কালবেলা · সাধারণ
৬ লাখ টাকায় রাশিয়ায়, ২০ লাখে যুদ্ধে—ফিরল সাগরের মৃত্যুর সংবাদ
১৯/১০/২০২৬

অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে ছয় লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন কুমিল্লার চান্দিনার তরুণ মো. সাগর (২৪)। কিন্তু পরিবারের দাবি, এক বাংলাদেশি দালালের প্রলোভনে পড়ে সেই চাকরি ছেড়ে যোগ দেন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে। এরপর ছয় মাস পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
অবশেষে শনিবার (১৯ অক্টোবর) এক বন্ধুর বার্তায় আসে তার মৃত্যুসংবাদ। তবে কোথায়, কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে এবং মরদেহ কোথায় রয়েছে, তা এখনো জানতে পারেনি পরিবার।
জানা গেছে, সাগর চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকার কবির হোসেনের ছেলে। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি চতুর্থ।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কিশোর বয়স থেকেই সংসারের হাল ধরতে কাজ শুরু করেন সাগর। চান্দিনা উপজেলা সদরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানে রিকশাভ্যান চালাতেন তিনি। সেই সুবাদে দোকানটির এক ম্যানেজারের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে ওই ম্যানেজারের সহযোগিতায় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় যান সাগর।
সেখানে একটি বেকারিতে কাজ নেন তিনি। মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা আয় করতেন। অসুস্থ বাবার চিকিৎসা ও পরিবারের খরচ মেটাতে তার উপার্জন ছিল বড় ভরসা। কিন্তু বেকারিতে কাজ করার সময় এক বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে পরিচয় হয় তার।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ওই ব্যক্তি রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেন সাগরকে। পাশাপাশি এককালীন ২০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। পরিবারের দাবি, চলতি বছরের মে মাসে বেকারির চাকরি ছেড়ে যুদ্ধে যোগ দেন সাগর। এরপর থেকেই স্বজনদের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাশিয়া থেকে সাগরের এক বন্ধু তার বোন পাখি আক্তারের মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠিয়ে মৃত্যুর খবর জানান। ওই বন্ধু পরে বিস্তারিত জানাবেন বললেও রোববার রাত ৯টা পর্যন্ত আর যোগাযোগ করেননি বলে জানান তিনি।
নিহতের বোন পাখি আক্তার জানান, এরপর থেকে ওই বন্ধুকেও ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সাগরের মৃত্যুর পরিস্থিতি ও মরদেহের অবস্থান সম্পর্কে পরিবার অন্ধকারে রয়েছে।
পাখি আক্তার বলেন, ‘আমার ভাই যেতে চায়নি। তাকে জোর করে নিয়ে গেছে। ছয় মাস ধরে ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। বাবা অসুস্থ, প্রতি মাসে অনেক টাকার ওষুধ লাগে। সাগরের আয়ে সংসার চলত। এখন বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারলাম, আমার ভাই আর নেই। আমরা ভাইয়ের সন্ধান চাই।’
নিহতের মা দেলোয়ারা বেগম বলেন, ‘রাশিয়ায় বেকারির কাজ ছেড়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা সাগর জানিয়েছিল। ছেলেকে যুদ্ধে যেতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তার এক বন্ধুর মাধ্যমে মৃত্যুর খবর পেয়েছি।’
তবে যে ব্যক্তির প্রলোভনে সাগর যুদ্ধে গেছেন বলে পরিবারের অভিযোগ, সেই দালালের পরিচয় তারা জানেন না।
এদিকে সাগরের বাবা কবির হোসেন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। এক সময় সবজির ব্যবসা করলেও অসুস্থতার কারণে এখন সংকটে দিন কাটছে তার। ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে ধার-দেনা করেছিলেন। আশা ছিল, ছেলে আয় করে সংসারের অভাব দূর করবে এবং তার চিকিৎসার খরচ জোগাবে।
কবির হোসেন বলেন, ‘সবজির ব্যবসা করেছি। দীর্ঘদিন নানা রোগে অসুস্থ। অনেক ধারদেনা করে তাকে বিদেশ পাঠিয়েছি। প্রায় চার-পাঁচ মাস যাবৎ ছেলেটার সঙ্গে কথাও বলতে পারিনি। এখন শুনি, আমার ছেলে আর নেই।’
চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। খোঁজখবর নিচ্ছি। সাগরের পরিবার সহায়তা চাইলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সহায়তা করা হবে।’
মূল প্রতিবেদনে যান ↗