আজকাল ওয়েবডেস্ক: শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর বাতাসে দোলা কাশের বন জানান দিচ্ছে উমা আসছেন। বারোয়ারি মণ্ডপগুলোর পাশাপাশি এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে মুখর সাবেক বনেদি বাড়িগুলোও। হুগলির হরিপাল থানার নালীকুল বড়গাছির সিংহ, বসু মল্লিক ও রায় পরিবারের ২৯৩ বছরের প্রাচীন পুজোতেও এখন সাজো সাজো রব। এই বাড়ির বিশেষত্ব হল, এখানে দেবী পূজিতা হন দশভূজা নয়, চার হাত বিশিষ্ট জাগ্রত ‘মা অভয়া’ রূপে। তপ্ত কাঞ্চন বর্ণের এই প্রতিমার একদিকের হাতে চক্র ও সাপ, অন্যদিকের হাতে খড়্গ ও ত্রিশূল। পাঁচ খিলানযুক্ত সুবিশাল ঠাকুরদালানে প্রাচীন কাঠামোতেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রূপ পেয়ে আসছেন দেবী। দশমীতে বিসর্জনের পর কাঠামো জল থেকে তুলে এনে শান্তি জল ছেটানো হয়, আর পরিবারের সকলে লাল কালিতে সাদা কাগজে লেখেন ‘শ্রী শ্রী দুর্গা মাতা সহায়’—যে রীতি আজও একচুলও বদলায়নি।
গুপ্ত পঞ্জিকা মতে পুজো হওয়া এই বাড়ির পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে নানা অলৌকিক ও রোমহর্ষক কাহিনী। পরিবারের সদস্যরা বিশ্বাস করেন, দেবী এখানে স্বয়ং বিরাজমান। ষষ্ঠীতে অধিবাসের পর দেবীকে ঠাকুরদালানে কখনো একা রাখা যায় না। নিয়ম মেনে পরিবারের অন্তত দু’জন সদস্যকে প্রতিমার সঙ্গে রাত কাটাতে হয়। গভীর রাতে নিস্তব্ধ দালানে আজও নাকি স্পষ্ট শোনা যায় নূপুরের রিনঝিন শব্দ, যেন কেউ নিঃশব্দে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। পরিবারের প্রবীণ সদস্য অসীম সিংহ জানান, একবার বোধনের পর পুকুরে কাপড় কাচছিলেন এক পরিজন। তখন অচেনা এক মহিলা এসে মনে করিয়ে দেন পুজো শুরু হয়ে গেছে, আর মুহূর্তের মধ্যেই তিনি মিলিয়ে যান। সেই থেকে বোধন শুরু হলে পরিবারে সাবান বা ক্ষার দিয়ে কাপড় কাচা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকে, যা আবার শুরু হয় দশমীর পর। এমনকি হাঁড়িকাঠ বসে যাওয়ার পর বাড়ির বিধবা মহিলারা অন্নগ্রহণ করেন না।
ঐতিহ্যের বন্ধন এখানে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। হুগলির দামোদরের ওপার থেকে আজও বংশপরম্পরায় ঢাক বাজাতে আসেন ঢাকীরা, প্রতিমা ও ডাকের সাজও তৈরি করেন প্রাচীন কারিগরদের উত্তরসূরিরাই। নবমীর রাতে ঢাকের বিশেষ ‘রং বাজনা’ শুনতে ভিড় করেন আশপাশের বহু মানুষ। আধুনিকতার যুগেও বাইরের কোনও মণ্ডপে মন টানে না এই পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের। পরিবারের কথায়, উল্টো রথের দিন কাঠামো পুজোর পর থেকে ঠাকুরদালানে বসে মাটির প্রলেপ পড়া দেখার আনন্দই আলাদা। অষ্টমীর সন্ধিপুজো বা নবমীর হোমের সময় মায়ের দিকে তাকালে শরীর শিউরে ওঠে, দেবীকে যেন রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষ মনে হয়। নবমীর বিদায়বেলায় মায়ের চোখের কোণে সত্যি সত্যিই অশ্রুবিন্দু চিকচিক করে ওঠে, যেন মেয়ে শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাওয়ার বেদনায় কাতর। প্রায় তিন শতক পেরিয়েও এভাবেই ইতিহাস, ভক্তি আর অলৌকিক অনুভূতির মেলবন্ধনে অমলিন হয়ে রয়েছে নালীকুলের এই প্রাচীন পুজো।
