হিসাববিজ্ঞানের ছাত্রী হয়েও বেছে নিয়েছিলেন রঙ আর সৃজনশীলতার দুনিয়া। ২০১১ সালে শুরু হওয়া সেই ছোট্ট স্বপ্ন আজ ডালপালা মেলে ছড়িয়ে পড়েছে বিয়ের সাজসজ্জা থেকে শুরু করে খাদ্য, শিক্ষা ও পর্যটন সেবায়। রাজিয়া হক কনকের বহুমাত্রিক উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পই আজ তুলে ধরা হলো।
জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিনটির জন্য বর-কনের কত শত পরিকল্পনা। আলো ঝলমলে মঞ্চ, প্রিয় ফুলের সুবাসে সাজানো ফটক আর প্রিয়জনদের কলকাকলিতে ভরা একটি সন্ধ্যা। অন্য সবার কাছে এটা হয়তো কয়েক ঘণ্টার একটি পারিবারিক উৎসব। কিন্তু রাজিয়া হক কনকের কাছে এটি একটি জীবন্ত ক্যানভাস। সেই ক্যানভাসে তিনি পরম যত্নে ফুটিয়ে তোলেন দুটি পরিবারের আজীবনের রঙিন স্মৃতি।
হিসাববিজ্ঞানের জটিল হিসাব-নিকাশ ছেড়ে ২০১১ সালে যখন তিনি উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন পুঁজি ছিল শুধুই সাহস, অদম্য ইচ্ছা আর নান্দনিক ভাবনা। সেই ছোট্ট বীজটিই সময়ের ব্যবধানে মহিরুহ হয়ে উঠেছে। আজ তিনি শুধু একজন সফল নারী উদ্যোক্তাই নন, বরং দেশের ওয়েডিং ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট অঙ্গনে এক সুপরিচিত ও নির্ভরযোগ্য নাম।
উৎসবপ্রিয় বাঙালির জীবনের সবচেয়ে বড় উৎসব বিয়ে। আর এই বিয়ের আবহকে আরও নান্দনিক ও আধুনিক রূপ দিতে রাজিয়া গড়ে তোলেন তার প্রধান প্রতিষ্ঠান ‘এলিগ্যান্ট ইভেন্ট সলিউশনস’। গায়েহলুদের চিরায়ত লোকজ সাজ থেকে শুরু করে রিসেপশনের আভিজাত্যময় আলো—সবখানেই তিনি যুক্ত করেছেন আধুনিকতার ছোঁয়া।
রাজধানীর নামিদামি ভেন্যুগুলোতে বিয়ের স্বপ্নিল পরিবেশ তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি আজ প্রথম সারিতে। সেনা মালঞ্চ, আর্মি গলফ গার্ডেন, বিজিবি ব্যানকুইট হল, টোকিও স্কয়ার কনভেনশন সেন্টার, দ্য কটেজ হাউস, সেনা প্রাঙ্গণ ও বিএএফ শাহীন হলের মতো প্রিমিয়াম ভেন্যুগুলোর তালিকাভুক্ত এই প্রতিষ্ঠানটি হাজারো বর-কনের বিয়ের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়েছে। শুধু সাজসজ্জা নয়, পরিকল্পনা থেকে শুরু করে অতিথিদের আপ্যায়ন ব্যবস্থাপনা-পুরো আয়োজনটি নিখুঁতভাবে শেষ করাই রাজিয়ার মূল লক্ষ্য থাকে।
ওয়েডিং ইন্ডাস্ট্রিতে তার কাজের স্বীকৃতিও এসেছে বড় পরিসরে। তিনি পেয়েছেন ‘বেস্ট এন্টারপ্রেনার’ ও ‘বেস্ট ইন ইনোভেশন’ সম্মাননা। শুধু নিজের ব্যবসাই নয়, দেশের ওয়েডিং খাতকে আরও সুসংগঠিত ও পেশাদার রূপ দিতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ওয়েডিং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট বাংলাদেশ’-এর সহসভাপতি হিসেবে।
একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে নিজেকে আটকে রাখেননি রাজিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পা বাড়িয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন খাতে। বেকিংয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে গড়ে তুলেছেন অনলাইন বেকারি ব্র্যান্ড ‘ব্লিসফুল বাইটস’। বিশেষ করে ওয়েডিং ও উৎসবের স্পেশাল কেক এবং ডেজার্টে এটি বেশ জনপ্রিয় এবং শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ সহজ ও সঠিক করতে সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচালনা করছেন আন্তর্জাতিক এডুকেশন কনসালট্যান্সি ‘এমএমএস গ্লোবাল সার্ভিসেস’। এছাড়াও ব্যবস্থাপনা অংশীদার হিসেবে যুক্ত আছেন ‘যাদ আল হারামাইন’-এর সঙ্গে, যা হজযাত্রী ও ওমরাহ পালনকারীদের নির্ভরযোগ্য ও নির্বিঘ্ন সেবা দিয়ে থাকে।
নিজের এই দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় পথচলা নিয়ে রাজিয়া হক কনক বলেন, উদ্যোক্তা হওয়া মানে কেবল মাস শেষে কত টাকা লাভ হলো সেই হিসাব নয়। এর প্রকৃত অর্থ হলো নতুন কিছু তৈরি করা, সমাজে মূল্য যোগ করা এবং এমন একটি ব্র্যান্ড গড়ে তোলা, যা মানুষের হৃদয়ে আজীবন আস্থার প্রতীক হয়ে থাকবে।
ভবিষ্যতে নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সুসংহত করার পাশাপাশি নতুন নতুন সৃজনশীল ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করতে চান তিনি। হাজারো পরিবারের আনন্দ-উৎসবে রঙ ছড়িয়ে যাওয়া এই উদ্যোক্তা নিজের গল্প দিয়েই প্রমাণ করছেন- সততা, সৃজনশীলতা আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
