জাহাজভাঙা শিল্পকে পরিবেশের জন্য সর্বোচ্চ দূষণকারী শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে ইয়ার্ড স্থাপনের আগে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করাসহ কয়েকটি ধাপে অনুমোদন নিতে হয়। তবে জাহাজভাঙা শিল্পের মালিকদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে এ শিল্পকে লাল থেকে কমলা শ্রেণিতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে ইয়ার্ড স্থাপনের আগে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করার বাধ্যবাধকতা উঠে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
জাহাজভাঙা শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, এ শিল্প লাল শ্রেণিতে থাকায় ইয়ার্ড স্থাপনের অনুমোদন পেতে ৯০ দিনের মতো সময় লাগে। এতে তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তবে সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে শ্রমিক ও পরিবেশ দুটোই ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা। তাঁরা বলছেন, জাহাজভাঙা শিল্প উচ্চ ঝুঁকি ও দূষণকারী শিল্প। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এ শিল্পকে সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ এশিয়ার যেসব সৈকতে জাহাজ ভাঙা হয়, সেসব উপকূলের সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, মাটি, বায়ু মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়ছে।
জানা যায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর এ শিল্পকে লাল থেকে কমলায় নিয়ে আসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় এ-সংক্রান্ত কমিটি। এর আগে আগস্ট মাসে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন, বিধি, নীতিমালা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছিল। কমিটির সভাপতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। শিল্পমন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, আইন ও সংসদবিষয়ক সচিব এই কমিটির সদস্য। কোনো পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি বা পরিবেশ বিশেষজ্ঞকে কমিটিতে রাখা হয়নি।
জানতে চাইলে পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রথম আলোকে বলেন, ‘হংকং কনভেনশন অনুযায়ী আমাদের ১৫ থেকে ২০টি গ্রিন ইয়ার্ড আছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে তাঁরা একেকটি ইয়ার্ডে ১৫০ কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ করেছেন। জাহাজভাঙা শিল্প লাল শ্রেণিতে থাকায় ইয়ার্ড স্থাপনে অনুমতি পেতে তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে পরিবেশদূষণের ঝুঁকি বাড়বে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিবেশ ও শিল্প দুটোই বাঁচাতে হবে।
পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ অনুযায়ী, জাহাজভাঙা কার্যক্রম ও জাহাজভাঙা ইয়ার্ড দুটোই লাল শ্রেণির শিল্প। বিধিমালায় আছে, লাল শ্রেণির কারখানা বা স্থাপনা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর তীব্র প্রভাব ফেলে। এই প্রভাব মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক।
পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বিধিমালায় পরিবর্তনের ফলে একটি ইয়ার্ড কী পরিমাণ দূষণ করবে এবং পরিবেশে সেটার প্রভাব কতটুকু পড়বে, সে বিষয়ে জানার সুযোগ থাকবে না। এ শিল্পের তদারকব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে।
বিধিমালায় কী আছে, কী পরিবর্তন হচ্ছে
বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী, জাহাজভাঙার জন্য কোনো ইয়ার্ড স্থাপন করতে হলে প্রথমে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করতে হয়; যা ভারত ও পাকিস্তানের জাহাজভাঙা শিল্পের জন্যও বাধ্যতামূলক।
বর্তমানে ইয়ার্ডের দূষণ রোধে কী কী ব্যবস্থা থাকবে, সেটার বিস্তারিত কার্যপরিধি (টিওআর) পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে জমা দিয়ে অনুমোদন প্রাপ্তির পর ইআইএর কার্যক্রম শুরু করে সংশ্লিষ্ট ইয়ার্ড। কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধির নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জনমত যাচাই শেষে প্রাপ্ত মতামত জেলা কার্যালয়ে প্রতিবেদন আকারে পাঠান পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি। এরপর সেটি পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে আরও একবার যাচাই-বাছাই শেষে ইয়ার্ডের অবস্থানগত ছাড়পত্র প্রদান করা হয়।
এরপরের ধাপে আসে পরিবেশগত ছাড়পত্র। সংশ্লিষ্ট ইয়ার্ডে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর দূষণের প্রভাব রোধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেটা পরিদর্শন শেষে দেওয়া হয় এই ছাড়পত্র। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগে ৯০ দিন।
এখন জাহাজভাঙা শিল্পকে কমলা শ্রেণিতে নিয়ে আসা হলে এ ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ অনুযায়ী, কমলা শ্রেণির শিল্পের জন্য প্রাথমিক পরিবেশগত সমীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল করতে হয় পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ে। বিভাগীয় কার্যালয় যদি মনে করে ইআইএ করার প্রয়োজন আছে, সে ক্ষেত্রে তারা সুপারিশ করতে পারবে। তবে এ সুপারিশ মানার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। ইয়ার্ড স্থাপনের চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে যেতে হবে না, বিভাগীয় কার্যালয় অনুমোদন দেবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বিধিমালায় পরিবর্তনের ফলে একটি ইয়ার্ড কী পরিমাণ দূষণ করবে এবং পরিবেশে সেটার প্রভাব কতটুকু পড়বে, সে বিষয়ে জানার সুযোগ থাকবে না। এ শিল্পের তদারকব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি খুবই সম্ভাবনাময় একটি শিল্প। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সাড়ে ছয় হাজার জাহাজ ভাঙার উপযোগী হবে। গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়াতে পারলে বড় একটা অংশ ভাঙার কাজ আমরা পাব।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রমতে, এখন প্রতিবছর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলোতে ১৫০ থেকে ২০০ জাহাজ ভাঙা হয়। একটি জাহাজ ভাঙতে সময় লাগে ছয় মাস। এসব ইয়ার্ডে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন।
জাহাজ ভাঙতে হলে করণীয় সম্পর্কে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাসেল কনভেনশন অনুযায়ী যার যার বর্জ্য তাকে দায়িত্ব নিতে হবে। উন্নত দেশের বর্জ্যবাহী জাহাজ বাংলাদেশে আসলে সে বর্জ্যের দায়দায়িত্ব উন্নত বিশ্বের। বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙতে হলে ড্রাইডক (বিশেষায়িত স্থাপনা) ছাড়া বিকল্প নেই। উন্মুক্ত সমুদ্র সৈকতে কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে জাহাজাভাঙা শিল্পকে সবুজ করা যাবে না। এ শিল্পকে নিরাপদ করতে হলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যত আইন আছে, তার কঠোর প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, বিধিমালা শিথিল জাহাজভাঙা দূষণ রোধে চলমান মামলা এবং আদালতের রায় ও আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তা ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের পক্ষ থেকে আদালতকেও কিছু জানানো হয়নি। গত আগস্টেও গ্যাস নিঃসরণে ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হলো। এখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত শ্রমিকদের জীবনকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আমলে কলমের এক খোঁচায় সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার মধ্যে শিল্পকারখানা স্থাপনের অনুমতি দিতে দেখেছি। বর্তমানে নির্বাচিত সরকারের সময়ে এভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কাম্য নয়।’ তাঁর প্রশ্ন, সেন্ট মার্টিন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সরকার পরিবেশবাদীদের ডেকেছিল; কিন্তু জাহাজভাঙা নিয়ে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কোনো পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বা পরিবেশকর্মীকে ডাকা হলো না কেন?
