নতুন কোনও স্বাস্থ্য রুটিন শুরু করার কথা ভাবার সময় অতি-উৎসাহী হয়ে যাওয়াটা খুব সহজ।
ধরা যাক, লক্ষ্য হল আরও বেশি ব্যায়াম করা, তাই সকাল ৬টায় দৌড়ানোর জন্য অ্যালার্ম সেট করলেন। অথবা খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের পরিমাণ বাড়াতে চাচ্ছেন, তাই মাংস ও দুগ্ধজাত খাবারের পরিমাণ দ্বিগুণ করে দিলেন।
এই পদ্ধতির সমস্যা হল, লক্ষ্য মাত্রাতিরিক্ত উঁচুতে নির্ধারণ করা, যা পরে হতাশ করে তোলে। হতে পারে কয়েক সপ্তাহ যেতে না যেতেই দৌড়ানো ছেড়ে দিয়েছেন বা উচ্চ-প্রোটিনযুক্ত খাবার ত্যাগ করেছেন।
ঠিক এই জায়গাতেই দুপুর ১২টার মধ্যে '৩×৩' নিয়মটি, বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে।
সুস্থতা-বিষয়ক মার্কিন প্রশিক্ষক অ্যাবি ওভারটার্ফ, এই রুটিন প্রবর্তন করেন।
এই তথ্য জানিয়ে রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই রুটিনটির মূল কথা হল— দুপুর ১২টার আগে ৩ হাজার কদম হাঁটা, দৈনিক নির্ধারিত পানির এক-তৃতীয়াংশ পান করা এবং ৩০ গ্রাম প্রোটিন খাওয়া।
যদি এটি কারও কাছে অনেক বড় কোনও কঠিন লক্ষ্য মনে হয়, তবে এই রুটিনটি নিয়ে খুব বেশি কঠোর হওয়ার প্রয়োজন নেই।
দুপুর ১২টার মধ্যে ৩x৩ নিয়মটি কী?
ওভারটার্ফ, তার ব্যক্তিগত ভিডিও ব্লগে বলেন, “আপনি যদি প্রতিদিন দুপুর ১২টার মধ্যে এই তিন কাজ করতে পারেন, তবে আমি কথা দিচ্ছি, আপনি আরও বেশি সুস্থ ও সুখী একজন মানুষে পরিণত হতে যাচ্ছেন।”
এই রুটিনের পেছনের মূল ভাবনাটি হল এমন কিছু সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্য লক্ষ্য অর্জন করা যা একজনকে সফলতার পথে এগিয়ে দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্যারেজ জিম রিভিউজ’-এর প্রধান পরামর্শক ডা. রাজ দাশগুপ্ত একই প্রতিবেদনে বলেন, “দুপুর ১২টার মধ্যে ৩x৩ রুটিনটি সকালের একটি সুন্দর কাঠামো তৈরি করা এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য কার্যকর উপায়।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “এটি বিশেষ করে এমন একজন মানুষের জন্য দরকারী হতে পারে, যিনি প্রায়ই সকালের নাস্তা বাদ দেন, সকালে খুব কম শারীরিক পরিশ্রম করেন বা যার পক্ষে সারাদিন ‘হাইড্রেইটেড’ বা পর্যাপ্ত পানি পান করা কঠিন হয়ে পড়ে।”
স্বাস্থ্য-বিষয়ক অ্যাপ ‘নুটু’-এর নিবন্ধিত মার্কিন পুষ্টিবিদ এবং ‘ডায়াবেটিস কেয়ার অ্যান্ড এডুকেশন স্পেশালিস্ট’ ডন মেনিং-এর মতে, “এই রুটিন এমন একজন মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে যিনি নিজের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও ভালো থাকার মান উন্নত করতে সহজ কিছু পদক্ষেপ খুঁজছেন।”
তিনি বলেন, “এই তিন কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে দিনটি শুরু করলে, সকালের শুরুতেই একটি ইতিবাচক গতিবেগ তৈরি করে, যা দিনের বাকি সময়গুলোতেও স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।”
যেভাবে ৩x৩ নিয়মটি স্বাস্থ্য-বিষয়ক উদ্দেশ্যগুলোকে সহায়তা করে
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই রুটিনটি সরাসরি কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া’র ‘ভেদানু ওয়েলনেস’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান চিকিৎসক এবং নিবন্ধিত প্লাস্টিক সার্জন ডা. জেমস চাও বলেন, “তারপরও, দুপুর ১২টার মধ্যে ৩x৩ নিয়মের মাঝে এমন একটি সতেজ সরলতা রয়েছে যা তখনই কাজ করে যখন এটি ছোট ছোট এবং টেকসই উপায়ে করা হয়।”
তিনি পরামর্শ দেন যে, “এই রুটিন নির্দিষ্ট কোনও ক্রমানুসারে না করে যে কোনও একটা দিয়ে শুরু করা যায়।”
ডা. দাশগুপ্ত বলেন, “এর সুফলগুলোর মধ্যে রয়েছে সকালের প্রথম দিকে শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে মেটাবলিজম ও এনার্জি বা শাক্তির মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া, ৩০ গ্রাম প্রোটিন খাওয়ার মাধ্যমে পেশির রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখার অনুভূতি নিশ্চিত করা এবং দিনের শুরুতেই পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের মাধ্যমে পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করা।”
এটি নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে অনুশীলন করলে, পেশির শক্তি এবং সতেজতার মাত্রা ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
এই রুটিনের সম্ভাব্য ঝুঁকি বা সীমাবদ্ধতা
দুপুর ১২টার মধ্যে ৩x৩ নিয়মটি সহজ মনে হলেও, ডা. জেমস চাও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “এই রুটিন কেবল একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্তই কার্যকর।”
তার কথায়, “আমি অনুমান করি যে ৩,০০০ কদম হাঁটা মোটামুটি ১.৩ মাইল বা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিনিটের হালকা হাঁটার সমান। আর এই পরিমাণ হাঁটায় পেটের চর্বির স্তর কমাতে বেগ পেতে হয়। কারণ পেটের মেদ কমাতে আরও নানান বিষয় মাথায় রাখতে হয়।”
তাছাড়া, প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত চাহিদা প্রাকৃতিকভাবেই ভিন্ন হয়ে থাকে।
ডন মেনিং বলেন, “আপনার শারীরিক গঠন, কাজের ধরন ও স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে খাদ্যাভ্যাসে আরও বেশি পানি বা আরও বেশি প্রোটিনের প্রয়োজন হতে পারে।”
ডা. চাও এর সঙ্গে একমত হয়ে বলেন যে, “আর্দ্রতা রক্ষা করার বিষয়গুলো সবসময় ব্যক্তির নিজস্ব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। যেমন, আপনি যদি তীব্র ব্যায়াম করেন বা বাইরের আবহাওয়া যদি অতিরিক্ত গরম হয়, তবে আরও বেশি পানি পান করার প্রয়োজন হতে পারে।”
যেভাবে এই রুটিনটিকে আরও সহজে অর্জনযোগ্য করা যায়
যে কোনো নতুন রুটিন শুরু করার আগে অবশ্যই নিজের শরীরের অবস্থার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। দুপুর ১২টার আগে ৩ হাজার কদম হাঁটা হয়ত বর্তমান শারীরিক অবস্থার জন্য অতিরিক্ত বা খুব বেশি হতে পারে।
“অথবা একবারে খুব বেশি প্রোটিন খাওয়া বা অতিরিক্ত পানি পান করার ফলে পেটে গ্যাস, পেটফাঁপা বা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে”, বলেন ডা. দাশগুপ্ত।
দুপুর ১২টার মধ্যে ৩x৩ নিয়মটি যদি, কারও কাছে খুব কঠিন মনে হয়, তবে লক্ষ্যটি কিছুটা কমিয়ে আনার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।
ডন মেনিং বলেন, “প্রত্যেক মানুষের শারীরিক সক্ষমতা এবং পুষ্টির চাহিদা সম্পূর্ণ আলাদা।”
তিনি আরও বলেন, “দিনের বাকি অর্ধেক সময়ে আপনি কী করছেন তাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রথম দিকেই এই লক্ষ্যগুলো স্পর্শ করতে না পারেন, তবে কোনও সমস্যা নেই; ধীরে ধীরে অনুশীলনের মাধ্যমে এই লক্ষ্যগুলোর দিকে এগিয়ে যেতে পারেন।”
ডা. চাও উল্লেখ করেন যে, “আপনি যদি কোনও আঘাত থেকে সেরে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকেন বা কোনও দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা নিয়ে জীবনযাপন করেন, তবে অগ্রগতির পরিমাপের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন মানদণ্ড বা ‘ক্রাইটেরিয়া’ প্রয়োজন হতে পারে।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, “৩ হাজার কদম দ্রুত হাঁটা এবং ৫০০ কদম সচেতনভাবে হাঁটার মধ্যে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। প্রথমটি অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যদি ফুসফুসের কার্যকারিতা কিছুটা দুর্বল থাকে।”
“এর বিপরীতে, মাত্র ৫০০ কদম হাঁটা হতে পারে ঠিক ততটুকুই যা আপনার শরীর এই মুহূর্তে সহ্য করতে পারে এবং যার প্রয়োজন রয়েছে”, বলেন তিনি।
প্রোটিনের পরিমাণের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। ডা. চাও বলেন, “একটি সেদ্ধ ডিমে ৬ গ্রাম প্রোটিন থাকে। এক টেবিল-চামচ পিনাট বাটার বা বাদামের পেস্টে ৪ গ্রাম থাকে এবং এক টিন টুনা মাছের এক-তৃতীয়াংশ যোগ করলে আরও ৮ গ্রাম পাওয়া যায়। আপনি কোনও বড় ভারী খাবার খাওয়ার আগেই ৩০ গ্রামের লক্ষ্যের প্রায় অর্ধেক পথ পার হয়ে যাচ্ছেন।”
একইভাবে, শরীরের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে হাঁটার লক্ষ্য স্থির করতে হবে। সেটা হতে পারে ১ হাজার বা ৩ হাজার কদম।
“আর এই সংখ্যাটি হয়ত, এই মুহূর্তে আপনার সর্বোচ্চ ক্ষমতা। আপনার শরীর যখন অভ্যস্ত ও মানিয়ে নিতে শুরু করবে, তখন আপনি রুটিনে আরও কদম যোগ করতে পারেন”, পরামর্শ দেন ডা. চাও।
একইভাবে, ডা. দাশগুপ্ত এই রুটিনকে সারাদিনের ব্যস্ততার সঙ্গে মিলিয়ে নমনীয় করার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, “যিনি সকালে শারীরিক পরিশ্রম করতে একদমই নতুন, তার জন্য ১,০০০ কদম দিয়ে শুরু করাটা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। আর এটি যখন ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হবে, তখন বাড়িয়ে ৩ হাজার কদমের দিকে নিয়ে যাওয়া যায়।”
তার পরামর্শ, “একবারে ৩০ গ্রাম প্রোটিন খাওয়া যদি আপনার কাছে খুব ভারী মনে হয়, তবে প্রোটিনের এই পরিমাণটি সকালের নাস্তার পরের ছোট স্ন্যাকসের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে।”
পানির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম খাটে। হয়তো পুরো সকালটি একের পর এক জরুরি মিটিংয়ে ঠাসা, তাই অতিরিক্ত বাথরুমে যাওয়াটা মোটেই সুখকর হবে না।
ডা. দাশগুপ্ত বলেন, “প্রথম দিনেই একদম নিখুঁত সংখ্যার পেছনে না ছুটে বরং রুটিনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং একটি টেকসই অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করাই ভালো।”
“আর যখন ধীরে ধীরে সহনশীলতা বাড়বে আর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে কাছাকাছি পৌঁছানো হবে, তখন নিজের শরীরে একটি স্পষ্ট ও চাক্ষুষ ইতিবাচক পরিবর্তন অনুভব করতে পারবেন”, মন্তব্য করেন এ. ডা. দাশগুপ্ত।
