মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে বহুমুখী সংকটের ঝুঁকিতে পড়ছে বাংলাদেশ। জ্বালানি সরবরাহ ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি থেকে শুরু করে উৎপাদন, রপ্তানি ও বিনিয়োগে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে প্রবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স নিয়ে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসা এবং গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে ওঠার আশঙ্কা অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এসব চাপ আরও তীব্র হয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিকে
গভীর সংকটের মুখে ফেলতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার পাশাপাশি সৌদি-হুথি সংঘাতের ফলে সুয়েজ খাল ও বাব এল-মান্দেব দিয়ে আমদানি ও রপ্তানিতে বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের কারণে মধ্যপাচ্যের দেশগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হলে সেখানে থাকা বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসীর চাকরি ও ব্যবসা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রবাসী কর্মীদের আয় ও অর্থ পাঠানোর সক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে। তবে সংঘাতের কারণে রেমিট্যান্স কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে যুদ্ধের ব্যাপ্তি, স্থায়িত্বের ওপর। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়ায় শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পে। এখন উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। সংঘাত তীব্র হলে রেমিট্যান্স, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে বড় সংকটে ফেলতে পারে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবু আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আমাদের এক মহাসংকটে ফেলে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় আমদানি কমে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে। যার প্রভাব পড়ছে প্রবৃদ্ধি থেকে মূল্যস্ফীতি সর্বক্ষেত্রে। সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিও সংকটে পড়ছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সেদেশে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরি ও আয়ের ওপর।
সংকট উত্তোরণে আবু আহমেদ বলেন, আইএমএফ আমাদের সুদ বাড়ানোসহ বিভিন্ন ধরনের প্রেসক্রিপশন দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের সব কিছু মানা যাবে না। সুদের হার না বাড়িয়ে বরং কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারের বিলাসী ব্যয়ের পাশাপাশি কম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধন করতে হবে।
আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। ফলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
আইএমএফ আগের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলেছে, প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সম্পর্কে বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংক খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন-ঘাটতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কমছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা।
সরকারি সূত্র বলছে, সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার। বর্তমানে দেশটিতে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত। চলতি বছর প্রথম আট মাসে সৌদি আরবে গেছেন ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৭ জন। এ ছাড়া বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ৭০ হাজার ৩০৪ বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৯১৫ জন গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। দেশটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্সের উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আর গত আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২৫ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৪ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্সের প্রায় ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। ফলে দেশটিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীদের ওপর পড়তে পারে।
যুদ্ধের প্রভাব যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে সেই তথ্য আইএমএফের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। গতকাল প্রকাশ হওয়া সংস্থাটির প্রতিবেদন বলছে, ইরান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার অর্থনীতি শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। যুদ্ধের কারণে তেল উৎপাদন, জাহাজ চলাচল ও রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে চাপ আরও বেড়েছে। চলতি বছর ইরাক, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের অর্থনীতি দুই অঙ্কের হারে সংকুচিত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবে অর্থনীতি সংকুচিত এবং মূল্যস্ফীতি বাড়লে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিদের আয় কমবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। বাসাভাড়া, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বেড়ে গেলে তাদের সঞ্চয় কমে আসবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশে পাঠানো রেমিট্যান্সে। একই সঙ্গে সৌদি অর্থনীতিতে কোনো ধরনের সংকোচন দেখা দিলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিদের আয় ও কর্মসংস্থানেও চাপ তৈরি হতে পারে।
সরকারি হিসাব বলছে, বাংলাদেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫-৭০ লাখ টন। এর মধ্যে ১৪-১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি হয়। সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত সৌদি আরামকো থেকে ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ আসে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন। এর বাইরে আবুধাবির অ্যাডনক থেকেও অপরিশোধিত তেল কেনে বাংলাদেশ। এ অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, বিটুমিন, পেট্রলসহ ১৩ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন হয়। সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের আমদানি করা গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মধ্যে সারও রয়েছে। দেশটি থেকে ইউরিয়া আমদানি করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং ডিএপি আমদানি করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। এ যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে আমদানি প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি হতে পারে।
সমস্যা থেকে উত্তরণে বিশ্ব ব্যাংক বলছে, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফেরানো, জ্বালানিনিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করা এবং কর-রাজস্ব বাড়ানোকে সংস্কারের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্প খাতে এই মন্দা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ। এমনকি মহামারীর পর এই প্রথম তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাত সংকুচিত হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতায় বেসরকারি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি বিনিয়োগও এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর কারণ হিসেবে তীব্র আর্থিক সংকট এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন জটিলতাকে দায়ী করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন স্বল্পমেয়াদে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের বাংলাদেশের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, আইএমএফের জিডিপি প্রজেকশন নিয়ে বিতর্ক করতে চাই না। তবে বাজেটে দেওয়া জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে আশা করি।
