দুই বোনের হাত ধরে একসঙ্গে বেড়ে ওঠার কথা ছিল। একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা আর হাসি-আনন্দে মুখর করে রাখার কথা ছিল বাড়ির আঙিনা। কিন্তু মুহূর্তের এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় সব স্বপ্ন থেমে গেল। পুকুরের পানিতে ডুবে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল দুই বোন সামিয়া (৯) ও সানিয়া (৭)। এক বোন বিপদে পড়ে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিল, তাকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিল বড় বোন। কিন্তু ছোট বোনকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও আর ফিরে আসতে পারেনি সামিয়া। দুই শিশুর এমন করুণ মৃত্যুতে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার আসাদনগর গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার ভানী ইউনিয়নের আসাদনগর গ্রামের পূর্বপাড়া ভূঁইয়াবাড়িতে মরহুম সিরাজুল ইসলাম মাস্টারের বাড়ির পুকুরে এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। নিহত দুই শিশু ওই বাড়ির ইলেকট্রিশিয়ান বিল্লাল হোসেন ভূঁইয়ার মেয়ে।
স্বজনদের বরাত দিয়ে জানা যায়, দুপুরে দুই বোন বাড়ির পুকুরে গোসল করতে যায়। গোসলের একপর্যায়ে ছোট বোন সানিয়া ঘাটলার সিঁড়ি থেকে পিছলে গভীর পানিতে পড়ে যায়। ছোট বোনকে ডুবে যেতে দেখে তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যায় বড় বোন সামিয়া। কিন্তু তাকে ধরতে গিয়ে সামিয়াও সিঁড়ি থেকে পিছলে পানিতে তলিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে দুই শিশুর জীবন কেড়ে নেয় পুকুরের পানি।
নিহতদের স্বজন ব্যাংক কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাদের চাচাতো চাচা হুমায়ুন কবির ওই পুকুরে গোসল করতে নামেন। এ সময় পানির নিচে তাঁর পায়ে একটি শিশুর দেহ স্পর্শ করলে সন্দেহ হয়। পরে তিনি পানির নিচ থেকে সামিয়ার অচেতন দেহ উদ্ধার করেন। এরপর পুকুরে খোঁজাখুঁজি করে ছোট বোন সানিয়ার দেহও উদ্ধার করা হয়।
দুই শিশুকে উদ্ধার করে দ্রুত চান্দিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান স্থানীয়রা। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কর্তব্যরত চিকিৎসক দুই বোনকেই মৃত ঘোষণা করেন। স্বজনদের আহাজারি আর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। যে দুই শিশুর হাসি-খেলায় বাড়ি মাতোয়ারা থাকার কথা, তাদের নিথর দেহ ফিরল বাড়িতে—এ শোক কোনো সান্ত্বনাতেই যেন পূরণ হওয়ার নয়।
একই বাড়ির শিরিন আক্তার জানান, বিল্লাল হোসেনের তিন মেয়ের মধ্যে সামিয়া ও সানিয়া ছিল বড়। দুই বোনের ছোট বোন মরিয়ম আক্তারের বয়স মাত্র দুই বছর। সামিয়া আসাদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে এবং সানিয়া একই বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়ত। এখনো শৈশবের অনেক কিছুই বুঝে ওঠার আগেই দুই বোনের স্কুলজীবন ও ছোট্ট পৃথিবী থেমে গেল চিরতরে।

এ বিষয়ে শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান জানান, তিনি সাংবাদিকের কাছ থেকে ঘটনাটি শুনেছেন। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি বলেন, দুই শিশুর দাফনও সম্পন্ন হয়েছে। তারপরও বিষয়টি খোঁজখবর নিতে একজন উপপরিদর্শককে (এসআই) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সামিয়া ও সানিয়ার মৃত্যুতে আসাদনগর গ্রামজুড়ে শোকের আবহ বিরাজ করছে। দুই বোনের এমন করুণ বিদায় পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। ছোট্ট মরিয়মের জীবনে দুই বোনের শূন্যতা আর মা-বাবার বুকের হাহাকার—এই শোকের ভার বহন করা যে কতটা কঠিন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
কে
