তোতলামি বা কথা বলার স্বাভাবিক প্রবাহে অনিচ্ছাকৃত বাধার অভিজ্ঞতা যাদের রয়েছে, তাদের অনেকের কাছে এটি কেবল বলার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে আত্মবিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক, শিক্ষা ও কর্মজীবনের নানা অভিজ্ঞতা। অথচ আমাদের সমাজে এ অভিজ্ঞতার প্রতি সহমর্মিতার চেয়ে উপহাসই বেশি চোখে পড়ে। কেউ কথা বলতে গিয়ে আটকে গেলে আমরা তার বক্তব্য শোনার বদলে অপেক্ষা করি, কখন হাসির উপলক্ষ পাওয়া যাবে
কথা বলতে গিয়ে হয়তো কোনো শিশু একই শব্দ বারবার উচ্চারণ করছে। কখনো কোনো শব্দের প্রথম ধ্বনিতে আটকে যাচ্ছে, কখনো দীর্ঘ চেষ্টার পরও বাক্যটি শেষ করতে পারছে না। তা দেখে আশপাশের কেউ হেসে উঠছেন, কেউ তার কথা নকল করছেন, কেউ আবার বিরক্ত হয়ে বলে উঠছেন—‘আরে, আস্তে আস্তে বলো!’
আরেকজন হয়তো শিশুটির হয়ে বাক্যটি নিজেই শেষ করে দিচ্ছেন। সবার কাছে ঘটনাটি সামান্য এক টুকরো হাসি-ঠাট্টা। কিন্তু শিশুটির কাছে? তার ভেতরে ঠিক কী ঘটছে, তা কি কেউ জানার চেষ্টা করছেন?
একবার নিজেকে শিশুটির জায়গায় কল্পনা করুন। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক প্রশ্ন করেছেন। উত্তরটি আপনার জানা, কিন্তু হাত তুলতে ভয় হচ্ছে। সহপাঠীদের হাসির শব্দ যেন আগেই কানে বাজছে। কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় অনেক কথা জমে আছে, অথচ মুখ খুলতে গিয়ে মনে হচ্ছে, সবাই আপনার কথার দিকে নয়, কেবল বলার ধরনটির দিকেই তাকিয়ে থাকবে।
চাকরির সাক্ষাৎকারে নিজের যোগ্যতা তুলে ধরার সুযোগ এসেছে, কিন্তু আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় কথাটুকুও বলা হয়ে উঠছে না। আপনার মেধা আছে, চিন্তা আছে, অনুভূতি আছে। শুধু কথা বলার ছন্দটি অন্যদের মতো নয়। আর এ পার্থক্যের কারণেই আপনাকে বারবার পড়তে হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে।
তোতলামি বা কথা বলার স্বাভাবিক প্রবাহে অনিচ্ছাকৃত বাধার অভিজ্ঞতা যাদের রয়েছে, তাদের অনেকের কাছে এটি কেবল বলার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে আত্মবিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক, শিক্ষা ও কর্মজীবনের নানা অভিজ্ঞতা। অথচ আমাদের সমাজে এ অভিজ্ঞতার প্রতি সহমর্মিতার চেয়ে উপহাসই বেশি চোখে পড়ে। কেউ কথা বলতে গিয়ে আটকে গেলে আমরা তার বক্তব্য শোনার বদলে অপেক্ষা করি, কখন হাসির উপলক্ষ পাওয়া যাবে।
আমাদের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হওয়া উচিত—কথা বলার সাবলীলতা আর বুদ্ধিমত্তা কখনো এক বিষয় নয়। কেউ তোতলান মানে এই নয় যে তার চিন্তা করার ক্ষমতা, জ্ঞান বা যোগ্যতা কমে গেছে। বাক্য উচ্চারণে একটু বেশি সময় লাগতে পারে, কিন্তু সে বাক্যের ভেতরে থাকা যুক্তি, সৃষ্টিশীলতা ও অনুভূতির মূল্য একটুও কমে যায় না।
২০২৫ সালের ৪ জুন প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিসিসিপির এক গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে তোতলামিকে নতুনভাবে বোঝার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষক গ্রেগরি স্নাইডার ও তার দল দেখিয়েছেন, তোতলামির সঙ্গে শুধু মুখে কথা বলার অসুবিধা নয়, বরং সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার বা হাতের লেখার মতো অন্যান্য ভাষাভিত্তিক কাজেরও সম্পর্ক থাকতে পারে। এর পেছনে স্নায়ুতন্ত্রের বিস্তৃত ভূমিকা এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্যের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়েও অনুসন্ধান করছেন তারা।
তবে এসব পর্যবেক্ষণ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। সীমিত গবেষণা থেকে তোতলামির নিশ্চিত কারণ নির্ধারণ করা কিংবা ভিটামিন, খনিজ উপাদান বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্টকে জাদুকরী চিকিৎসা হিসেবে প্রচারের সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন গবেষকরা। এ অনুসন্ধান কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশে একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের বড় অংশ কাটে শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষা ও সহপাঠীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। মৌখিক উত্তর দেয়া, পাঠ পড়ে শোনানো, বিতর্কে অংশ নেয়া কিংবা দলগত কাজে মতামত প্রকাশ—এসবের মধ্য দিয়েই তার জ্ঞান ও দক্ষতা প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী যদি তোতলামির কারণে কথা বলতে সংকোচ বোধ করে, তাহলে এসব পরিস্থিতি তার জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। সহপাঠীদের হাসাহাসি কিংবা শিক্ষকের বিরক্তি সে সংকোচ আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
একজন শিক্ষার্থী উত্তর জানে, কিন্তু হাত তুলছে না। শিক্ষক ভাবছেন, সে হয়তো পড়া শেখেনি। পরীক্ষক তার কথা শেষ হওয়ার আগেই পরের প্রশ্নে চলে যাচ্ছেন। সহপাঠীরা হাসছে। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীটি নিজের সক্ষমতা নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, একসময় সে হয়তো অন্যদের আচরণকেই নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ বলে ভাবতে শুরু করবে। যে বয়সে আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক দক্ষতা গড়ে ওঠার কথা, সে বয়সেই যদি একটি শিশু ভাবতে শুরু করে যে কথা বলতে গেলেই তাকে নিয়ে হাসাহাসি হবে, তাহলে তার সামনে থাকা সম্ভাবনার দরজাগুলো ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসতে পারে।
এখানে সমস্যাটি শুধু শিশুটির তোতলামি নয়; প্রশ্নটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়েও। শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও বোঝাপড়া মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কথা বলার সাবলীলতাকে সব পরিস্থিতিতে মেধার মাপকাঠি বানানো যুক্তিসংগত নয়। কোনো বিষয়ে মৌখিক উপস্থাপনা অপরিহার্য হলে মূল্যায়নের উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ন রেখেই শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী যুক্তিসংগত সহায়তার ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তোতলামি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা, সংবেদনশীল আচরণ এবং সহপাঠীদের উপহাস বন্ধ করার কৌশল শিক্ষক প্রশিক্ষণের অংশ হয়া উচিত। শ্রেণিকক্ষে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী কথা বলতে গিয়ে আটকে গেলে অন্যরা অপেক্ষা করবে, হাসবে না।
অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে, শিশুকে বারবার সতর্ক করা কিংবা সবার সামনে তার কথা বলার অসুবিধা নিয়ে আলোচনা করা সমাধান নয়। বরং তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রয়োজন হলে বাক্-ভাষা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া এবং তাকে নিজের মতো করে মত প্রকাশের সুযোগ দেয়া জরুরি।
আমরা অনেক সময় শিশুকে নিয়ে ঠাট্টাকে নির্দোষ দুষ্টুমি বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু যে শিশুকে নিয়ে হাসা হচ্ছে, তার কাছে সেটি নির্দোষ কিনা, তা না জেনে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। একটি হাসি কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু সে হাসির কারণে তৈরি হওয়া সংকোচ কারো মনে দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে।
শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পরও তোতলামির অভিজ্ঞতা অনেকের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে। চাকরির সাক্ষাৎকার, সভায় বক্তব্য, উপস্থাপনা, গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা নেতৃত্বের দায়িত্ব পালনের সময় তাদের কথা বলার সাবলীলতা নিয়ে সামাজিক প্রত্যাশার মুখোমুখি হতে হয়।
আমাদের কর্মক্ষেত্রে অনেক সময় ধরে নেয়া হয়, যিনি দ্রুত ও সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন, তিনিই বেশি আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ কিংবা নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্য। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। একজন মানুষ হয়তো কথা বলতে গিয়ে বারবার আটকে যান, অথচ তার বিশ্লেষণী ক্ষমতা অসাধারণ। কেউ বক্তব্য দিতে বেশি সময় নিতে পারেন, কিন্তু তার পরিকল্পনা হতে পারে সুসংগঠিত। কেউ উপস্থাপনায় সাবলীল নন, কিন্তু সমস্যা সমাধান, গবেষণা কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষ। তাই আমরা যদি কথা বলার ধরনকে যোগ্যতার বিকল্প মাপকাঠি বানাই, তাহলে দক্ষ মানুষও অযাচিতভাবে পিছিয়ে পড়তে পারেন।
চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব ওটোরাইনোল্যারিঙ্গোলজি’-তে ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘স্ট্যামারিং’ শীর্ষক পর্যালোচনা প্রবন্ধে তোতলামির লক্ষণ, সম্ভাব্য কারণ, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। মো. আবদুস সাত্তার, তাজমিরা সুলতানা ও শিহাব উজ্জামানের লেখা এ প্রবন্ধে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে শিশুর সঙ্গে পরিবারের আচরণ, কথা বলার পরিবেশ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেয়ার বিষয়টি।
তোতলামিকে ইংরেজিতে স্ট্যামারিং বা স্টাটারিং বলা হয়। এতে কথা বলার সময় কোনো শব্দ বা শব্দাংশ বারবার উচ্চারিত হতে পারে, কোনো ধ্বনি অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘায়িত হতে পারে কিংবা কিছু বলার চেষ্টা করেও কিছুক্ষণ আওয়াজ বের না-ও হতে পারে। যেমন কেউ ‘আমি’ বলতে গিয়ে ‘আ-আ-আমি’ বলছেন, কেউ একটি শব্দের প্রথম ধ্বনিতে আটকে যাচ্ছেন, আবার কেউ কথা শুরুর চেষ্টা করেও কিছুক্ষণ কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারছেন না। কখনো এসবের সঙ্গে মুখমণ্ডল, ঠোঁট বা চোয়ালে টান, চোখের পলক দ্রুত ফেলা কিংবা শরীরের অন্যান্য অংশে অনিচ্ছাকৃত নড়াচড়া দেখা যেতে পারে।
সবার ক্ষেত্রে লক্ষণ একই রকম হয় না। কারো সমস্যা অল্প, কারো ক্ষেত্রে তা তুলনামূলক বেশি। আবার একই ব্যক্তির কথা বলার সাবলীলতাও পরিস্থিতিভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। মানসিক চাপ, ক্লান্তি, উত্তেজনা কিংবা কথা বলার বিষয়ে অতিরিক্ত সচেতনতা অনেকের ক্ষেত্রে তোতলামি বাড়িয়ে দিতে পারে।
‘স্ট্যামারিং’ শীর্ষক পর্যালোচনা প্রবন্ধটিতে তোতলামির তিনটি ধরন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে—বিকাশজনিত, স্নায়বিক এবং মনোজাত তোতলামি। শিশুদের ভাষা ও কথা বলার দক্ষতা বিকাশের সময় যে তোতলামি দেখা দেয়, তা বিকাশজনিত ধরনের অন্তর্ভুক্ত। মস্তিষ্কে আঘাত, স্ট্রোক বা অন্য কোনো স্নায়বিক সমস্যার পর স্নায়বিক তোতলামি দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে কিছু বিরল ক্ষেত্রে মনোজাত কারণের সঙ্গেও কথা বলার অসুবিধার সম্পর্ক থাকতে পারে।
তবে তোতলামির সব ঘটনাকে মানসিক সমস্যার ফল হিসেবে দেখা ভুল। বিকাশজনিত তোতলামির পেছনে জিনগত ও স্নায়বিক উপাদানের ভূমিকা রয়েছে বলে গবেষণায় ধারণা পাওয়া গেছে। পরিবারের অন্য সদস্যের তোতলামির ইতিহাসও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সাধারণত দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে, যখন শিশুর ভাষা ও কথা বলার দক্ষতা দ্রুত বিকশিত হয়, তখন তোতলামির লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে ছোট শিশুরা কথা শেখার সময় স্বাভাবিকভাবেও কোনো শব্দ বা বাক্যাংশ পুনরাবৃত্তি করতে পারে। তাই প্রতিটি পুনরাবৃত্তিকেই তোতলামি হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়।
শিশুর কথা বলার অসুবিধা কত দিন ধরে চলছে, কত ঘন ঘন হচ্ছে, কথা বলার সময় তার শারীরিক টান বা অস্বস্তি হচ্ছে কিনা এবং সমস্যাটি তার যোগাযোগে প্রভাব ফেলছে কিনা—এসব বিষয় বিবেচনা করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে শিশুর কথা বলার অসুবিধা দেখা দিলে কখনো সেটিকে বয়সের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বলে উপেক্ষা করা হয়। আবার কখনো শিশুকে বারবার শুদ্ধ করে কথা বলতে বলা হয়। কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনের সামনে শিশুটিকে কথা বলানোর চেষ্টা করেন, যাতে সে নিজের অসুবিধা কাটিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু শিশুটি যদি এসব পরিস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করে, তাহলে এ ধরনের চাপ তার জন্য সহায়ক নাও হতে পারে।
তোতলামি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর প্রথম জায়গা পরিবার। শিশুর কথা বলার সময় মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, তাকে তাড়াহুড়া করানো যাবে না এবং কথা বলার অসুবিধা নিয়ে সবার সামনে বিব্রত করা যাবে না। সে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে বয়স উপযোগী ভাষায় বোঝাতে হবে যে কথা বলার ধরনে মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।
দ্বিতীয় জায়গা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্কুলে উপহাস ও হয়রানির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান থাকতে হবে। শিক্ষকদের এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা ভয় ছাড়াই প্রশ্ন করতে ও উত্তর দিতে পারে।
তৃতীয় জায়গা গণমাধ্যম ও বিনোদনজগৎ। নাটক, সিনেমা কিংবা কৌতুক অনুষ্ঠানে তোতলামিকে শুধু হাসির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে সামাজিক পূর্বধারণা আরো শক্ত হতে পারে। কোনো চরিত্রের কথা বলার ধরন তার পরিচয়ের অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটিকে অযথা বিকৃত করে দর্শককে হাসানোর চেষ্টা সংবেদনশীলতার পরিচয় নয়।
চতুর্থ জায়গা কর্মক্ষেত্র। নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মূল্যায়নে অপ্রাসঙ্গিক পূর্বধারণা পরিহার করতে হবে। সহকর্মীর কথা বলার ধরন নিয়ে হাস্যরস না করে গুরুত্ব দিতে হবে তার বক্তব্য ও কাজকে। কেউ তোতলাচ্ছেন বলে ধরে নেয়া যাবে না যে তিনি ভীতু, দুর্বল, কম বুদ্ধিমান কিংবা মানসিকভাবে অসুস্থ। কথা বলার অসুবিধাকে ব্যক্তির চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার অভ্যাস থেকেও আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন কিংবা প্রাচীন দার্শনিক অ্যারিস্টটল—দুজনরই কিন্তু তোতলামির সমস্যা ছিল। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সাত কোটির বেশি মানুষ এ সমস্যায় ভোগেন। তাদের নিয়ে মানুষের ধারণাকে পাল্টাতে প্রতি বছরের ২২ অক্টোবরকে পালন করা হয় আন্তর্জাতিক তোতলামি সচেতনতা দিবস হিসেবে।
আর আজ সেই দিবসে অনুরোধ থাকলো—প্লিজ, ভ্যাঙাবেন না। মানুষটির কথা শুনুন, তার কথা বলার ধরন নিয়ে হাসবেন না। আপনার কাছে হয়তো সেটি কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা। কিন্তু যিনি কথা বলছেন, তার কাছে এ আচরণ হয়ে উঠতে পারে অসম্মানের। প্রত্যেক মানুষেরই কথা বলার অধিকার আছে—নিজের মতো করে, নিজের গতিতে, নিজের মর্যাদা নিয়ে।
