যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা তুলে নেওয়ার অভিযোগ তুলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ঘোষণা দিয়েছেন, তারা রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে আবারো হামলা শুরু করবেন।
বুধবার রাতে (১৪ অক্টোবর) ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, ওয়াশিংটনের অনুরোধে তিনি ৩ দিন এমন হামলা বন্ধ রেখেছিলেন, অথচ এর মধ্যেও রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে গেছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমাদের ধৈর্য শেষ।”
জেলেনস্কি আরো অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির একটি চুক্তির পর পুরোপুরি হামলা বন্ধে কিয়েভের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ওয়াশিংটন রাশিয়ার হামলা সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত স্টারলিংক স্যাটেলাইট সেবার গতি কমানোটাও ইচ্ছাকৃত ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, রবিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত তথাকথিত ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’-তে তিনি রাজি হবেন, যদি মস্কোও তা মেনে চলে।
তবে জেলেনস্কির অভিযোগ, জ্বালানি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবটি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাশিয়া তা লঙ্ঘন করে হামলা চালায়, এতে ৬ লাখ ইউক্রেনীয় বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। এছাড়া ক্রেমলিন কখনোই ওই চুক্তিতে সম্মত হওয়ার কথা বলেনি।
সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানের এক প্রশ্নের জবাবে জেলেনস্কি স্বীকার করেন, মার্কিন সহায়তা গুটিয়ে নেওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি বোধ করেছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানান, মার্কিন কর্মকর্তারা ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের বলেছেন, “আপনারা যদি (হামলা) বন্ধ না করেন, আমরা গোয়েন্দা তথ্য আটকে দেব।”
ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী রুশ বিমান হামলা প্রতিহত করতে ও সফল আক্রমণ সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া আগাম সতর্কবার্তার ওপর নির্ভর করে। এছাড়া তাদের পুরো যুদ্ধ প্রচেষ্টায় স্টারলিংক ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করা হয়।
স্টারলিংক সেবার গতি ধীর হওয়ার পেছন কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি ছিল কিনা- এমন গুঞ্জন উঠেছিল। তবে এর মালিক ইলন মাস্ক তা অস্বীকার করে ইঙ্গিত দেন- এর পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের হাত রয়েছে। অন্যদিকে, ট্রাম্প গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করার কথা অস্বীকার করেছেন।
বুধবার যুক্তরাজ্য সফরকালে জেলেনস্কি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, “এটি কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা ছিল না, এটি ছিল রাজনৈতিক সদিচ্ছার ব্যাপার।”
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, ভ্লাদিমির পুতিনের মতো স্বৈরাচারী নেতাদের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট দুর্বলতা দেখান। গত এক সপ্তাহের ঘটনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন-ইউক্রেন সম্পর্ক মেরামতের দায়িত্ব তার নিজের নয় বলে জানান তিনি। জেলেনস্কি বলেন, “আমরা কোনো সম্পর্ক নষ্ট করিনি।”
তিনি বলেন, তিনি এখন কেবল তখনই রাশিয়ার তেল অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ করবেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে আরো প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতিতে ভুগছে।
সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় আরো জোরালো ও দৃঢ় কণ্ঠে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, ভ্লাদিমির পুতিনের মতো স্বৈরাচারী নেতাদের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট দুর্বলতা দেখান।
গত এক সপ্তাহের ঘটনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন-ইউক্রেন সম্পর্ক মেরামতের দায়িত্ব তার নিজের নয় বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, “আমরা কোনো সম্পর্ক নষ্ট করিনি।”
এর আগেও দুই নেতার মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা গেছে। গত বছর হোয়াইট হাউজে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে একটি উত্তপ্ত বৈঠক হয়েছিল, যেখানে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন- রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি চুক্তির ক্ষেত্রে জেলেনস্কিই প্রধান বাধা।
এরপর থেকে জেলেনস্কি সতর্ক কূটনৈতিক পথ বেছে নিয়েছেন। যেকোনো শান্তি চুক্তির শর্ত যেন ন্যায়সংগত হয় সে বিষয়ে জোর দেওয়ার পাশাপাশি তিনি মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তির প্রতিও সদিচ্ছা দেখিয়ে আসছেন।
তবে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে হওয়া একটি চুক্তির সমালোচনা করেন তিনি। ওই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে ৩ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়, যাকে ইউক্রেনীয় নেতা রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ বিনিয়োগ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে ট্রাম্পের করা সর্বশেষ প্রচেষ্টার অংশ ছিল এই চুক্তি। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেল- বিশেষ করে ডিজেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় মার্কিন জনগণের তোপের মুখে পড়েছিলেন ট্রাম্প।
জেলেনস্কি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, “প্রশ্ন হলো: পরের চুক্তিটি কবে হবে? হয়তো সেটি গ্যাস নিয়ে হবে। নিশ্চিতভাবেই সেটি গ্যাস নিয়েই হবে।”
তথ্যসূত্র: বিবিসি
