দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তজুড়ে প্রচারমূলক লাউডস্পিকার বসানোর ঘোষণা দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা এবং সীমান্তে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাদের তৎপরতার জবাবে এ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে পিয়ংইয়ং। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং জানিয়েছেন, অক্টোবরের শেষ নাগাদ সীমান্তজুড়ে এসব লাউডস্পিকার চালু করা হবে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সীমান্তের বিভিন্ন সামরিক অবস্থান পরিদর্শনের পর কিম ইয়ো জং এ ঘোষণা দেন। তাঁর অভিযোগ, দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা সীমান্তে লাউডস্পিকার দিয়ে সতর্কবার্তা প্রচার করছে এবং বিভিন্ন স্থানে সতর্কতামূলক গুলিও ছুড়ছে।
উত্তর কোরিয়ার ভাষায়, এসব পদক্ষেপের উপযুক্ত জবাব দিতেই পাল্টা লাউডস্পিকার বসানো হচ্ছে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার দাবি, সীমান্তে তাদের সেনাদের সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া ছিল বৈধ ও আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ।
লাউডস্পিকার দিয়ে কী করা হয়?
দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তের দুই পাশ থেকে লাউডস্পিকারের মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে আসছে। এসব যন্ত্র দিয়ে এক দেশের বার্তা, সংবাদ, রাজনৈতিক বক্তব্য ও অন্যান্য প্রচারমূলক বিষয় অন্য দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য শুধু তথ্য প্রচার নয়, প্রতিপক্ষের জনগণ ও সেনাদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করাও।
দক্ষিণ কোরিয়া লাউডস্পিকারে কে-পপ সংগীত ও উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থার সমালোচনামূলক খবর প্রচার করে। এসব প্রচার পিয়ংইয়ংয়ের দীর্ঘদিনের অসন্তোষের কারণ। এর জবাবে উত্তর কোরিয়াও পাল্টা প্রচার চালিয়েছে।
তবে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং ক্ষমতায় আসার পর ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ামুখী লাউডস্পিকার সরিয়ে দেন। পরে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনীও স্থায়ী লাউডস্পিকারগুলো সরিয়ে নেয়। ফলে উত্তর কোরিয়ার নতুন ঘোষণায় সীমান্তে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি লাউডস্পিকার আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কেন বাড়ছে উত্তেজনা?
দুই কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে সীমান্তে সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ, সেনাদের চলাচল এবং স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। দক্ষিণ কোরিয়ার দাবি, উত্তর কোরিয়া সীমান্তে মাইন বসানো ও বেড়া নির্মাণের কাজ জোরদার করেছে। চলতি বছর এ কাজে উত্তর কোরিয়া প্রায় সাত হাজার কর্মী নিয়োগ করেছে বলেও দাবি করেছে সিউল। এসব নির্মাণকাজের সময় উত্তর কোরিয়ার সেনারা প্রায় ৫০ বার সামরিক সীমারেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে প্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ দক্ষিণের।
দক্ষিণ কোরিয়ার দাবি, গত সেপ্টেম্বরে সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তাদের তিন সেনা আহত হন, যাঁদের মধ্যে দুজন গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার মাইনকে দায়ী করে সিউল সীমান্তে মাইন বসানোর কাজ বন্ধ করার আহ্বান জানায়। তবে পিয়ংইয়ং এ অভিযোগ অস্বীকার করে।
উত্তর কোরিয়ার অভিযোগ, তাদের সেনারা সীমান্তে নির্মাণকাজ চালানোর সময় দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা লাউডস্পিকারে সতর্কবার্তা প্রচার ও গুলি ছুড়ে উসকানি দেয়। কিম ইয়ো জংয়ের দাবি, গত ১ আগস্ট থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্তে ২ হাজার ৮৭০ বার লাউডস্পিকার দিয়ে সতর্কবার্তা প্রচার করে এবং ২০১টি সতর্কতামূলক গুলি ছুড়ে।
পাল্টা পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
লাউডস্পিকার চালুর ঘোষণার পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। কিম ইয়ো জং বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাদের সতর্কতামূলক গুলিতে উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ড বা সেনাদের ক্ষতি হলে সীমান্তে থাকা উত্তর কোরিয়ার সেনারা কঠোর জবাব দেবে।
অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়া হুমকি বাস্তবায়ন করলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। তবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
বিশ্লেষকদের মতে, লাউডস্পিকার চালুর এই ঘোষণা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, নতুন এই পদক্ষেপ তা বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
