আজ সন্ধ্যায় মতি মিয়ার চোখ তুলে ফেলা হবে। খেজুরের কাঁটা দিয়ে।
হুমায়ূন আহমেদের ‘চোখ’ গল্পের মতি মিয়া চোর। মারধরে তার শরীর ভেঙে গেছে, তবু শাস্তি শেষ হয়নি। চোখ তুলে ফেলার খবর ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ জড়ো হচ্ছে।
আমার ভয় তাই শুধু মতি মিয়াকে নিয়ে নয়; যারা দেখতে এসেছে, তাদের নিয়েও। কোন মুহূর্তে একজন মানুষ ‘চোর’ হয়ে যাওয়ার পর তার চোখ আর চোখ থাকে না, তার ব্যথা আর ব্যথা থাকে না? কোন অজানা সময়ে আমরা হত্যাযোগ্য হয়ে যাই, কিংবা হত্যার উল্লাসে যোগ দিই?
অপরাধকে আমরা সাধারণত আইনের ভাষায় বুঝি। রাষ্ট্র যে কাজ নিষিদ্ধ করেছে এবং শাস্তিযোগ্য করেছে, সেটিই অপরাধ। কিন্তু নৃবিজ্ঞান একটু পেছনে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, আইনটি কে বানাল? কোন ক্ষতিকে অপরাধ বলা হলো, কোন ক্ষতি আইনের বাইরে রইল? কাকে অপরাধী হিসেবে দেখা সহজ, আর কার অপরাধ পদ, শিক্ষা, অর্থ ও সামাজিক মর্যাদার আড়ালে ঢাকা পড়ে?
একজন মানুষ চুরি করেছে—এটি এক প্রশ্ন। ‘বস্তির লোক তো অপরাধ করবেই’—এটি অন্য প্রশ্ন। এখানে ঠিকানা থেকে চরিত্র তৈরি করা হয়েছে। আর রাষ্ট্র? রাষ্ট্র নিজে কি কখনো অপরাধী হয় না?
এই জটিলতা এক শীতের সকালে হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্লাসে বুঝেছিলাম। বাইরে তুষার, সকাল আটটার ক্লাস। একজন ফিলিপিনো অধ্যাপক ম্যানিলার হত্যাকাণ্ড এবং জাপানের আত্মহত্যার পরিসংখ্যান দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কোন সমাজ বেশি সহিংস?
আমরা হত্যার দিকে তাকালাম। তিনি আত্মহত্যার দিকে তাকাতে বললেন। একজন আরেকজনকে হত্যা করলে আমরা সহিংসতা দেখি; কিন্তু দীর্ঘ অপমান, বিচ্ছিন্নতা, ঋণ, ভয় বা অসহায়তার মধ্যে একজন নিজেকে শেষ করলে তার সামাজিক ইতিহাসটিকে কোথায় রাখব?
সেই তর্ক আমাকে শিখিয়েছিল—সহিংসতা শুধু রক্তের দাগ নয়; তার আগেও একটি সমাজ থাকে, তার পরেও আরেকটি সমাজের জন্ম হয়।
এই কারণেই অপরাধবিদ্যা ও অপরাধ-মনোবিজ্ঞান জরুরি, কিন্তু যথেষ্ট নয়। নৃবিজ্ঞান জানতে চায়, একজন মানুষ কোন পৃথিবীতে বড় হয়েছে; কোন অপমানের প্রতিশোধ সম্মানের, কে সন্দেহভাজন, কোন শাস্তি ন্যায্য, পুলিশ ও আদালতের ওপর তার আস্থা কতটুকু। মানুষ শুধু মাথার ভেতরে বাস করে না; সে পরিবার, শ্রেণি, ধর্ম, রাষ্ট্র, বাজার, পাড়া, স্মৃতি ও রাজনীতির মধ্যে বাস করে।
এই জগতকে আমি নৈতিক বাস্তুসংস্থান হিসেবে পড়তে চাই। একটা সমাজের নৈতিক বাস্তুসংস্থান শুধু মুখে বলা ভালো-মন্দ নয়। মানুষ ঘরে কী করে, রাস্তায় কী করে, সন্তানকে কী শেখায়, কর্মচারীকে কীভাবে দেখে, ক্ষমতার সামনে কীভাবে আচরণ করে, ফেসবুকে কাকে গালি দেয়, নিজের পক্ষের অন্যায়কে কী নামে ডাকে—সবই এর অংশ। আমরা প্রতিদিন ঠিক করছি কে সম্মানযোগ্য, কে সন্দেহজনক, কার কথা বিশ্বাসযোগ্য, কার মৃত্যুতে শোক করা হবে, আর কার ওপর সহিংসতা হলে বলা যাবে, ‘ঠিকই হয়েছে।’
ছোট অপরাধীকে ধরা যায়; বড় ক্ষমতার সামনে সাধারণ মানুষ নিজেকে অক্ষম দেখে। এই অক্ষমতাও মব বোঝার একটি দরজা হতে পারে। যে মানুষ বড় অন্যায়ের সামনে কিছু করতে পারে না, সে রাস্তায় ‘চোর’ বলে ঘিরে রাখা দুর্বল একজন মানুষের সামনে হঠাৎ হয়ে ওঠে শক্তিমান। জনতা তাকে সংখ্যা দেয়, শত্রু দেয়, বিচার করার অনুভূতি দেয়।
এই নৈতিক বাস্তুসংস্থান বুঝতে সাহিত্য পড়তে হয়। দিলারা হাশেম দেখান কামনা, দাম্পত্য, সম্পত্তি, প্রবাস ও শ্রেণি মিলে শরীরের স্বাধীনতার সীমা তৈরি করে; হুমায়ূন আহমেদের মতি মিয়া দেখায়, ‘চোর’ নামটি কখন মানুষের ব্যথার মূল্যও কমিয়ে দেয়। রিজিয়া রহমান প্রান্তিক মানুষকে ইতিহাসের কেন্দ্রে আনেন; আখতারুজ্জামান ইলিয়াস দেখান, নিপীড়িত মানুষও একরঙা নৈতিক সত্তা নয়।
সেলিনা হোসেন ঘরের মধ্যেও দর-কষাকষি ও প্রতিরোধ দেখান; হুমায়ুন আজাদ দেখান রাষ্ট্র, ধর্ম, দেশ বা মতাদর্শের ভাষায় নিষ্ঠুরতাও ন্যায় বা কর্তব্যের রূপ নিতে পারে।
আকিমুন রহমান শরীরের ওপর সামাজিক নজরদারি দেখান; শাহীন আখতার দেখান যুদ্ধ শেষ হলেও তার ক্ষত শরীর ও স্মৃতিতে থাকে। নাসরীন জাহান মানুষকে নিপীড়িত বা মুক্ত—এই দুই সহজ ভাগের বাইরে সম্পর্কের দ্বিধা, আঘাত ও সহাবস্থানের মধ্যে রাখেন।
কিন্তু আমাদের নৈতিক বাস্তুসংস্থানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রকে বাদ দেওয়া যায় না। দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধিতা, সমালোচনা ও ভিন্নমতকে মামলা, গ্রেপ্তার, গুম, ভয় এবং ডিজিটাল নজরদারির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
মানবাধিকার সংস্থাগুলো ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত শত শত গুম, বিরোধী নেতাকর্মীদের গণগ্রেপ্তার এবং মতপ্রকাশ দমনের নথি রেখেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সেই উল্লম্ব সহিংসতা বিস্ফোরক রূপ নেয়, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর বলেছে, সাবেক সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সহিংস অংশগুলো প্রতিবাদ দমনে পদ্ধতিগত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল।
এখানে একটি ভুল করা যাবে না। স্বৈরতান্ত্রিক দমন ছিল, তাই আজকের মব—এমন সরল সমীকরণ প্রমাণিত নয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র যখন বিরোধীকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অপরাধী, শত্রু বা হুমকি হিসেবে পড়তে শেখায়; যখন ভয়, আনুগত্য ও নীরবতা টিকে থাকার কৌশল হয়; তখন সেই ভাষা সমাজের শরীরেও জমা হয়।
তারপর সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও যখন মানুষকে শরীর, জীবন ও রাস্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে হয়, তখন সমাজ শক্তি, জনতা, ঘেরাও, প্রতিরোধ ও শাস্তির নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে। সরকার বদলালেই এই শেখা অভ্যাস মুছে যায় না। রাষ্ট্রের উল্লম্ব সহিংসতার কিছু ভাষা নাগরিক-নাগরিক সম্পর্কেও নেমে আসতে পারে।
এ কারণেই ২০২৫ সালে গণপিটুনিতে ১৯৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য—২০২৪ সালের ১২৮ থেকে বেশি—শুধু আইনশৃঙ্খলার সংখ্যা নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বোধের প্রশ্নও। পরবর্তী সরকারও পুরোনো অভ্যাস থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি; মানবাধিকার সংস্থাগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নির্বিচার আটক ও ব্যাপক অপরাধমূলক মামলার সমালোচনা করেছে। অর্থাৎ শাসক বদলায়, কিন্তু অপরাধীকরণের ব্যাকরণ সহজে বদলায় না।
এই চোখ নিয়ে ঢাকার বস্তিতে যান। যে মানুষগুলো গুলশান-বনানীর বাড়ি পরিষ্কার করেন, গাড়ি চালান, নিরাপত্তা দেন, নির্মাণকাজ করেন, রিকশা চালান, তারাই শহরের অনিরাপদ আবাসে থাকেন। ২০২৫ সালে কড়াইলের বড় আগুনটি ছিল দুই বছরের মধ্যে চতুর্থ বড় অগ্নিকাণ্ড। আমরা বলি, ‘বস্তি তো, আগুন লাগবেই।’ কিন্তু একই শ্রেণির মানুষকে বারবার এমন ঝুঁকিতে রাখা কি কেবল দুর্ঘটনা, নাকি আমাদের নৈতিক অভ্যাসেরও অংশ? আগুন বস্তিতে আটকে থাকেনি; বেইলি রোডেও পৌঁছেছে। সমাজের আগুনও কি তেমনি?
শ্রেণি অপরাধ দেখার চোখ বদলায়। দরিদ্র একজন মানুষ আপনার বাসা থেকে তিন লাখ টাকার মাল নিলে সে চোর। কিন্তু উচ্চপদস্থ, শিক্ষিত, ক্ষমতাবান কেউ প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক বা রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করলে আমরা কি তাকে একইভাবে চোর বলি?
ছোট অপরাধীকে ধরা যায়; বড় ক্ষমতার সামনে সাধারণ মানুষ নিজেকে অক্ষম দেখে। এই অক্ষমতাও মব বোঝার একটি দরজা হতে পারে। যে মানুষ বড় অন্যায়ের সামনে কিছু করতে পারে না, সে রাস্তায় ‘চোর’ বলে ঘিরে রাখা দুর্বল একজন মানুষের সামনে হঠাৎ হয়ে ওঠে শক্তিমান। জনতা তাকে সংখ্যা দেয়, শত্রু দেয়, বিচার করার অনুভূতি দেয়।
...আমাদের নৈতিক বাস্তুসংস্থানের ছেড়া জায়গাটি সম্ভবত এখানেই। কেউ কাঁটা হাতে দাঁড়িয়ে, কেউ দেখছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ ন্যায্যতা প্রমাণ করছে। আর এত মানুষের মধ্যে যদি এখনো কেউ বলতে পারে—থামুন, সে অপরাধী হতে পারে, তার বিচার হোক; কিন্তু আগে মানুষটাকে মানুষ হিসেবেই দেখি—তাহলেই হয়তো এই ছিন্ন পতাকার সেলাই শুরু হতে পারে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও সেই নৈতিকতা আছে। মোটরসাইকেল ফুটপাতে উঠে পথচারীকেই হর্ন দেয়। নিজের শিশুর পোশাকহীন ছবি অনলাইনে দিয়ে দিই—তার ভবিষ্যৎ গোপনীয়তা বা সম্মতির কথা না ভেবেই। আমরা বলি, ‘সবাই তো করে।’ সহিংসতা সবসময় বাঁশ বা ছুরি হাতে শুরু হয় না; কখনো শুরু হয় নীরবতায়, বেছে বেছে প্রতিবাদে, কিংবা একটি অধিকারের বোধে—আমি পারি, আপনি সরে যান।
ক্ষতিপূরণের অঙ্কও আমাদের নৈতিক কল্পনাকে পরীক্ষা করে। বারিধারায় ২৪ বছরের নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানের গাড়িচাপায় মৃত্যুর ঘটনায় নয় লাখ টাকার আপসনামা সামনে আসে। জুলাই অভ্যুত্থানে স্বীকৃত শহিদ পরিবারের জন্য রাষ্ট্র ৩০ লাখ টাকা সহায়তা নির্ধারণ করেছে। ক্ষতিপূরণ দরকার; কিন্তু নয় লাখ, দশ লাখ বা ত্রিশ লাখ কোনো মানুষের দাম নয়, বিচারও নয়। একইভাবে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া চিঠিতে দীর্ঘ অসুস্থতা ও বেকারত্বের যন্ত্রণা পাওয়া যায়। আত্মহত্যার কারণ কখনো একটিতে নামানো যায় না, কিন্তু কাজ, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সামাজিক আশার সঙ্গে মানুষের অস্তিত্বের সম্পর্কও অস্বীকার করা যায় না।
বাংলাদেশের সমস্যা তাই নৈতিকতা নেই—এটি নয়। বরং শাস্তিমুখী বহু নৈতিকতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেক পক্ষের শত্রু, শহীদ, ক্ষোভ ও ন্যায়ের নিজস্ব সংজ্ঞা আছে। বিপদ হয় যখন ন্যূনতম যৌথ সীমা ভেঙে যায়, কাউকে পিটিয়ে মারা যাবে না; নারীর পোশাক সহিংসতার অনুমতি নয়; শিশুর শরীর কারও সম্পত্তি নয়; বস্তির মানুষের জীবন কম মূল্যবান নয়; গরিবের চুরি অপরাধ হলে ক্ষমতাবানের লুটও অপরাধ; আমার কষ্ট আমাকে ন্যায় চাইতে শেখায়, অন্যের ওপর সীমাহীন কর্তৃত্ব দেয় না।
তাই আবার মতি মিয়ার কাছে ফিরি। সন্ধ্যা হয়েছে। কাঁটা প্রস্তুত। মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। আসল ভয় এই নয় যে তারা আইন জানে না; ভয় হলো, তারা হয়তো নিজেদের অন্যায়কারীই মনে করছে না।
প্রিয় বাংলাদেশ, আমাদের নৈতিক বাস্তুসংস্থানের ছেড়া জায়গাটি সম্ভবত এখানেই। কেউ কাঁটা হাতে দাঁড়িয়ে, কেউ দেখছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ ন্যায্যতা প্রমাণ করছে। আর এত মানুষের মধ্যে যদি এখনো কেউ বলতে পারে—থামুন, সে অপরাধী হতে পারে, তার বিচার হোক; কিন্তু আগে মানুষটাকে মানুষ হিসেবেই দেখি—তাহলেই হয়তো এই ছিন্ন পতাকার সেলাই শুরু হতে পারে।
খেয়াল করেছেন কি অপরকে ও নিজেকে মানুষ হিসেবে দেখা এ সমাজে কতটা কঠিন হয়ে পড়েছে?
ড. মঈন জালাল চৌধুরী : নৃবিজ্ঞানী ও শিক্ষক
