রাঙামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে সড়ক অবরোধ অব্যাহত থাকায় রিসোর্ট ও কটেজের কক্ষ বুকিং বাতিল হতে শুরু করেছে। অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনায় পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে সাজেক। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মালিক ও উদ্যোক্তারা।
তিন দফা দাবিতে সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা অবরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল ৬টা থেকে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কের ১০ নম্বর, ১৪ কিলোসহ বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ করা হয়। এতে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, অবরোধকারীদের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে এবং যান চলাচল বন্ধ আছে। তবে সাজেকের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ও পুলিশের অভিযান চলছে।
সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা বলেন, শুক্রবার সকালে সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে অবরোধ পালন করা হয়েছে। তাঁদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
বৃহস্পতিবারের ঘটনায় তাঁদের প্রায় শতাধিক সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। আহতদের মধ্যে আটজন গুরুতর। বিজয় কান্তি চাকমার অভিযোগ, আহতদের চিকিৎসার জন্য অন্যত্র নেওয়া যাচ্ছে না, কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাধা দিচ্ছে। তবে আহতদের নিজেদের উদ্যোগে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি থেকে সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে বুধবার বিকেলে অবরোধের ঘোষণা দেয় সংগঠন দুটি।
অবরোধের মধ্যে আটকে পড়া পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার সময় বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উজো বাজার এলাকায় পাহাড়ের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। প্রায় এক ঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনায় মামলা হয়েছে কি না জানতে চাইলে সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, “মামলা হবে, প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”
বাতিল হচ্ছে রিসোর্ট-কটেজের বুকিং: সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, পর্যটনকেন্দ্রটিতে প্রায় ১২০টি রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। এসব স্থাপনায় একসঙ্গে তিন হাজারেরও বেশি পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
দুর্গাপূজার ছুটি উপলক্ষে গত ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছিল। ওই সময় সাজেক ভ্যালি ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করে প্রশাসন। এরপর পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে আবার অবরোধ শুরু হওয়ায় আগাম বুকিং বাতিল হতে শুরু করেছে।
সাজেক রুইলুই হলিডে রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী মিশু দে বলেন, দুর্গাপূজার আগে থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁর রিসোর্টের সব কক্ষ বুকিং ছিল। বৃহস্পতিবার অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনার পর শুক্রবার সকাল থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়েছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে অবশিষ্ট বুকিংও বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, “সাজেক এখন পর্যটক শূন্য। বৃহস্পতিবার সকালে সেনাবাহিনীর স্কটে সব পর্যটকদের নিয়ে যাওয়ার পর সাজেকে আর কোনো পর্যটক নেই।”
তিনি জানান, সাজেকের অনেক রিসোর্ট ও কটেজে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত কক্ষ বুকিং ছিল। অবরোধ ও সংঘাতের কারণে সেগুলোও বাতিল হচ্ছে। এভাবে বুকিং বাতিল হতে থাকলে পর্যটন খাতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা অবরোধ: সাজেকের উজো বাজারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অবরোধকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের প্রতিবাদে শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে পাহাড়িদের সংগঠন ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ।
পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্মল চাকমার পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সাজেকে জেএসএসের সন্তু লারমা অংশের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে ডাকা শান্তিপূর্ণ অবরোধে হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকান ভাঙচুরের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সমর্থন জানানোও এর উদ্দেশ্য।
পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা জানান, শনিবার সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সড়ক ও নৌপথে অবরোধ চলবে।
তবে অ্যাম্বুলেন্স ও রোগীবাহী গাড়ি, শববাহী যান, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়ি অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
সানা/আপ্র/২৩/১০/২০২৬
