পুজোর হইচই শেষ। সামনে দীপাবলি। মাঝে খানিকটা অবসর। ছুটির মেজাজ যখন রয়েই গিয়েছে, ক’টা দিন শহরের কোলাহল ছেড়ে হারিয়ে গেলে কেমন হয়?
সকালে ঘুম ভাঙবে পাখির ডাকে। তাঁবুর পর্দা সরালেই চোখের সামনে পাহাড়, জঙ্গল কিংবা নদী। রাতে মাথার উপরে তারাভরা আকাশ, পাশে আগুনের উষ্ণতা। অথচ ঘুমোতে হবে না শক্ত মাটিতে, মশার সঙ্গে যুদ্ধও নৈব নৈব চ। বরং নরম বিছানা, গরম জলে স্নান, পছন্দের খাবার— সবই থাকবে হাতের কাছে। প্রকৃতির কোলে এমন আরামদায়ক ছুটির নামই গ্ল্যাম্পিং।
‘গ্ল্যামারাস’ আর ‘ক্যাম্পিং’ মিলিয়ে গ্ল্যাম্পিং। এক সময়ে ক্যাম্পিং মানেই ছিল পিঠে ভারী ব্যাগ, নিজের তাঁবু খাটানো, আগুন জ্বেলে রান্না আর প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার নানা ঝক্কি। গ্ল্যাম্পিং সেই ঝামেলাগুলো সরিয়ে দিয়েছে। তবে জঙ্গলের মধ্যে পাঁচতারা হোটেল বানানো এর উদ্দেশ্য নয়। এখানে আসল আকর্ষণ প্রকৃতি - বিলাসিতাটুকু শুধু আরও কয়েক পা গভীরে গিয়ে তাকে উপভোগ করার একটা ব্যবস্থা। ভাবুন তো, বিছানায় শুয়েই পাহাড়ের গায়ে রোদের খেলা দেখছেন। স্নানঘরের জানলার ওপারে ঘন সবুজ বন। সকালের চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শুনছেন নদীর শব্দ। শহরের দামি হোটেলেও এমন অভিজ্ঞতা কোথায়!
ভ্রমণের চেনা ছক ভেঙে এখন অনেকেই খুঁজছেন অন্য রকম অভিজ্ঞতা। শুধু দর্শনীয় স্থান দেখে, ছবি তুলে ফিরে আসা নয়; বদলে কোনও জায়গার প্রকৃতি, পরিবেশ আর স্থানীয় জীবনের সঙ্গে একটু নিবিড় ভাবে মিশতে চাইছেন অনেকেই। তবে তার জন্য আরাম বিসর্জন দিতে রাজি নন, এমন মানুষও নেহাত কম নেই। বিশেষ করে যাঁদের কাছে মাটিতে শুয়ে রাত কাটানোর ভাবনাটাই দুঃস্বপ্ন, তাঁদের জন্য প্রকৃতির দরজা খুলে দিয়েছে গ্ল্যাম্পিং।
থাকার ব্যবস্থাতেও কত বৈচিত্র্য! কোথাও বিলাসবহুল তাঁবু, কোথাও কাঠের কেবিন, স্বচ্ছ গম্বুজের ঘর কিংবা গাছের ডালে ছোট্ট আস্তানা। তবে সারা দিন সেই ঘরে বসে থাকলে গ্ল্যাম্পিংয়ের আসল মজাটাই মাটি। এত আয়োজন শুধু আপনাকে আয়োজন থেকে দূরে– প্রকৃতির কাছাকাছি রাখার জন্য। জঙ্গলে পাখি দেখা, প্রকৃতিবিদের সঙ্গে খানিকটা হাঁটা কিংবা সাইকেল চালানো, নদীতে নৌকাবিহার, মাছ ধরা, মরুভূমিতে উটের পিঠে চড়া, বালিয়াড়িতে জিপে করে ঘোরা, ট্রেকিং কিংবা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে ঢুঁ মারা— জায়গা বিশেষে অভিজ্ঞতাও বদলে যায়। দিনের শেষে ক্যাম্প-ফায়ার ঘিরে আড্ডা জমবে ঠিক। মাথার উপরে তখন অসংখ্য তারা। ঘড়ি দেখার তাড়া নেই, নেই পরের গন্তব্যে পৌঁছনোর ব্যস্ততাও।
রাতের জঙ্গলে ঝিঁঝিঁর ডাক, পাহাড়ের গায়ে নেমে আসা কুয়াশা কিংবা নদীর জলে চাঁদের আলো— এ সব তো বরাবরই ছিল। গ্ল্যাম্পিং শুধু সেই অভিজ্ঞতাগুলোকে আরও সহজলভ্য করেছে। প্রকৃতিকে জয় করার অভিযান নয়, বরং তার সঙ্গে কয়েকটা দিন নিজের মতো করে কথা বলার সুযোগ।
কোথায় পাবেন এমন অভিজ্ঞতা?
মেঘালয়ের শিলং ও সোহরা: পাইন বনের ফাঁকে কাঠের কেবিন কিংবা স্বচ্ছ গম্বুজের ঘরে শুয়ে মেঘের আনাগোনা দেখার মজাই আলাদা। দিনে ঝরনা দর্শন, পাহাড়ি পথে হাঁটা, রাতে পরিষ্কার আকাশ পেলে তারা গোনা।
অরুণাচলের জ়িরো উপত্যকা: সবুজ ধানখেত, দূরে পাহাড় আর আপাতানি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি। আরামদায়ক তাঁবুতে রাত কাটিয়ে দিনে তাঁদের গ্রামে ঘুরে আসুন, চেখে দেখুন স্থানীয় রান্না। সঙ্গী হবে পাহাড়ি হাওয়া আর ঝিঁঝিঁর ডাক।
অরুণাচলের দিরাং: পাহাড়ি নদী, আপেলবাগান আর শীতল বাতাসের মধ্যে তাঁবু-বাস। সকালে গরম চায়ের কাপ হাতে পাহাড় দর্শন, তার পরে সাঙ্গতি উপত্যকায় পাখি দেখা কিংবা বৌদ্ধ মঠে ঘুরে আসা।
সিকিমের পাহাড়ি উপত্যকা: কাঠের কেবিন বা পাইন বন ঘেরা আরামদায়ক ঘরে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়েই কাটুক সময়। দিনে ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে হাঁটাহাঁটি, স্থানীয় খাবারের সুস্বাদ, রাতে আগুনের পাশে আড্ডা।
অসমের কাজিরাঙা: জঙ্গলের কাছাকাছি বিলাসবহুল তাঁবুতে থাকার রোমাঞ্চই আলাদা। ভোরে অনুমোদিত জঙ্গল সাফারিতে গণ্ডার দেখার সুযোগ, বিকেলে চা-বাগানে বেড়ানো, সন্ধেয় পাখির ডাক শুনতে শুনতে বিশ্রাম।
মধ্যপ্রদেশের কানহা: শালবনের ছায়ায় নদীর ধারে তাঁবুতে রাত কাটানোর সুযোগ। সকালে জঙ্গল সাফারি, দিনে প্রকৃতিবিদের সঙ্গে অজানা পাখির ক্লাস, সন্ধেয় জঙ্গলের নিস্তব্ধতা উপভোগ।
কেরলের মুন্নার: চা-বাগানের সবুজ ঢেউয়ের মাঝে পাহাড়-চূড়ায় তাঁবু কিংবা গাছের উপরে ঘর। কুয়াশামাখা সকালে চায়ের সুবাস, দিনে প্রকৃতির পথে হাঁটা, পাখি দেখা বা পাহাড়ি পথে রোমাঞ্চকর অভিযান।
রাজস্থানের রণথম্ভোর: রুক্ষশুষ্ক জঙ্গল, দূরে পাহাড় আর রাজকীয় তাঁবুর আয়োজন। ভোরে বাঘের খোঁজে সাফারি, বিকেলে প্রকৃতির মাঝে আলসে আরাম। রাত নামলে খোলা আকাশের নীচে নৈশভোজের ব্যবস্থাও থাকতে পারে।
তবে বুকিংয়ের আগে দেখে নিন গরম জল, নিজস্ব স্নানঘর, খাবার ও যাতায়াতের ব্যবস্থা আছে কিনা। পাহাড়ে আবহাওয়া এবং জঙ্গলে সাফারির অনুমতিও যাচাই করা জরুরি। সব জায়গায় সব ধরনের থাকার সুবিধা মেলে না।
পুজো আর দীপাবলির মাঝের ছুটিতে তাই এ বার অন্য রকম বিলাসের স্বাদ নিন। যেখানে সকালে পর্দা সরালেই প্রকৃতি, আর দিনের সবচেয়ে বড় কাজ— কিছু না করেও সেই সৌন্দর্যটুকু উপভোগ করা।
এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।
