।। জেমস আব্দুর রহিম রানা ।।
সদ্য শেষ হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। আলোকসজ্জায় ঝলমল মণ্ডপ, দেবী দুর্গার প্রতিমায় অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীকী বার্তা আর উৎসবের আনন্দমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে বিদায় নিয়েছে বাঙালির অন্যতম প্রধান এই ধর্মীয় পার্বণ। কিন্তু উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও থেকে যায় এক গভীর প্রশ্ন—দেবীর কাছে অশুভ শক্তির বিনাশ কামনা করে আমরা কি বাস্তব জীবনের অন্যায়, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, মাদকাসক্তি, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থে দাঁড়াতে পেরেছি? প্রতিমার সামনে প্রণত মস্তক কি অন্যায়ের সামনে প্রতিবাদী হতে শিখেছে? শুভশক্তির বিজয় উদ্যাপনের পর আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে সেই বিজয়ের প্রতিফলন কতটুকু?
দুর্গাপ্রতিমার সামনে মাথা নত করি, অথচ অন্যায়ের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি কি? দেবীর হাতে অসুরবধের দৃশ্য দেখে শুভশক্তির জয় কামনা করি, অথচ দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, বৈষম্য, মাদকাসক্তি, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে আমাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ কতটা দৃঢ়? প্রতি বছর জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে দুর্গোৎসব ফিরে আসে; আলোকসজ্জায় ঝলমল করে মণ্ডপ, আনন্দে মুখর হয় জনপদ। কিন্তু উৎসবের আলো কি আমাদের সমাজের অন্ধকার দূর করতে পারছে? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
দুর্গোৎসবের তাৎপর্য কি কেবল কয়েক দিনের ধর্মীয় আচার, বর্ণিল আলোকসজ্জা ও আনন্দ-উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি এর প্রতীকী শিক্ষা ধারণ করতে পারে একটি নৈতিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের শক্তি? উৎসবের জৌলুশ শেষ হয়েছে, কিন্তু সমাজের অন্ধকার দূর করার দায়িত্ব শেষ হয়নি। বরং উৎসব-পরবর্তী সময়েই আত্মসমালোচনার প্রয়োজন আরও বেশি। কারণ, প্রতিমার সামনে শুভশক্তির জয় কামনা করাই যথেষ্ট নয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান, দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার মধ্য দিয়েই সেই জয়ের প্রকৃত অর্থ প্রতিষ্ঠিত হয়।
দুর্গোৎসব কেবল প্রতিমা নির্মাণ, পূজা-অর্চনা ও আনন্দ-উৎসবের কয়েক দিনের আয়োজন নয়। এর অন্তর্নিহিত প্রতীক ও পৌরাণিক আখ্যানের মধ্যে রয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, জ্ঞান ও বিবেকের চর্চা, শক্তির ন্যায়সংগত ব্যবহার, সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা। আজ প্রশ্ন শুধু দুর্গোৎসব কত বড় করে উদ্যাপিত হচ্ছে, তা নয়; প্রশ্ন হলো, এই উৎসব আমাদের কতটা মানবিক করে তুলছে। দেবীর আরাধনা যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস না জোগায়, সরস্বতীর বন্দনা যদি জ্ঞান ও যুক্তিবোধের বিকাশ না ঘটায়, লক্ষ্মীর আরাধনা যদি অসহায় মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ না জাগায়, তবে আমাদের আত্মসমালোচনা জরুরি। ধর্মীয় বিশ্বাসের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেই দুর্গোৎসবকে সামাজিক দায়বদ্ধতা, নৈতিক জাগরণ ও মানবিক উন্নয়নের কার্যকর উপলক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এখন সময় এসেছে প্রতিমার প্রতীকী ভাষাকে জীবনের বাস্তব আচরণে রূপ দেওয়ার।
দুর্গাপ্রতিমার কেন্দ্রে রয়েছেন মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গা। পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ই তাঁর আবির্ভাব ও অসুরবধের প্রধান তাৎপর্য। এই প্রতীকী শিক্ষা বর্তমান সমাজের জন্যও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। আজকের অসুরকে শুধু পৌরাণিক চরিত্রের মধ্যে খুঁজলে চলবে না; দুর্নীতি, ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী নির্যাতন, শিশু নিপীড়ন, মাদকাসক্তি, প্রতারণা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং অসহায় মানুষের অধিকার হরণের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধেও সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এসব সমস্যা কোনো একটি ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের একক সংকট নয়; এগুলো সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
দেবীর হাতে ধারণ করা অস্ত্রগুলো শক্তি ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। আধুনিক সমাজে এই প্রতিরোধের অর্থ প্রতিহিংসা কিংবা সহিংসতা নয়; বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক অবস্থান, অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার এবং দুর্বল মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। যে সমাজে অপরাধীর পরিচয়, অর্থ কিংবা ক্ষমতা বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যে সমাজে ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার চাইতে ভয় পান, সেই সমাজে শুভশক্তির বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা পায় না। দুর্গোৎসবের অঙ্গীকার হোক—অন্যায়কে প্রশ্রয় নয়, ন্যায়কে সমর্থন; অপরাধীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।
দেবীর বাহন সিংহ শক্তি, সাহস ও বীরত্বের প্রতীক। কিন্তু শক্তির প্রকৃত সার্থকতা দুর্বলের ওপর আধিপত্য বিস্তারে নয়, দুর্বলকে সুরক্ষা দেওয়ায়; ক্ষমতা প্রদর্শনে নয়, ক্ষমতার ন্যায়সংগত ব্যবহারে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই শক্তির সঙ্গে দায়িত্ববোধ যুক্ত না হলে তা অন্যায়ের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। তাই সিংহের প্রতীকী শিক্ষা হতে পারে, সাহসী হওয়া মানে শুধু নিজের স্বার্থ রক্ষা করা নয়; বরং নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অনিয়মের প্রতিবাদ করা এবং সত্যের পক্ষে কথা বলার নৈতিক শক্তি অর্জন করা।
নারী নির্যাতন, যৌতুক, বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি এবং নারীর প্রতি অবমাননাকর আচরণ আজও সমাজের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। অথচ দুর্গাকে শক্তি ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে আরাধনা করা হয়। এই আরাধনার সঙ্গে বাস্তব জীবনে নারীর নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সমান অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার যুক্ত না হলে তা আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। দেবীকে সম্মান জানানো আর জীবিত নারীকে মর্যাদা দেওয়া—দুটিকে পরস্পরবিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। দুর্গোৎসবের সামাজিক বার্তা হোক, নারীকে প্রতীকী সম্মানের আসনে বসানোর পাশাপাশি তাঁর বাস্তব অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বিদ্যা, সংগীত ও শিল্পকলার দেবী সরস্বতী জ্ঞানচর্চা ও বিবেকবোধের প্রতীক। অথচ সমাজে গুজব, অপতথ্য, অন্ধবিশ্বাস, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং যাচাইহীন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়লে জ্ঞানের প্রকৃত মূল্য প্রশ্নের মুখে পড়ে। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু সনদ অর্জন নয়; সত্য-মিথ্যা যাচাই করা, যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া, ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং মানুষের কল্যাণে নিজের মেধা ব্যবহার করাও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। দুর্গোৎসবের আয়োজনে শিশু-কিশোরদের জন্য পাঠচক্র, বইপড়া, বিজ্ঞানমনস্কতা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সচেতনতামূলক আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে উৎসব আনন্দের পাশাপাশি জ্ঞান ও বিবেকের বিকাশের ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।
লক্ষ্মী সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের প্রতীক। কিন্তু সমৃদ্ধি যদি কেবল ব্যক্তিগত প্রাচুর্যের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকে, আর একই জনপদের কোনো পরিবার অভাবের কারণে চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা ন্যূনতম খাদ্য থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্য অপূর্ণ থেকে যায়। লক্ষ্মীর বাহন পেঁচাকে ঘিরে প্রচলিত প্রতীকী ব্যাখ্যায় সতর্কতা ও বিচক্ষণতার ধারণা রয়েছে। সেই শিক্ষা অনুসরণ করে পূজার অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, ব্যয়ের জবাবদিহি এবং জনকল্যাণের বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। পূজামণ্ডপের সৌন্দর্য রক্ষা করেই অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সহায়তা, দরিদ্র রোগীর চিকিৎসা, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়তা এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।
গণেশের সঙ্গে প্রজ্ঞা, শুভসূচনা ও বিঘ্ন অতিক্রমের ধারণা যুক্ত। তাঁর ক্ষুদ্র বাহন ইঁদুরের উপস্থিতিকে সূক্ষ্মতা, তৎপরতা ও বাধা অতিক্রমের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। সমাজের অবক্ষয়ও এক দিনে তৈরি হয় না; অবহেলা, অনিয়ম, দায়িত্বহীনতা এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপসের মধ্য দিয়ে তা ক্রমে গভীর হয়। তাই সামাজিক পরিবর্তনের জন্য শুধু বড় বড় বক্তৃতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবারে নৈতিক শিক্ষার চর্চা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধের বিকাশ, আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা।
কার্তিকের সঙ্গে সাহস, শৌর্য ও বীরত্বের ধারণা যুক্ত। এই প্রতীকী শিক্ষা তরুণ সমাজের বিকাশেও প্রাসঙ্গিক। তরুণদের মাদক, সহিংসতা, অনলাইন প্রতারণা ও অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখতে শুধু উপদেশ দিলে হবে না; তাঁদের জন্য খেলাধুলা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, স্বেচ্ছাসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। পূজামণ্ডপ ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলো তরুণদের নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, রক্তদানে উৎসাহ, বৃক্ষরোপণ, মাদকবিরোধী প্রচার এবং অসহায় মানুষের সহায়তামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে। উৎসবের আনন্দ তখন তরুণদের ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তরিত হবে।
শিবের সঙ্গে আত্মসংযম, ধ্যান ও আত্মোপলব্ধির ধারণা এবং নন্দীর সঙ্গে বিশ্বস্ততা ও ধৈর্যের প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে। সমাজে নৈতিক অবক্ষয় রোধে ব্যক্তির আত্মসমালোচনা অপরিহার্য। অন্যের দুর্নীতি নিয়ে সরব হয়ে নিজের অনিয়মকে বৈধতা দেওয়া, অন্যের অসহিষ্ণুতার সমালোচনা করে নিজে ভিন্নমতকে অপমান করা কিংবা ন্যায়বিচারের দাবি তুলে ব্যক্তিগত স্বার্থে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া—এসব দ্বিচারিতা সামাজিক মূল্যবোধকে দুর্বল করে। পরিবর্তনের সূচনা তাই শুধু রাষ্ট্র বা প্রশাসনের কাছ থেকে প্রত্যাশা করলে হবে না; ব্যক্তি, পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক নেতৃত্ব—সব স্তরেই জবাবদিহি এবং আত্মশুদ্ধির চর্চা গড়ে তুলতে হবে।
দুর্গাপ্রতিমার পেছনের চালচিত্রে পৌরাণিক কাহিনি, ফুল, লতাপাতা ও নানা নকশার সমাবেশ দেখা যায়। একেকটি উপাদান যেমন সামগ্রিক শিল্পরূপকে পূর্ণতা দেয়, তেমনি সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ ছাড়া ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, গণমাধ্যম, ধর্মীয় সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা আলাদা হলেও লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের মর্যাদা রক্ষা এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। কোনো একটি প্রতিষ্ঠান একা সামাজিক অবক্ষয় দূর করতে পারবে না; প্রয়োজন পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত উদ্যোগ।
এখানেই দুর্গোৎসবকে সামাজিক পরিবর্তনের একটি বাস্তব মডেল হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিহিত। প্রতিটি পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে একটি মানবিক কর্মপরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। উৎসবের আগে ও পরে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নারী-শিশু ও প্রবীণদের নিরাপত্তা, প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশের উপযোগী ব্যবস্থা, স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন, গুজব ও সাম্প্রদায়িক উসকানির বিরুদ্ধে সচেতনতা এবং অসচ্ছল মানুষের সহায়তায় তহবিল পরিচালনা—এসব উদ্যোগ উৎসবকে জনকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। তবে এসব কার্যক্রম যেন কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়ে না থাকে, সে জন্য আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব, দায়িত্ব বণ্টন এবং উৎসব-পরবর্তী মূল্যায়নও জরুরি।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। দুর্গোৎসব হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব; এর ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য ও উপাসনার অধিকারকে পূর্ণ সম্মান জানানো জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিবেশী, সহকর্মী ও নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করতে পারে। সম্প্রীতি মানে মতপার্থক্য মুছে ফেলা নয়; বরং মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একে অপরের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা। উৎসবের সময় মণ্ডপের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, স্বেচ্ছাসেবা ও মানবিক সহায়তায় সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা সেই নাগরিক দায়িত্বেরই প্রকাশ হতে পারে।
তবে সামাজিক পরিবর্তনের এই আহ্বানকে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর একতরফা নৈতিক দায় চাপানোর উপায় হিসেবে দেখা উচিত নয়। দুর্নীতি, সহিংসতা, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা কোনো এক ধর্ম বা জনগোষ্ঠীর একক সমস্যা নয়। এসব মোকাবিলায় সবার জন্য সমান আইন, মানবিক শিক্ষা, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং সামাজিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ধর্মীয় উৎসব মানুষের মধ্যে ভালো কাজের প্রেরণা জাগাতে পারে; কিন্তু সেই প্রেরণাকে স্থায়ী পরিবর্তনে রূপ দিতে হলে ধারাবাহিক সামাজিক উদ্যোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধ অপরিহার্য।
দুর্গোৎসবের সার্থকতা তাই শুধু কত বড় মণ্ডপ নির্মিত হলো, কত ব্যয়বহুল আলোকসজ্জা করা হলো কিংবা কত মানুষ প্রতিমা দর্শনে এলেন—এসব দিয়ে সম্পূর্ণভাবে বিচার করা যায় না। বিচার করতে হবে, উৎসব মানুষের মধ্যে কতটা মানবিকতা জাগাল, অসহায় মানুষের জীবনে কতটা সহায়তা পৌঁছাল, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে কতটা সচেতনতা তৈরি হলো, তরুণেরা কতটা ইতিবাচক কাজে যুক্ত হলো এবং ভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা কতটা দৃঢ় হলো। বাহ্যিক আয়োজনের পাশাপাশি এই সামাজিক অর্জনগুলোও উৎসবের মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।
দেবী দুর্গার হাতে অশুভের পরাজয়, সরস্বতীর জ্ঞান, লক্ষ্মীর সমৃদ্ধি, গণেশের প্রজ্ঞা এবং কার্তিকের সাহস—এসব প্রতীককে যদি বাস্তব জীবনের নৈতিক আচরণে রূপ দেওয়া যায়, তবেই প্রতিমার অন্তর্নিহিত ভাষা সমাজে কার্যকর হয়ে উঠবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা ভাঙা, দুর্নীতির সঙ্গে আপস না করা, নারী ও শিশুর মর্যাদা রক্ষা, দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো, জ্ঞান ও যুক্তির চর্চা এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষের অধিকারকে সম্মান করা—এসবই হতে পারে দুর্গোৎসবের মানবিক অঙ্গীকার।
দুর্গোৎসব প্রতি বছর আমাদের সামনে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক তুলে ধরে। এখন প্রয়োজন সেই প্রতীকের শিক্ষা ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক আচরণ ও নাগরিক দায়িত্বে বাস্তবায়ন করা। পূজামণ্ডপ থেকে যদি নৈতিকতার আহ্বান ঘরে ঘরে পৌঁছায়, উৎসবের আনন্দ যদি অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটায়, আর সম্প্রীতির বাণী যদি অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সম্মিলিত উদ্যোগে রূপ নেয়, তাহলে দুর্গোৎসব ধর্মীয় ঐতিহ্যের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেই সামাজিক পরিবর্তন ও মানবিক উন্নয়নের শক্তিশালী উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিমার সামনে প্রণাম যেন জীবনের আচরণেও প্রতিফলিত হয়—অশুভের বিরুদ্ধে সাহস, জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্পদের ব্যবহারে দায়িত্ববোধ এবং প্রতিটি মানুষের প্রতি মানবিক মর্যাদা। এই হোক দুর্গোৎসবের সামাজিক অঙ্গীকার। উৎসবের আলো শুধু মণ্ডপে নয়, ছড়িয়ে পড়ুক মানুষের বিবেক, আচরণ ও সমাজব্যবস্থায়।
লেখক: জেমস আব্দুর রহিম রানা।
সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।

