ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা স্টারলিংকের সেবা বিভিন্ন দেশে চালু বা বন্ধ করতে জো বাইডেন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন একাধিকবার স্পেসএক্সের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর স্টারলিংক ব্যবহারে চলতি মাসে বিধিনিষেধ আরোপের অনেক আগেই এসব অনুরোধ করা হয়। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ছয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
সাবেক চার কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ইয়েমেন ও লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর স্টারলিংক ব্যবহার বন্ধ করতে সেবাটি নিষ্ক্রিয় করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। একই সময়ে ইরান ও ইউক্রেনে ইন্টারনেট সুবিধা দিতে স্টারলিংক চালুর অনুরোধও করেছিল তাঁর প্রশাসন। এর উদ্দেশ্য ছিল ইরানে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো এবং ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করা।
একইভাবে, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানে স্টারলিংক চালু করতে মাস্কের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ইন্টারনেট ও যোগাযোগসুবিধা বাড়াতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরেক ব্যক্তি।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। স্টারলিংক ব্যবহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনগুলোর এসব অনুরোধের তথ্য এই প্রথম প্রকাশ্যে এল।
সম্প্রতি ইউক্রেনে স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট সেবা ব্যবহারে বিধিনিষেধ নিয়ে বিতর্ক নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও মাস্কের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং দেশটির মিত্রদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট ব্যবস্থার মালিক স্পেসএক্স। বাইডেন ও ট্রাম্প প্রশাসনের অনুরোধগুলো দেখায়, পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নজিরবিহীনভাবে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইউক্রেনের ওপর সাম্প্রতিক বিধিনিষেধ ইউরোপীয় কর্মকর্তাদেরও উদ্বিগ্ন করেছে। তাঁদের কেউ কেউ মনে করছেন, সামরিক যোগাযোগের জন্য ইউরোপের নিজস্ব স্যাটেলাইট সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। কারণ, স্বল্পমেয়াদে স্টারলিংকের কার্যকর বিকল্প নেই।
স্টারশিল্ডে বিধিনিষেধে বিপাকে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত সপ্তাহে বলেছিলেন, তাঁর দেশের সামরিক সংস্করণ স্টারলিংক—স্টারশিল্ড ব্যবহারে ইচ্ছাকৃতভাবে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। এতে ইউক্রেনের সামরিক ড্রোনের কার্যকারিতা ব্যাহত হচ্ছে। রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করাসহ সামরিক বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত স্টারলিংক সেবার গতিও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, স্টারশিল্ডের গতি কমানোর নির্দেশ এসেছিল হোয়াইট হাউসের ভেতর থেকে। ট্রাম্প প্রশাসন সেবার গতি কমানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও এ নির্দেশ তারা দিয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট করেনি।
মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে হোয়াইট হাউস রয়টার্সকে শুক্রবার ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ওই দিন ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনে স্টারলিংকের প্রবেশাধিকার নিয়ে সমস্যা বিষয়ে তিনি মাস্কের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে ‘কোনো সমস্যা থাকলে আমি তা ঠিক করে দেব’ বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
ওয়াশিংটনে ইউক্রেন দূতাবাসের মুখপাত্র হালিনা ইউসিপিউক বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক গতিতে সেবা ফিরিয়ে আনা আমাদের অগ্রাধিকার। কারণ, আমাদের মানুষের জীবন এর ওপর নির্ভর করছে।’
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্সের অনুরোধে সাড়া দেয়নি স্পেসএক্স। তবে চলতি সপ্তাহের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাস্ক লিখেছেন, ‘স্টারশিল্ড ব্যবস্থার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে। গতি বা ব্যবহারের ওপর যেকোনো বিধিনিষেধের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।’
শুক্রবার স্টারলিংক সেবায় সাম্প্রতিক পরিবর্তন সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো। স্পেসএক্সের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ক্রো বলেন, ‘নির্বাচিত নন—এমন বিলিয়নিয়ার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনটি ভালো, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।’
ইউক্রেনের জন্য স্টারলিংক এখন সম্মুখসারিতে অবস্থানরত সামরিক ইউনিটগুলোর মধ্যে যোগাযোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ইউক্রেনীয় সেনাদের ভাষ্য, স্পেসএক্সের প্রযুক্তির সমতুল্য সক্ষমতা এখন পর্যন্ত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নেই।
রেডিও সংকেত বাধাগ্রস্ত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অনেকটাই কার্যকর স্টারশিল্ডের রিসিভারগুলো ইউক্রেনের ড্রোনে নির্দেশনা ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এগুলোর মাধ্যমে দূরবর্তী পাইলটের সঙ্গে যোগাযোগও বজায় রাখা হয়। রুশ নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার গভীরে পরিচালিত ড্রোনেও এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
মাস্কের প্রভাব নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তায় ব্যাপক প্রভাব রয়েছে, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের দৃঢ়চেতা প্রধান নির্বাহী হিসেবে মাস্কের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট সেবার বিষয়ে প্রকৃত সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
স্যাটেলাইট শিল্পবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সামিট রিজ গ্রুপের প্রেসিডেন্ট আরমান্ড মুসি বলেন, ‘সরকারি চুক্তি পাওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক নির্বাহী হওয়ার কথা তাঁর। অথচ তিনি কার্যত পররাষ্ট্রনীতির বড় বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাঁর ব্যক্তিত্ব এমনই অস্পষ্ট যে তাঁর সিদ্ধান্তগুলো ব্যক্তিগত খেয়ালখুশির কারণে নেওয়া হচ্ছে, নাকি অন্য কোনো প্রভাব তাঁকে পরিচালিত করছে—তা বোঝা কঠিন।’
এর আগেও ইউক্রেনে স্টারলিংক ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন মাস্ক। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইউক্রেন যে এলাকাগুলো পুনর্দখলের চেষ্টা করছিল, সেসব অঞ্চলে স্টারলিংকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে স্পেসএক্সের কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। এতে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বিস্মিত হয়েছিলেন।
মাস্ক প্রকাশ্যে বলেছেন, ২০২২ সালে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে ক্রিমিয়ার সেভাস্তোপোল বন্দরে তাঁর স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক চালুর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি। ইউক্রেনীয় বাহিনী সেখানে রুশ নৌবহরের ওপর হামলা চালাতে চেয়েছিল। বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় তিনি ওই অনুরোধে সাড়া দেননি বলে জানান।
সাবেক পাঁচ মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাইডেন প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে নীতি বাস্তবায়নে মাস্কের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদের ঠেকাতে স্টারলিংক সেবা বন্ধ করা এবং মিত্রদের সহায়তায় এর ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে স্পেসএক্সের সঙ্গে সমন্বয় করতেন বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
এসব আলোচনায় সাধারণত পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা অংশ নিতেন। ইয়েমেনে ইরান-সংশ্লিষ্ট হুতি এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলো যাতে স্টারলিংক টার্মিনাল ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই ছিল আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়।
সাবেক কর্মকর্তারা জানান, হুতিরা ও হিজবুল্লাহ স্টারলিংকের কিছু টার্মিনাল ব্যবহার করছে—এমন গোয়েন্দা তথ্য স্পেসএক্সের সঙ্গে কয়েকবার ভাগ করে নিয়েছিল বাইডেন প্রশাসন। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এসব গোষ্ঠীর হাতে টার্মিনালগুলো পৌঁছেছিল বলে ধারণা করা হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা হোয়াইট হাউসকে জানান, হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্টারলিংক টার্মিনাল ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে থাকতে পারেন। ২০২৪ সালে হুতিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান অভিযান চলাকালেও ইয়েমেনে একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়।
সাবেক পাঁচ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, উভয় ক্ষেত্রেই প্রশাসন স্পেসএক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে টার্মিনালগুলো শনাক্ত করে বন্ধ করে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তার দাবি, অন্তত কয়েকটি টার্মিনাল নিষ্ক্রিয় করা হয়েছিল।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটিতে জমা দেওয়া এক বিবৃতিতে স্পেসএক্স জানায়, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে রপ্তানির অনুমোদন নিশ্চিত করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য পূরণে প্রযুক্তির সুরক্ষা দিতে তারা সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে।
ইরান ও ইউক্রেনে স্টারলিংক চালুতে উদ্যোগ
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর জন্য স্টারলিংকের ব্যবহার বাড়াতে স্পেসএক্সের ওপর চাপ দিয়েছিলেন বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সাবেক দুই মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হলে দেশটিতে স্টারলিংক চালু করার অনুরোধ জানায় বাইডেন প্রশাসন। হিজাব যথাযথভাবে না পরার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ওই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল।
এক সাবেক কর্মকর্তা জানান, প্রশাসনের সহায়তায় স্টারলিংকের টার্মিনাল ইরানে নেওয়া হয়েছিল। তবে কতগুলো টার্মিনাল সেখানে পাঠানো হয়েছিল, তা জানাতে রাজি হননি তিনি।
চলতি বছরের শুরুতেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেয় ট্রাম্প প্রশাসন। ২০২৫ সালের জুন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর দেশটিতে স্টারলিংক টার্মিনাল পাঠানো ও চালুর বিষয়ে মাস্ক এবং স্পেসএক্সের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরেক ব্যক্তি।
তবে এসব টার্মিনাল চালু করা হয়েছিল কি না, তা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেনি ট্রাম্প প্রশাসন বা স্পেসএক্স। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইরানে হাজার হাজার স্টারলিংক টার্মিনাল পাঠিয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধিদল কোনো সাড়া দেয়নি।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/
