আকাশে ওড়ার স্বপ্ন কমবেশি আমাদের সবারই আছে। পাখির মতো আকাশে ভেসে বেড়াতে না পারলেও এখন উড়োজাহাজে করে মানুষ আকাশে উড়তে পারে। স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন দেখতে কার না ভালো লাগে। সেটা যদি হয় 'যুদ্ধবিমান' বিষয়ক কোনো নিদর্শন- তাহলে কৌতূহলের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তেমনি কৌতূহলের এক জাদুঘর 'বাংলাদেশ বিমান জাদুঘর'। যেখানে রয়েছে ডাকোটা বিমানসহ অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন।

অনেক দিন ধরে শুধু পরিকল্পনাই করে যাচ্ছিলাম বিমান বাহিনী জাদুঘর ঘুরতে যাবো। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে হয়ে উঠছিল না। শেষ পর্যন্ত আমি আর পৃথু বের হলাম ভ্রমণ গন্তব্যের পানে। আমাদের চার চাকার গাড়ি এগিয়ে চলছে নির্ধারিত গন্তব্য পানে। বারে শুক্রবার তাই রাস্তায় তেমন যানজট নেই বললেই চলে। প্রায় ৩৯ মিনিটেই আমরা এসে উপস্থিত হলাম জাদুঘরের প্রবেশ দ্বারে। শুরুতেই কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে নিলাম।

জাদুঘরের বাহিরে দিকটা দেখে আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ছোটখাটো একটি পরিসরের মধ্যে এটি তৈরি করা হয়েছে । কিন্তু পরবর্তীতে জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ করার পর বুঝতে পারলাম এটি আয়তনের দিক থেকে বেশ বড় । এবং এই জাদুঘরটি বিশাল একটা জায়গা জুড়ে অবস্থিত এবং এখানে একটি ছোটখাটো বিনোদন কেন্দ্র ও আছে। নরম ঘাসের ওপর দিয়ে পদব্রজে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। অন্য সব জাদুঘর থেকে এ জাদুঘরটি আলাদা। এটি কোনো বদ্ধ ঘরে নয়। খোলামেলা সবুজ প্রান্তরে মনোমুগ্ধকর পরিবেশে এ ঐতিহাসিক জাদুঘর।
জাদুঘরের মধ্যে প্রবেশ করলে চোখে পড়লো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বিমানবাহিনীর গৌরবের জঙ্গিবিমান, হেলিকপ্টার ও রাডার। আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। আমরা দর্শনীর বিনিময়ে চেপে বসলাম হেলিকপ্টারে।

ছোট বেলায় খুব আগ্রহ ছিলো কি ভাবে বিমান আকাশে ঘুরে বেড়ায়। একজন আমাদের বলছিলেন কিভাবে হেলিকপ্টার আকাশে ডানা মেলে। আজ নিজের চোখে দেখতে পেলাম। মোট ১৯টি বিমান এবং ৩টি রাডার রয়েছে এ জাদুঘরে। যুদ্ধবিমান ডাকোটার পাশাপাশি রয়েছে 'অ্যালিউট' হেলিকপ্টার। এটি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সেনানিবাসে আঘাত হানা হয়েছিল। মূল গেট থেকে খানিক এগোলে চোখে পড়লো বিশাল একটি বিমান। বাংলাদেশের প্রথম পরিবহন উড়োজাহাজ এটি। রাশিয়ার তৈরি এন-২৪ বিমানটি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে ১৯৭৩ সালে 'বলাকা' নামে সংযোজিত হয়। বিমানটির যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ৪৪ জন। বলাকায় দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগও রয়েছে। বলাকা ছাড়াও আরও তিনটি বিমানে দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। বিমানগুলোতে প্রবেশের জন্য টিকিট মূল্য ৩০ টাকা। বিমানগুলোতে প্রবেশ করলে প্রদর্শন করা হয় বিমানবাহিনীর ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র। দেখা পেলাম হান্টার বিমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিমানটি দিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের ওপর হামলা চালানো হতো। ওই সময়ে এটি খুবই শক্তিশালী এবং নির্ভরশীল বিমান ছিল। বিমানবাহিনীতে ১৯৮৯ সালে চীনের তৈরি 'এফটি-৭ বিমান' যুদ্ধবিমান হিসেবে প্রথম সংযোজিত হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৮৬ যুদ্ধবিমানটি ব্যবহার করে। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয়ে বিমানটিকে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। পরে বিমানবাহিনীর প্রকৌশল কর্মকর্তা ও টেকনিশিয়ানরা বিমানটি মেরামত করেন এবং ১৯৭২ সালে সফলভাবে উড্ডয়ন করান। বিমানটি ১৯৪৭ সালের তৈরি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ৪ ডিসেম্বর বিমানবাহিনীর বৈমানিকগণ কানাডায় নির্মিত অটার-৭২১ বিমান দিয়ে হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটিতে আঘাত হানে। সেটিও আছে এই জাদুঘরে। রয়েছে মিগ-২১ এফ এল বিমান। বিমানটি প্রধানত আকাশ প্রতিরক্ষা ও ভূমি পাহারার জন্য ব্যবহৃত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এ বিমানটি আকাশ প্রতিরক্ষা ও আকাশ থেকে ভূমিতে আক্রমণের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখে। 'ন্যাট-৯১৬ বিমান' জঙ্গি বিমানগুলোর মধ্যে সর্বাধিক হালকা এবং আয়তনে ছোট। ১৯৫০ সালে ভারতীয় বিমানবাহিনীতে এটি অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। সে সময়ে ন্যাট বিমান আকাশযুদ্ধে অত্যন্ত চৌকস বিমান হিসেবে পরিচিতি ছিল। মুক্তিযুদ্ধে তিনটি ন্যাট বিমান পাকিস্তানের তিনটি স্যাবর জেট (এফ-৮৬) ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর বগুড়ায় আকাশযুদ্ধে এ বিমানটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখে। জাদুঘরে স্থাপিত প্রতিটি নিদর্শনের সঙ্গে আছে তথ্যাবলি। আগ্রহীরা তা থেকে জেনে নিতে পারেন প্রয়োজনীয় তথ্য। মুক্তিযুদ্ধে বিমানবাহিনীর শহীদদের স্মরণ করতে তৈরি করা হয়েছে শহীদ কর্নার। জাদুঘরে দর্শনার্থীদের খাবারের সুবিধা দেয়ার জন্য প্রাঙ্গণের দক্ষিণ দিকে নির্মাণ করা হয়েছে একটি ফুড কোর্ট। এছাড়া বিমান বাহিনীর বিভিন্ন দ্রব্যাদি দিয়ে সজ্জিত হয়েছে স্যুভেনির শপ ‘নীলাদ্রি’।

শিশুদের মনোরঞ্জন ও উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য শিশু পার্কের পাশাপাশি ফুটপাথের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে জিরাফ, শিম্পাঞ্জি, হরিণ ইত্যাদি নানা রকম পশু-পাখির প্রতিকৃতি। এটার নাম দেয়া হয়েছে ‘চিলড্রেন হেভেন’। রয়েছে পানির ফোয়ারাও। এছাড়া পাহাড়ের আদলে তৈরি হচ্ছে ‘থিম পার্ক’।
বিমান জাদুঘরের সময়সূচী
বিমান বাহিনী জাদুঘর সোম থেকে বৃহস্পতিবার বেলা ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার, শনিবার ও সরকারি ছুটির দিন সকাল ১০ থেকে রাত ৯ পর্যন্ত খোলা থাকে।
