পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী গাছ এখন একাধিক সংকটের মুখে। আগামরা রোগের পাশাপাশি গাছটিতে বাড়ছে পরজীবী উদ্ভিদ পরগাছার আক্রমণ। আগে মূলত গাছের শাখা-প্রশাখায় এ উদ্ভিদের উপস্থিতি দেখা গেলেও বর্তমানে সুন্দরী গাছের মূল অংশেও এর বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে দুর্বল হয়ে পড়ছে অনেক গাছ। দীর্ঘদিন আক্রান্ত থাকার পর কোনো কোনো গাছ শুকিয়ে মারা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরে সুন্দরবনে পরগাছার বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার মতো সংকট যুক্ত হওয়ায় সুন্দরী গাছের অস্তিত্ব আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষায় এই বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, সুন্দরী গাছের নাম থেকেই সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে।
একসময় সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় সুন্দরী গাছের আধিপত্য ছিল। এর শক্তিশালী শিকড় মাটির ক্ষয় রোধে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বনাঞ্চলের জলজ পরিবেশ ও খাদ্যচক্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। সুন্দরীসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে অসংখ্য প্রাণী। ফলে এই বৃক্ষের সংখ্যা কমে গেলে পুরো বনাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভরাট হচ্ছে নদী-খাল, ব্যাহত পানিপ্রবাহ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত একসময়ের খরস্রোতা ভোলা নদী এখন অনেক জায়গায় পলি জমে সরু খালে পরিণত হয়েছে। শরণখোলা রেঞ্জের দাসের ভারাণী টহল ফাঁড়ি থেকে চাঁদপাই রেঞ্জের নাংলী টহল ফাঁড়ি, ধানসাগর স্টেশন, জিউধরা স্টেশন ও কলমতেজী টহল ফাঁড়ি হয়ে জয়মনি পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার এলাকায় নদীটি ভরাট হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়ভাবে নদীটি অনেকের কাছে ‘মরা ভোলা’ নামেও পরিচিত।
নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের অভ্যন্তরের শাখা খালগুলোতেও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সুন্দরীসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও টিকে থাকার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এর সঙ্গে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন এবং পরগাছার আক্রমণ যুক্ত হওয়ায় সুন্দরী গাছের সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে।
২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছে পরগাছার আক্রমণ
বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছে পরগাছার আক্রমণ দেখা গেছে।
পরগাছা এক ধরনের পরজীবী উদ্ভিদ, যা অন্য গাছকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে এবং আশ্রয়দাতা গাছ থেকে পানি ও পুষ্টি গ্রহণ করে। দীর্ঘদিন পরগাছার আক্রমণে থাকলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়া এবং শেষ পর্যন্ত গাছ মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে সুন্দরবনে ঠিক কোন প্রজাতির পরগাছা কীভাবে বিস্তার লাভ করছে, এর পেছনে মূল কারণ কী এবং কার্যকরভাবে এটি নিয়ন্ত্রণের উপায় কী—এসব বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে বহুমুখী সংকট
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনে লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিও বাড়ছে। দুর্যোগের সময় লবণাক্ত পানি বনের ভেতরে প্রবেশ করছে। অন্যদিকে নদী ও খালে পলি জমে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় মিষ্টি পানির স্বাভাবিক সরবরাহ কমে যাচ্ছে।
এর ফলে সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ বা টপ ডাইংয়ের পাশাপাশি পরগাছা, ছত্রাক ও কীটপতঙ্গের আক্রমণও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। তবে সুন্দরী গাছের ওপর এসব কারণের কোনটির প্রভাব কতটা, তা নির্ধারণে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাবের আশঙ্কা
সুন্দরী গাছের সংখ্যা কমে গেলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। গাছের শিকড় ও আশপাশের জলজ পরিবেশ বিভিন্ন মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি গাছের ডালপালায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বাসা বাঁধে। বনাঞ্চলের বিভিন্ন উদ্ভিদ ও আবাসস্থল বানর, হরিণসহ নানা বন্যপ্রাণীর জীবনধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্র একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাই সুন্দরী গাছের আবাসস্থল ও সংখ্যা কমে গেলে এর প্রভাব অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপরও পড়তে পারে। তবে এর প্রকৃত ব্যাপ্তি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিরূপণে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
সংকটে পড়তে পারে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, মধু ও মোম সংগ্রহ, গোলপাতাসহ অনুমোদিত বনজ সম্পদ আহরণ এবং পর্যটনকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উপকূলের বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন।
সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর যেহেতু বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল, তাই সুন্দরী গাছসহ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব উপকূলীয় মানুষের ওপরও পড়তে পারে। এ কারণে পরগাছার বিস্তার, লবণাক্ততা, নদী-খালের পানিপ্রবাহ এবং সুন্দরী গাছের রোগ নিয়ে কার্যকর গবেষণা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
