মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাতে ‘মাদার অফ অল বোম্বস’ (সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচালিত বোমা) ব্যবহারের নতুন পরিকল্পনা করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বা পরে যুদ্ধাভিযান পুনরায় শুরু করার আদেশ দিলে এই বোমা ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা একথা জানিয়েছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা 'জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট' বা 'এমওএবি' বোমা প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হলে উত্তেজনা আরও অনেক বেড়ে যেতে পারে।
যদিও ট্রাম্পের উদ্দেশ্য পূরণ করতে বা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে এই বোমা কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে বলে জানিয়েছেন এমন কয়েকজন যারা অস্ত্র মোতায়েন করার পরিকল্পনা নিয়ে সামরিক পরিমন্ডলে আলোচনা চলার খবর জানেন।
ট্রাম্প অজনপ্রিয় ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য চাপের মুখে আছেন। কারণ, রিপাবলিকানরা যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের কাছ থেকে সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বা ধাক্কার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণের পরও দুই দেশের মধ্যে কোনও সমঝোতা বা মীমাংসায় পৌঁছানোর লক্ষণ তেমন দেখা যাচ্ছে না।
মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন জানায়, ট্রাম্প মার্কিন বাহিনীকে ইরানে আরও কিছু হামলার বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। হামলার নিশানার মধ্যে ইরানের জ্বালানি খাত ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট যদি বড় কোনও যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বা পরে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হতে পারে।
সামরিক এই হামলা পরিকল্পনা সম্পর্কে জানেন এমন একজন বলেছেন, পরিকল্পিত হামলাগুলো চালানো হতে পারে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) দায়িত্বাধীন এলাকা থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগেই। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার চূড়ান্তভাবে যুদ্ধে জয় ঘোষণা করে সেনা সরিয়ে নেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আরও কিছু আক্রমণ চালানোর সুযোগ পাবে।
দ্বিতীয় আরেকজন জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে হামলা করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই পরিকল্পনায় মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা একটি পারমাণবিক ঘাঁটিও ছিল, যা 'পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন' নামক পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত বলে ধারণা করা হয়।
এই মাটির নিচের শক্তিশালী ঘাঁটি ধ্বংস করার জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা এনওএবি বা ‘সব বোমার মা’ (মাদার অব অল বোম্বস) ব্যবহার করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে পরিকল্পনায় রাখা হয়।
ট্রাম্প বারবারই ইরানের 'পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন' পাহাড়ে হামলা চালানোর হুমকি দিয়ে আসছেন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারণা, ইরান সেখানে তাদের পারমাণবিক বোমার সরঞ্জাম লুকিয়ে রেখেছে। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না দেওয়াই যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য।
এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএন-কে বলেছেন, সামরিক পরিকল্পনাকারীরা নীতি-নির্ধারকদের জন্য নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ধরনের বিকল্প বা প্রস্তাব প্রস্তুত রাখেন, যার মধ্যে কম-তীব্রতর অভিযান থেকে শুরু করে ব্যাপকভাবে সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আরও শক্তিশালী হামলা চালানোর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে।
তবে, মাটির অনেক গভীরে থাকা পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ক্ষেত্রে এমওএবি বোমা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জিপিএস-নির্দেশিত মাদার অব অল বোম্বস বা এমওএবি প্রায় ৯টি সিটি ব্লকের সমতুল্য একটি বিশাল বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস করতে পারে। তবে এটি ভূগর্ভের গভীরে আঘাত হানার জন্য তৈরি করা হয়নি।
বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, গ্রানাইটের পুরু স্তর এবং অন্যান্য সুরক্ষিত দুর্গ দিয়ে সুরক্ষিত সামরিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করতে এই অস্ত্রকে যথেষ্ট বেগ পেতে হতে পারে।
সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল একজন সিএনএন-কে জানিয়েছে, এমওএবি হল এমন এক বিশাল বোমা যা কেবল বড় কোনও এলাকা একবারে ধ্বংস করার জন্যই দারুণ, অন্য কোনও কাজে এটি তেমন কার্যকর নয়। তিনি জানান, মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা শত্রু বা বাঙ্কার ধ্বংস করার জন্য এই বোমা উপযুক্ত নয়।
এই বোমা ব্যবহার করা হলে সেটি যেখানে পড়বে সেখানে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হবে। তাছাড়া, এর বিস্ফোরণ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার কারণে সাধারণ মানুষের মারা যাওয়ারও বড় ঝুঁকি থাকবে—বিশেষ করে যদি হামলা মানুষের বসবাসের এলাকার কাছাকাছি হয় বা বিদ্যুৎ ও গ্যাস কেন্দ্রের মতো জায়গায় হয়।
বোমাটির এসব সীমাবদ্ধতা থাকার পরও শত্রুপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল বা ভীত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের সামরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এটি ব্যবহারের কথা ভাবছে। এই বোমা ব্যবহার করে ইরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপও সৃষ্টি করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
ওয়াশিংটনের দাবি মেনে ইরান নতি স্বীকার করতে অনিচ্ছুক—এ পরিস্থিতিতে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ না করেও শক্তির প্রদর্শন হিসেবে এই বিশাল বোমা ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেট (আইএস)- এর সুড়ঙ্গ লক্ষ্য করে প্রথম যুদ্ধে ‘এমওএবি’ ব্যবহার করেছিল।
এবার ইরানের বিরুদ্ধে এই বোমা ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে এটি ব্যবহারের কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা এখনও জানা যায়নি।
