যায়। একই সঙ্গে মিত্রদের স্পষ্ট সমর্থন ছাড়াই এখন পর্যন্ত নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা করতে হচ্ছে তাদের।
ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী রাজধানী এডেনে প্রেসিডেন্ট ভবন আল-মাআশিকের কাছে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তথ্যমন্ত্রী মোয়াম্মার আল-ইরইয়ানি বলেছেন, হুথিরা প্রাসাদটি লক্ষ্য করে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। সরকারের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী ও অন্য কর্মকর্তারা নিরাপদ আছেন, তবে তার দুই দেহরক্ষী নিহত হয়েছেন।
এডেনের হামলা এসেছে সৌদি আরবের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণের পর। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গত ১১ দিনে অন্তত ২০ বার হামলার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া কয়েক ডজন বিমানবন্দর, তেলস্থাপনা ও বন্দরও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। জোটের হিসাবে, এসব হামলায় ১৭ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
সর্বশেষ প্রতিরোধ অভিযানে জোট ইয়ানবুর দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। লোহিত সাগরের ওপর দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং রিয়াদ ও দক্ষিণাঞ্চলে তিনটি ড্রোনও ভূপাতিত হয়েছে। পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দিকে ছোড়া আরেকটি ড্রোনও ধ্বংসের কথা জানিয়েছেন আল-মালিকি, যদিও ড্রোনের উৎস ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তাৎক্ষণিক কিছু বলা হয়নি। অন্যদিকে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি টেলিগ্রামে দাবি করেছেন, মারিব প্রদেশের আকাশে তারা সৌদি ‘উইং লুং টু’ সশস্ত্র নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত করেছেন।
সরকার-সমর্থক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী গতকাল শুক্রবার হুথিদের হটিয়ে মারিব প্রদেশের উত্তরের আল-মাজজার জেলায় ঢুকেছে। তাইজেও সরকারি গণমাধ্যম দাবি করেছে, দাহিহ ও হিসন কাহলান রণাঙ্গনে হুথিদের দুটি হামলা প্রতিহত করে তাদের ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমে আল-মিসরাখ জেলার জাবাল আল-দাহিহ রণাঙ্গনে সকাল থেকে সংঘর্ষ চলছে বলেও জানানো হয়েছে। তাইজ সামরিক কমান্ডের একটি সূত্র আল জাজিরাকে জানায়, তাইজ শহরের দক্ষিণে আল-মিসরাখ জেলার ধি আল-বারিহ ও জাবা এলাকায় হুথি অবস্থানে দুটি বিমান হামলা হয়েছে। এসব তথ্যের বেশির ভাগই এক পক্ষের দাবি, স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
নিরাপত্তা উদ্বেগে সৌদি আরবে নির্ধারিত একের পর এক ক্রীড়া আয়োজন স্থগিত বা স্থানান্তর হচ্ছে। রিয়াদে হামলার কারণে এশিয়ান ট্যুর পিআইএফ সৌদি ইন্টারন্যাশনাল গলফ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। নভেম্বরের শুরুতে রিয়াদে নির্ধারিত আর্বান সাইক্লিং বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে অস্ট্রেলিয়া দল প্রত্যাহার করেছে। অস্ট্রেলিয়ান সাইক্লিংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, সিদ্ধান্তটি আঞ্চলিক সংঘাতের তীব্রতা, প্রাণহানি ও অস্ট্রেলীয় সরকারের হালনাগাদ ভ্রমণ পরামর্শ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সিক্স কিংস স্ল্যাম টেনিস প্রদর্শনী অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে সরানো হয়েছে, আর ফিফা রিয়াদে নির্ধারিত ফিফাই ফাইনালস ২০২৬ অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দিয়েছে।
এদিকে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি সেনাবাহিনী ও আইআরজিসির পূর্ণ নজরদারিতে আছে এবং শত্রু ইরানি জনগণের অধিকার মেনে না নেওয়া পর্যন্ত তা বন্ধ থাকবে। তার দাবি, ওমান সাগরে মাত্র তিনটি শত্রু জাহাজ ঢুকেছিল, যেগুলোর ওপর গুলি চালানো হয়েছে, আর এখন চলাচল অত্যন্ত সীমিত।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড অবশ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং আইআরজিসির অনুচিত আগ্রাসন সত্ত্বেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছে। ওয়াশিংটনের দাবি, তারা বাণিজ্যিক জাহাজকে প্রণালি পার হতে সহায়তা করছে। দুই পক্ষের দাবি পরস্পরবিরোধী।
আর্মেনিয়ায় জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য-সংক্রান্ত সম্মেলনে অংশ নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, সাম্প্রতিক মাসের মার্কিন হামলা অযৌক্তিক ও অমানবিক। তার ভাষ্য, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র চায় না এবং দেশটির বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক প্রচারণা মিথ্যা। তেহরান সবসময় আলোচনায় প্রস্তুত, কিন্তু ওয়াশিংটন ভাবছে বল প্রয়োগে ইরানকে আত্মসমর্পণ করানো যাবে, যা হবে না। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা কোনো শক্তির কাছে তার দেশ কখনো নতিস্বীকার করবে না।
ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামি-নিয়া দাবি করেছেন, যুদ্ধ শুরুর সময় ফেব্রুয়ারির তুলনায় এখন আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বেড়েছে। তার ভাষ্য, যুদ্ধরত ইউনিটগুলোতে নতুন সরঞ্জাম যুক্ত হয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় কয়েকটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে এবং সমন্বয় বাড়াতে আইআরজিসির বিমানবাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়াও হয়েছে। ইরানি দৈনিক আল-ভেফাকের প্রধান সম্পাদক মোখতার হাদ্দাদ আল জাজিরাকে বলেন, তেহরানের সামরিক মতবাদ প্রতিরক্ষা থেকে সরে বিমানবাহী রণতরি ও যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে আগাম আক্রমণের দিকে গেছে।
ইউরোপও এই উত্তেজনার বাইরে নয়। বার্লিনে সংবাদ সম্মেলনে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাডেফুল বলেছেন, ইউরোপ ইরানের নিশানায় এবং জার্মানি ইরানের শত্রুতামূলক তৎপরতা সহ্য করবে না।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউজম্যাক্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামের স্থাপনায় হামলা চালাতে হতে পারে। তার ভাষ্য, ইরানের পরমাণু স্থাপনা কোটি কোটি টন পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে আছে, তবে এটি দ্রুত গুঁড়িয়ে দেওয়া যাবে। এটি তেহরানের অন্যতম প্রধান পারমাণবিক স্থাপনার কাছে মাটির গভীরে অবস্থিত সুরক্ষিত কেন্দ্র। তিনি বলেন, ইরান যেন কখনও পারমাণবিক অস্ত্র না পায়, তা নিশ্চিত করতে চান, কারণ পেলে তারা তা ব্যবহার করবে।
একই সঙ্গে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন না, তার প্রয়োজনও নেই। ইরানে মার্কিন স্থলসেনা পাঠানোর কথাও তিনি ভাবছেন না। সপ্তাহের শুরুতে তিনি রাশিয়া, চীন ও ইরানের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের কথা নাকচ করেছিলেন। পাশাপাশি এখন বলছেন, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি রাশিয়া ও চীন উভয়ের সঙ্গেই কথা বলছেন।
এর মধ্যেই খবর এসেছে, তিনি বিশ্বের বৃহত্তম অপারমাণবিক বোমা জিবিইউ-৪৩/বি মোয়াব (ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট) ব্যবহারের বিকল্প বিবেচনা করছেন। প্রায় ২১ হাজার পাউন্ড (৯.৪ টন) ওজনের এই বোমা সর্বশেষ ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে ব্যবহৃত হয়েছিল। এটি ব্যবহারের সম্ভাবনা আছে এবং পেন্টাগন প্রেসিডেন্টের নির্দেশের অপেক্ষায়। ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় মোয়াব ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন কিনা, তা ট্রাম্প জানাননি; তবে এটি যে পারমাণবিক বোমা নয়, তা তিনি বলেছেন।
এ অস্থিরতার ছাপ পড়েছে তেলের বাজারে। গতকাল শুক্রবার সকালের লেনদেনে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৪১ সেন্ট বা ০.৩৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৫.৫১ ডলারে নেমেছে। মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) কমেছে ৫৪ সেন্ট বা ০.৫৫ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ৯৭.৪৩ ডলারে।
দাম কমার পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সিদ্ধান্ত। সংস্থাটি মার্চে প্রতিশ্রুত জরুরি মজুদ থেকে ২ কোটির বেশি ব্যারেল ডিজেল ও অবশিষ্ট তেল ছাড়তে সম্মত হয়েছে। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, রেকর্ড উচ্চ জাহাজ ভাড়া কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়া, ইরান ও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল পরিবহনকারী ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ট্যাংকারগুলোর কিছুর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ভাবছে। তবে হরমুজের কাছে জাহাজে নতুন হামলা এবং সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে বাড়তে থাকা লড়াই আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ জিইয়ে রেখেছে।
কূটনৈতিক অঙ্গনে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি বৈরুতে লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউসেফ রাজ্জির সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে লেবানন ও তার জনগণের প্রতি পূর্ণ সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। তিনি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলি দখলদারির কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনার কথাও বলেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, জ্বালানি সহযোগিতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আলোচনায় উঠে আসে।
সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা সহসা কমার লক্ষণ নেই। ইয়েমেনে হুথিদের হামলা সৌদি আরবকে সরাসরি চাপে ফেলেছে। হরমুজে নৌ-সংঘাত ও ট্রাম্পের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ জ্বালানি বাজার, পরিবেশ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
