প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা যদি সত্য হয়, তাহলে আটলান্টিক মহাসাগরের নাম হয়ে যাবে ট্রাম্প মহাসাগর। মুখের কথায় বিশ্বের কত কিছুরই না নাম বদলে ফেলেছেন ট্রাম্প।
মনে হয়, সবকিছুর নামই হতে হবে তাঁর নামে! বাংলাদেশেও মাঝেমধ্যে ‘সবই হবে আমাদের নামে’—এমন ঢেউ ওঠে।
আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ ও নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি নিয়ে খুব কমই লেখালেখি হয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশে কত কিছুর নাম পরিবর্তন করতে হয়েছে বা করা হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশই কি এখনো সবার সেরা?
বাংলাদেশে প্রথম দফায় নাম পরিবর্তন শুরু হয় স্বাধীনতার পরপরই—আইনি বাধ্যবাধকতা ও যৌক্তিক কারণেই। পাকিস্তান বা পূর্ব পাকিস্তানের নামে যেসব প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা ছিল, সেগুলোর নাম পরিবর্তন করতে হয়েছিল।
কেউ তা করেছেন খুশি মনে, কেউবা বেজার মনে। এমনকি পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর নামও বদলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী করতে হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ হয়ে গেল বাংলাদেশ মুসলিম লীগ।
আওয়ামী লীগ পাকিস্তান থেকে উধাও হয়ে গেল; বাংলাদেশে দলটির নাম হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বিএনপির তখনো জন্ম হয়নি, তাই তাদের এসব ঝামেলা পোহাতে হয়নি।
তখন সংবাদপত্র দৈনিক পাকিস্তানের নাম হয়ে গেল দৈনিক বাংলা। পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ের নাম করা হলো বাংলাদেশ রেলওয়ে।
জিন্নাহ অ্যাভিনিউয়ের নাম হলো বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। এ রকম আরও কত প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম যে স্বাধীনতার পর পরিবর্তন করা হয়েছিল!
এরপর পর্যায়ক্রমে নতুন নতুন সরকার এসেছে। প্রায় প্রতিবারই রাজনৈতিক কারণে বা অকারণে বদলে গেছে অনেক স্থাপনার নাম। আবার নতুন স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছে দলীয় নেতাদের নামে।
বিএনপি আমলে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম নতুন করে রাখা হলো জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। আওয়ামী লীগ আমলে তা বদলে করা হলো হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
শাহবাগে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব পোস্টগ্র্যাজুয়েট অ্যান্ড রিসার্চের নাম ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হয়ে গেল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
২০২৫ সালে ইউনূস সরকারের সময় এর নাম আবার পরিবর্তন করে রাখা হলো বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
হাসিনা সরকারের ১৫ বছরে পারিবারিক নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নামকরণের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল।
মনে করা হয়েছিল, বঙ্গবন্ধুর নামে যত বেশি স্থাপনা করা যাবে, ততই তাঁকে আরও উচ্চতায় নেওয়া যাবে! একপর্যায়ে এসব নামকরণ দারুণ অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কিন্তু তখন বিতর্ক বা প্রতিবাদ করার সুযোগ ছিল না।
জুলাই আন্দোলনের পর যখন প্রতিবাদ করার সুযোগ পাওয়া গেল, তখন নাম পরিবর্তনের প্রতিবাদটিও আরও অগ্রহণযোগ্য ও অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেল।
ঢালাওভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম আবার পরিবর্তন করা হলো—অনেকটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে। সামান্য একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হলো শাহ আজিজুর রহমান হল।
তখন মবের মাধ্যমে নাম পরিবর্তনের যে উৎসব হয়েছিল, তা তালিকাভুক্ত করতে গেলে অনেক কাগজের প্রয়োজন হবে।

বর্তমান সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীও নিজ এলাকায় তিনটি ইউনিয়নের নাম নিজের পরিবারের সদস্যদের নামে করেছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ওই নামগুলো বাতিল করে দেওয়া হয়।
তবে বাংলাদেশে নাম পরিবর্তনের এটাই যে শেষ পর্ব, তা কেউ হলফ করে বলতে পারবেন না। রাজনৈতিক কারণে নাম পরিবর্তনের এই সংস্কৃতি আমাদের দেশে সম্ভবত চলতেই থাকবে।
নাম পরিবর্তনের প্রথা এখন আর শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সুদূর যুক্তরাষ্ট্রেও এর ঢেউ লেগেছে। দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্থাপনার নাম নিজের নামে করার ব্যাপারে দারুণ উৎসাহ দেখিয়েছেন ট্রাম্প।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি সফল হয়েছেন, আবার তাঁর অনেক চেষ্টা ব্যর্থও হয়েছে। অবশ্য নাম নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আচ্ছন্নতা নতুন কিছু নয়।
নিজের নাম নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গরিমার কথা বিশ্বজুড়েই পরিচিত। পৃথিবীর বড় বড় শহরে অনেক হোটেল কিংবা বাণিজ্যিক বহুতল ভবনের শীর্ষে দেখা যায় ‘ট্রাম্প’ নামটি।
ইরান যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির নাম বদলে ট্রাম্প প্রণালি রাখলেন। হরমুজের নাম পরিবর্তনের কথা ট্রাম্পের মুখে শোনার পর ইরান প্রণালিটির ওপর আরও জোরালোভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করল।
শিকাগো শহরে রয়েছে ৯৮ তলা ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেল। নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের ফিফথ অ্যাভিনিউয়ে ৫৮ তলার আকাশচুম্বী ভবন ‘ট্রাম্প টাওয়ার’ দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের নামের মহিমা বয়ে বেড়াচ্ছে।
কিন্তু এখন ট্রাম্পের মনোযোগ আকাশচুম্বী অট্টালিকার চেয়েও আরও প্রসিদ্ধ কিছুর দিকে।
ইরান যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির নাম বদলে ট্রাম্প প্রণালি রাখলেন। হরমুজের নাম পরিবর্তনের কথা ট্রাম্পের মুখে শোনার পর ইরান প্রণালিটির ওপর আরও জোরালোভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করল।
ওয়াশিংটন ডিসির কেনেডি সেন্টার একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ‘জীবন্ত স্মৃতি’ হিসেবে পরিচিত।
সম্প্রতি কেনেডি সেন্টার দারুণ আর্থিক সমস্যায় পড়েছে। ট্রাম্প বললেন, তাঁর নাম যুক্ত করা হলেই কেবল তিনি আর্থিক সহায়তা দেবেন। রাতারাতি নামফলকে ট্রাম্পের নাম যুক্ত করা হলো।
পুরো স্থাপনার নাম দেওয়া হলো ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প প্লাজা’। কিন্তু বাধা এল ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট থেকে।

আদালত রায় দিলেন, কেনেডি ছাড়া অন্য কারও নাম দেওয়া যাবে না। ফলে নাম পরিবর্তনের এই প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হলেন ট্রাম্প।
গত বছর ট্রাম্প ‘গালফ অব মেক্সিকো’র নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘গালফ অব আমেরিকা’। এই পদক্ষেপের ফলে মেক্সিকোর সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ে।
সংবাদ সরবরাহকারী সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) নতুন নামটি ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে এপির ওপর দারুণ নাখোশ হন ট্রাম্প।
এ ছাড়া আগস্ট মাসে নিউইয়র্ক ও কানাডার মধ্যবর্তী ‘লেক অন্টারিও’র নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখেন ট্রাম্প। বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে কানাডা সরকারের সঙ্গে বিরোধ চলাকালেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজ দেশের সীমানার মধ্যে বিভিন্ন ভৌগোলিক স্থানের নাম পরিবর্তন করতে পারেন।
গুগল ম্যাপসহ বেশির ভাগ অনলাইন মানচিত্র ও দিকনির্দেশনা সেবা প্রদানকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাধারণত ট্রাম্পের দেওয়া নতুন নামগুলো মেনে নিয়েছে। তবে ম্যাপকোয়েস্ট জানিয়েছে, তারা পুরোনো নামই ব্যবহার করবে।
কয়েক দিন আগে এক সভায় ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমাদের উপসাগর আছে। আমাদের একটি সুন্দর হ্রদ আছে...। এখন আমাদের একটি নদী দরকার। আমাদের একটি মহাসাগর দরকার।’
সভায় তিনি আটলান্টিক বা প্রশান্ত মহাসাগরের যেকোনো একটির নতুন নামকরণ নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, নতুন নামটি তাঁর সম্মানে হতে পারে—‘আমরা এর নাম দেব ট্রাম্প মহাসাগর বা আমেরিকার মহাসাগর, এ ধরনের কিছু একটা।’
অনেকে মনে করেন, এটি ছিল ট্রাম্পের রসিকতা। কিন্তু যাঁরা ট্রাম্পকে চেনেন, তাঁরা বলবেন, এটাই তাঁর মনের কথা।
এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ড ও নিউ মেক্সিকোর নাম পরিবর্তন নিয়েও কথা বলেছেন ট্রাম্প। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) নামটিও তাঁর পছন্দ নয়। তিনি এর পরিবর্তে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ (এসআই) নাম রাখার প্রস্তাব করেছেন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হতে এখনো দুই বছর বাকি। এর মধ্যে তাঁর নাম পরিবর্তনের কর্মতৎপরতা যে অব্যাহত থাকবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
সব হিসাব-নিকাশ বিবেচনায় নিলে নাম পরিবর্তনে বাংলাদেশকেই চ্যাম্পিয়ন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রানারআপ বলতে হবে।
তবে ট্রাম্প যদি আরও কয়েক মেয়াদ প্রেসিডেন্ট থাকতে পারতেন, তাহলে সম্ভবত তিনি বাংলাদেশের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারতেন।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ই-মেইল: salehpublic711@gmail.comমতামত লেখকের নিজস্ব
