ছবির ক্যাপশন: .
আসিফ চৌধুরী, বিশেষ সংবাদদাতা :
কেরানীগঞ্জের ইতিহাসে ২ এপ্রিল একটি শোকাবহ দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রাণ হারান হাজারো নিরস্ত্র মানুষ। নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ—কেউই সেই বর্বরতা থেকে রক্ষা পাননি।
স্বাধীনতার জন্য জীবন বাঁচাতে যারা ঢাকার দমন-পীড়ন থেকে পালিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী পাড়ি দিয়ে কেরানীগঞ্জে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাদের জন্যই এই জনপদ পরিণত হয় মৃত্যুকূপে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় শুরু হওয়া ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর পর আতঙ্কিত মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে কেরানীগঞ্জে ছুটে আসেন। কিন্তু ২ এপ্রিল ভোরে পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতির অজুহাতে জিনজিরা, আগানগর ও শুভাঢ্যা এলাকায় পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায়।
সেদিন ভোরের নীরবতা ভেঙে চারদিকে শুরু হয় নির্বিচারে গুলি ও ব্রাশফায়ার। ঘুমন্ত মানুষকে লক্ষ্য করে চালানো এ হামলায় মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় পুরো এলাকা। অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দেন, অনেকে ঘরবাড়ির ভেতরেই প্রাণ হারান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই দিনের হৃদয়বিদারক চিত্র—চারদিকে মানুষের আর্তচিৎকার, আগুনের লেলিহান শিখা ও মৃত্যুর বিভীষিকা।
বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ওই দিনের হত্যাযজ্ঞে প্রায় ৫ হাজারের বেশি মানুষ শহীদ হন। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়, কারণ অনেকের লাশ নদীতে ভেসে যায় এবং অনেককে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
দিবসটি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (০২ এপ্রিল) সকালে কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এ সময় বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয়।
দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিলসহ নানা আয়োজন।
কেরানীগঞ্জের এই গণহত্যা শুধু একটি স্থানীয় ঘটনা নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। এই দিনের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে।
রক্তাক্ত ২ এপ্রিল স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের ত্যাগ ও আত্মদানের ইতিহাস, যা বাঙালির জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
