চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে উত্তাপ বাড়ছে। চুক্তি বাতিলের দাবিতে বন্দর এলাকায় গণঅনশন ও বিক্ষোভ করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার আগে শ্রমিকদের স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রভাব ও জনমত যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, এই চুক্তির ফলে বন্দরের পরিচালনাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাষ্ট্রের ভূমিকা, দেশীয় কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদে বন্দর থেকে অর্জিত অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাদের দাবি, বন্দর পরিচালনায় দক্ষতা ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন থাকলেও তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ইজারাই একমাত্র পথ নয়। দেশীয় দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যমান কাঠামো আধুনিকায়নের মাধ্যমেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব।
গতকাল সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ১১টা থেকে চট্টগ্রাম নগরের কাস্টমস ভবনের বিপরীতে এই কর্মসূচি শুরু হয়। ‘বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ এবং ‘জাতীয়তাবাদী বন্দর রক্ষা কমিটি ও শ্রমিক দল’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে বন্দর রক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ, শ্রমিক নেতা ও সাধারণ কর্মচারীরা অংশ নেন। দিনব্যাপী গণঅনশন থেকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানানো হয়।
চুক্তি ঘিরে কেন এই অসন্তোষ: আন্দোলনকারী নেতাদের ভাষ্য, গত ৮ অক্টোবর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর বন্দর এলাকায় অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের অভিযোগ, বন্দর ব্যবহারকারী, শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই চুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে বন্দরের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্নে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শ্রমিক নেতারা মনে করছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর পরিচালনা পদ্ধতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু বিনিয়োগ বা পরিচালনাগত দক্ষতার হিসাব যথেষ্ট নয়। চুক্তির শর্ত, আর্থিক দায়বদ্ধতা, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, মুনাফা বণ্টন, শ্রমিকদের অধিকার এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাদের প্রশ্ন, দীর্ঘ ১৫ বছরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার আগে বিকল্প ব্যবস্থাগুলো কতটা যাচাই করা হয়েছে? দেশীয় ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নের সম্ভাবনা কতটা খতিয়ে দেখা হয়েছে? চুক্তির আর্থিক ও প্রশাসনিক শর্তগুলো কতটা স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে? এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব ছাড়া চুক্তি নিয়ে আস্থা তৈরি করা কঠিন বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা। তবে আন্দোলনকারীদের এসব অভিযোগ ও আশঙ্কার বিপরীতে সরকারের অবস্থান, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। কেবল প্রতিবাদকারীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে চুক্তির অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তাগত প্রভাব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন: গণঅনশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, দেশের প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বারের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দীর্ঘমেয়াদে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভৌগোলিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে। তাদের মতে, বন্দর আধুনিকায়ন এবং পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সে লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি নির্ধারণে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দেশের শিল্পের কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য এবং রপ্তানিপণ্য পরিবহনে এই বন্দরের কার্যকারিতা সরাসরি প্রভাব ফেলে। বন্দরে দীর্ঘসূত্রতা, পরিচালনাগত অদক্ষতা কিংবা ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন ও পণ্যমূল্যের ওপর।
অন্যদিকে, দক্ষ পরিচালনা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সময় কমানো এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমে গতি আনার সুযোগও রয়েছে। এই বাস্তবতায় এনসিটির ইজারা নিয়ে বিতর্কের মূল প্রশ্ন শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া যাবে কি না, তা নয়। বরং চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ কী ধরনের আর্থিক সুবিধা পাবে, বন্দরের ওপর রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কীভাবে বজায় থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হবে, সেগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, আধুনিকায়নের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয়, যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে দেশীয় ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাদের মতে, যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি।
দুই শতাধিক কর্মচারীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ: আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বন্দরে কর্মরত কর্মীদের চাকরি ও জীবিকার নিরাপত্তার বিষয়টি। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব গেলে সেখানে কর্মরত দুই শতাধিক কর্মচারীর কাজের ধরন, দায়িত্ব, চাকরির শর্ত এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান কীভাবে নির্ধারিত হবে, সে বিষয়ে তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা নেই। শ্রমিকদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত কর্মীদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কীভাবে কাজে লাগানো হবে?
পরিচালনাগত পরিবর্তনের ফলে কারো দায়িত্ব পরিবর্তিত হলে তার চাকরি, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে? বিদ্যমান কর্মীদের পুনর্বিন্যাস, প্রশিক্ষণ কিংবা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকবে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে শ্রমিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ, একটি টার্মিনালের পরিচালনা পদ্ধতি পরিবর্তন শুধু অবকাঠামো বা যন্ত্রপাতির ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে কর্মীদের দায়িত্ব, কর্মপরিবেশ, শ্রম অধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি জীবিকার বিষয়ও যুক্ত থাকে।
ইজারা নয়, দেশীয় ব্যবস্থাপনার দাবি: আন্দোলনকারীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিচালনার দায়িত্ব কোনো বিদেশি কোম্পানিকে দীর্ঘমেয়াদে দেওয়া উচিত নয়। তাদের দাবি, বর্তমান কাঠামোর মধ্যে থেকেই বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো অথবা দক্ষ দেশীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এনসিটির কার্যক্রম পরিচালনা করা হোক।
তাদের মতে, বন্দরের আধুনিকায়নের জন্য উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু পরিচালনার দায়িত্ব দীর্ঘমেয়াদে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশীয় বিকল্পের সক্ষমতা ও সম্ভাব্য ব্যয় তুলনামূলকভাবে মূল্যায়ন করা দরকার।
অন্যদিকে, কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে যুক্তি থাকলে তার ভিত্তিও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তুলে ধরা প্রয়োজন। সম্ভাব্য বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, পরিচালন ব্যয়, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হলে জনপরিসরে যুক্তিনির্ভর আলোচনা সম্ভব হবে। অর্থাৎ, বিতর্কের নিষ্পত্তি শুধু পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্যের মাধ্যমে হওয়া উচিত নয়। চুক্তির শর্ত, আর্থিক হিসাব, সম্ভাব্য সুবিধা-অসুবিধা এবং বিকল্প ব্যবস্থার তুলনামূলক মূল্যায়ন সামনে আনতে হবে।
জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি: এনসিটির ইজারা নিয়ে চলমান আন্দোলন রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এনেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকারের দায়িত্ব হবে চুক্তি সম্পর্কে জনসাধারণের উদ্বেগের জবাব দেওয়া এবং কোন বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করা। বিশেষ করে চুক্তির মেয়াদ, আর্থিক শর্ত, পরিচালনাগত দায়িত্ব, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কর্মীদের চাকরির সুরক্ষা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে চুক্তির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফল এবং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মূল্যায়নও জনসমক্ষে তুলে ধরা জরুরি। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা এবং তাদের উদ্বেগের প্রতিকার নিশ্চিত করা হলে পরিস্থিতি শান্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রয়োজনে সরকার, বন্দর কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি, বন্দর ব্যবহারকারী ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে আলোচনা হতে পারে। এতে চুক্তি নিয়ে যেসব প্রশ্ন রয়েছে, সেগুলোর তথ্যভিত্তিক সমাধান খুঁজে বের করা সহজ হবে।
আরো কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি: গণঅনশন থেকে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করা না হলে আরো কঠোর ও ধারাবাহিক কর্মসূচি দেওয়া হবে। তাদের দাবি, জাতীয় স্বার্থ ও শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত না করে কোনোভাবেই এই চুক্তি বহাল রাখা যাবে না। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারা নিয়ে বিরোধ আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির সমাধানে একদিকে যেমন বন্দর পরিচালনার দক্ষতা ও আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে হবে, অন্যদিকে তেমনি শ্রমিকদের অধিকার, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
বিআলো/অর্নব