৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয় করে সিলেটে হাই-টেক পার্ক নির্মাণের সময় উদ্দেশ্য ছিল ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের, আর বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫শ কোটি টাকা।
কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় পাঁচ বছর পার হতে চললেও ‘হাই-টেক পার্ক, সিলেট’-এ কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৪০০ জন মানুষের। আর বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৩০০ কোটি টাকার মতো।
১৭১.০৭ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই পার্কে জমি বা স্পেস (স্থান) বরাদ্দ পাওয়া ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র দুটি বর্তমানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আর এই দুটি প্রতিষ্ঠানও গ্যাসসংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির কারণে প্রতিনিয়ত ধুঁকছে।
সিলেট নগরী থেকে ২২ কিলোমিটার দুরে কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত এই পার্কটি ২০১৬ সালের মার্চে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদিত হয়।
২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর এটি ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্ক’ নামে উদ্বোধন করা হয়। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এর এর নাম পরিবর্তন করে ‘হাই-টেক পার্ক, সিলেট’ রাখা হয়।

প্রকল্পটির মাধ্যমে সিলেটের অর্থনীতিকে শিল্পায়িত করা, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের (সেভেন সিস্টার্স) ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগানোর আশা করা হয়েছিল।
হাই-টেক পার্ক নির্মাণের সময় কর্তৃপক্ষ গ্যাস সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ট্যাক্স হলিডে বা কর অবকাশ, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ এবং মুনাফা ও মূলধন নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এতবছর পর এর প্রায় সবগুলোই প্রতিশ্রুতির মধ্যেই রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের (বিএইচটিপিএ) তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত হাই-টেক পার্কের প্রায় ৪৪ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ৭৬ একরের বেশি জমি এখনো খালি রয়েছে। প্রশাসনিক ভবনে বরাদ্দযোগ্য ২১,৫৭৬ বর্গফুট স্পেসের মধ্যে ১৯,০৬২ বর্গফুট বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে স্পেস পাওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটিই এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।
জমি বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড তাদের ৩২ একর প্লটে অবকাঠামো নির্মাণ শেষে ২০২৫ সাল থেকে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে। জমি বরাদ্দ নেয়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান এখনো তাদের অবকাঠামো নির্মাণ করছে, তিনটি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করার পর নির্মাণকাজ স্থগিত রেখেছে এবং চারটি প্রতিষ্ঠান এখনো নির্মাণকাজই শুরু করেনি।

গ্যাসসংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং যত সমস্যা
পার্কটির প্রধান বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান র্যাংগস বছরের পর বছর ধরে অবকাঠামোগত ঘাটতির সঙ্গে লড়াই করছে।
র্যাংগসের দেয়া তথ্যমতে, তারা ২০২২ সালে শিল্পভিত্তিক গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করেছিল, কিন্তু বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে বিএইচটিপিএ ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাদের পক্ষ থেকে পুনরায় আবেদন করলেও সেটিও নাকচ করা হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে কর্তৃপক্ষ আবারও আবেদন করেছে এবং সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
হাই-টেক পার্ক এলাকায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের পরিচালিত একটি ৩৩/১১ কেভি লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সিলেটে ভারী বর্ষণের কারণে প্রায়শই দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং ঘটে। এসময় বিকল্প কোন সংযোগ না থাকায় সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকে।
"এখানে সবচেয়ে বড় বাধা হলো গ্যাস সংযোগ। আমাদের টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার এবং অন্যান্য উৎপাদন চালুর পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু আমরা শুধু রেফ্রিজারেটর তৈরি করছি। বাড়তি উৎপাদন খরচের পাশাপাশি আমাদের বছরে ৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।"
— মো. রফিকুল ইসলাম, সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার, র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড
র্যাংগস ইলেকট্রনিক্সের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. রফিকুল ইসলাম জানান, তাদের নিজেদের জমিতে কারখানা করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের দেয়া প্রতিশ্রুতি বিবেচনায় তারা এই পার্কে এসে বিনিয়োগ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘তবে সরকারি কাগজপত্রের সুবিধার জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি শুরু থেকেই পূরণ করা হয়নি। আমাদের অন্যান্য প্রকল্পের মতো ব্যক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্ট অফিসে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয়েছে।’
‘প্রতিশ্রুতি ছিল যে তিন বছরের নির্মাণকালে কোনো ভাড়া নেওয়া হবে না এবং ‘ব্রেক-ইভেন পয়েন্টে’ (লাভ-ক্ষতির সমতা) না পৌঁছানো পর্যন্ত ভাড়া যৌক্তিক রাখা হবে। অথচ প্রথম দিন থেকেই আমাদের ভাড়া দিতে হচ্ছে। তা ছাড়া কোনো ব্যাকআপ বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, আর রক্ষণাবেক্ষণের কাজের সময় আমাদের দিনের পর দিন উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়,’ তিনি বলেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় বাধা হলো গ্যাস সংযোগ, যা আমরা নির্মাণকাজ শুরু করার পর থেকেই মন্ত্রণালয় বারবার প্রত্যাখ্যান করে আসছে। আমাদের টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার এবং অন্যান্য উৎপাদন লাইন চালু করার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু আমরা এখন মাত্র ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় শুধু রেফ্রিজারেটর তৈরি করছি। এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে বাড়তি উৎপাদন খরচের পাশাপাশি আমাদের বছরে ৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।’

পার্কে সক্রিয় অপর প্রতিষ্ঠান ‘আপস্কিল বাংলাদেশ’-ও যাতায়াত বা যোগাযোগ ও নিরাপত্তার সমস্যায় ভুগছে।
প্রতিষ্ঠানটির লিড এইচআর মুমিনুর রহমান তমাল জানান, নিউইয়র্কভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি উন্নত আইটি কোর্স প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছিল।
তিনি বলেন, ‘যোগাযোগ ও যাতায়াত সমস্যার কারণে আমরা শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে এবং কর্মীদের ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছি। এ ছাড়া সন্ধ্যার পর চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে।’
পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অপেক্ষায়
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান প্রশাসন পার্কটি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে সুপারিশ তৈরির জন্য একটি কমিটি গঠন করে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গত জুনে পার্কটি পরিদর্শন করেন এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সেসময় তিনি তার বক্তব্যে বলেন, মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনার পর সরকার পরবর্তী পদক্ষেপের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো ফলাফলের কথা জানা যায়নি।
"শহর থেকে পার্কটির দূরত্ব এবং গ্যাস সংযোগের অভাব বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। "
— মো. ফজলুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ

বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুর রহমান বলেন, শহর থেকে পার্কটির দূরত্ব এবং গ্যাস সংযোগের অভাব বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা।
এই সমস্যাগুলোর কারণে কারখানাগুলো পুরোপুরি চালু হতে পারছে না উল্লেখ করে তিনি জানান, আরও বেশ কয়েকটি সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষ নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সচিব সম্প্রতি সিলেটের স্থানীয় ব্যবসায়ী চেম্বার নেতাদের নিয়ে পার্কটি পরিদর্শন করেছেন এবং আমরা আশা করছি সব সমস্যা কাটিয়ে নতুন বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে কাজ করব। আগামী ৪ নভেম্বর আমাদের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে, যেখানে পার্কসংক্রান্ত সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে। সব বাধা অতিক্রম করে হাই-টেক পার্কটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
গুগলে আমাদের খবর পেতে
