ঢাকে কাঠি পড়তেই পাল্টে যায় কলকাতা। আলো, রং, হইচই, শোরগোলে সে এক অন্য আমেজ। বাঙালিও ভেসে যায় আনন্দে। তবু সেই ভিড়েও কেউ কেউ থাকেন, এত উল্লাস যাদের ভাল লাগে না। মনে পড়ে যায় ফেলে আসা দিন, হারিয়ে ফেলা মুহূর্তদের। চারপাশের এত উদযাপন যেন গিলে খেতে আসে! কাউকে কাউকে আবার অকারণেই ঘিরে ধরে বিষাদ। অবসাদ-বিষন্নতা তাদের সরিয়ে নিতে চায় সব কিছু থেকে। আটকে দেয় ঘরের চার দেওয়ালের অন্দরে।
সেই মানুষগুলোই পালানোর পথ খোঁজেন। আর তখনই একমুঠো খোলা বাতাস হয়ে ওঠে কলকাতা থেকে দূরে, অন্য কোথাও অন্য কোনওখানে কাটিয়ে আসা কয়েকটা দিন। আপনিও কি তেমন কিছুর খোঁজে? তবে মনখারাপের ওষুধ রাখা আছে ভিয়েতনামে। ফেসবুকের ফিডে একের পর এক ভেসে আসা উদযাপনী ছবি-ভিডিয়োয় ক্লান্ত চোখ দুটোকে দিন নিশ্চিন্ত আরামের এক টুকরো ছুটি। পুজোয় কিংবা পুজোর পরে।
একটু বুদ্ধি করে প্ল্যান করলে আর চোখের সামনে যা আছে সেটাকেই মন ভরে দেখার চোখ থাকলে কম বাজেটেও কিন্তু দিব্যি ঘুরে আসা যায় এই অল্প দূরের বিদেশ থেকে। ন’দিনের সফরে থাকবে নতুন স্বাদ, নতুন রং আর এমন সব অভিজ্ঞতা, যা সমস্ত মনখারাপ এক্কেবারে ভুলিয়ে দিতে পারে!
প্রথম দু’দিন হ্যানয়। ভিয়েতনামের রাজধানী যেন একটা চলন্ত ছবি। সরু রাস্তা দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে স্কুটার ছুটছে, ফুটপাতে টুলে বসে কেউ নুডলস খাচ্ছেন, কোথাও কফির গন্ধ, কোথাও আবার গরম স্যুপের ধোঁয়া। পুরনো শহরের অলিগলি-পাকস্থলী ঘুরতে ঘুরতে ঢুকে পড়ুন কোনও এক ছোট্ট রেস্তোরাঁয়। এক বাটি ফো, সঙ্গে মুচমুচে বান মি আর কনডেন্সড মিল্ক দেওয়া ঠান্ডা কফি—ব্যস, জমে যাবে সকাল! ডং জ়ুয়ান বাজারে গেলে দেখা মিলবে রোজকার ভিয়েতনামের। কেনাকাটা না করলেও চলবে। শুধু মানুষজনের ব্যস্ততাই দেখুন না খানিক ক্ষণ।
পরের দুটো দিনের জন্য রয়েছে নিন বিন। শহরের কোলাহল ছেড়ে এ বার সবুজের দেশে। দু’পাশে ধানখেত, মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা চুনাপাথরের পাহাড়, তার ফাঁক দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। ছোট্ট নৌকোয় চেপে জলপথে এগিয়ে চলুন। কখনও পাহাড়ের ছায়া জলে পড়ছে, কখনও নৌকো ঢুকে পড়ছে অন্ধকার গুহায়। চারপাশ এত শান্ত যে, দাঁড়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দটুকুও আলাদা করে কানে আসে। বিকেলে সাইকেল নিয়ে গ্রামের পথ ধরে ঘুরতে পারেন। ক্লান্ত লাগলে গিয়ে দাঁড়ান কোনও চায়ের দোকানে— এক চুমুকেই আবার চনমনে হয়ে উঠবেন। দামি রিসর্টের চেয়ে এমন কোনও ছোট্ট হোমস্টেতে থাকুন, যার জানলা খুললেই সবুজ থাকবে অপেক্ষায়।
পঞ্চম ও ষষ্ঠ দিন কাটান হোই আনে। নিন বিন থেকে হ্যানয় ফিরে বিমানে চলে যান দা নাং। সেখান থেকে গাড়িতে ঘণ্টাখানেকের পথ হোই আন। হলুদ রঙের পুরনো বাড়ি, ছোট্ট দোকান, নদীর ধারে রঙিন লণ্ঠন— সন্ধে নামলে শহরটা যেন রূপকথার বই থেকে বেরিয়ে আসে। এখানকার বাজারে স্থানীয়দের সঙ্গে ঘুরে সবজি, মশলা আর নানা রকম শাকপাতা চিনে নিতে পারেন। তার পরে রান্নার ক্লাসে নিজের হাতে বানিয়ে ফেলুন ভিয়েতনামি কোনও পদ। বিকেলে আন ব্যাং সমুদ্রসৈকতে হাতে ঠান্ডা পানীয় হাতে দুচোখ ভরে দেখে নিন দক্ষিণ চীন সাগর। কোথাও যাওয়ার তো তাড়া নেই!
সব শেষে তিনটে দিন রাখতে পারেন হো চি মিন সিটি'র জন্য। দা নাং থেকে বিমানে পৌঁছে যান দক্ষিণে হো চি মিন সিটি— যে শহরকে এখনও অনেকে পুরনো নামে ‘সায়গন’ বলে ডাকেন। এখানে পৌঁছে মনে হবে, আর একটি পর্দা সরে গিয়ে ভিয়েতনামের এক নতুন ছবি যেন ফুটে উঠল চোখের সামনে। রাস্তায় স্কুটারের স্রোত, ঝলমলে দোকান, রাস্তার ধারে প্লাস্টিকের ছোট্ট চেয়ারে বসে কফি খাওয়া মানুষ আর খাবারের স্টলে ব্যস্ত রাঁধুনি— সব মিলিয়ে এক ব্যস্ত শহুরে জীবন। কিন্তু তার চলন-বলনে প্রাচ্যের ছাপ।
সকালে ঘুরে আসুন বন থান বাজারে। ফল, মশলা, জামাকাপড়, স্যুভেনির—কী নেই সেখানে! ইতিহাসে আগ্রহ থাকলে ওয়ার রেমন্টস মিউজিয়াম ঘুরে দেখতে পারেন। বিকেলে কোনও ছোট্ট ক্যাফেতে বসে ভিয়েতনামি কফিতে চুমুক দিন। রাতে খুঁজে নিন স্থানীয় খাবারের দোকান। ফো, বান মি, কিংবা দক্ষিণ ভিয়েতনামের নানা ধরনের নুডলস আর ভাতের পদ— স্বাদে স্বাদে চিনে নিন শহরটাকে। শেষ দিনটা না হয় একটু হালকা রাখুন। পছন্দের কোনও খাবার আবার খেয়ে, পছন্দের গলি দিয়ে আর এক বার হেঁটে বাড়ির পথ ধরুন।
ন’দিনের এই সফরে বিলাসিতা নেই। কিন্তু আরামের অভাবও নেই। ছোট্ট সুন্দর হোটেল, স্থানীয় খাবার, ট্রেন বা বাসে যাতায়াত আর বেছে নেওয়া কয়েকটি অভিজ্ঞতা— দু’জন মিলে ঘুরলে জনপ্রতি প্রায় ১ লক্ষ টাকার মধ্যে পরিকল্পনা করা সম্ভব। বিমানভাড়া, মরসুম আর হোটেলের মান অনুযায়ী অবশ্যই খরচ বদলাবে।
ভিয়েতনামের আসল মজা শুধু বিখ্যাত জায়গা দেখা নয়। রাস্তার ধারের কফি, অচেনা খাবারের গন্ধ, গ্রামের পথ, সন্ধের লণ্ঠন আর ব্যস্ত শহরে স্কুটারের স্রোত—এই ছোট্ট ছোট্ট মুহূর্তই ফিরতি পথে আপনার হাত ধরে বাড়ি ফিরবে। আর তখন ভিয়েতনামকে নিয়ে আপনি লিখে ফেলতেই পারেন এক আশ্চর্য কবিতা!
এই প্রতিবেদনটি আনন্দ উৎসব ফিচারের অংশ।
