.
অনলাইনে ট্রেনের টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে উধাও হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা বট ব্যবহার। বটের মাধ্যমে টিকিট ব্লক করে পরে অননুমোদিত ওয়েবসাইটে বাড়তি দামে বিক্রি করা হতো যাত্রীদের কাছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের এক অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এ তথ্য। এ সংক্রান্ত একটি নথি হাতে এসেছে জাগো নিউজের। এতে ই-টিকেটিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের টিকিট বিক্রি শুরুর পরপরই তা উধাও হয়ে যাচ্ছে। যাত্রীদের অভিযোগ, অনলাইনে টিকিট না পাওয়া গেলেও বিভিন্ন মাধ্যমে বাড়তি দামে টিকিট বিক্রির প্রস্তাব পাওয়া যায়।
টিকিটের এমন সংকট ও সম্ভাব্য কালোবাজারি নিয়ে সিলেটে আদালত পর্যন্ত গড়ায় বিষয়টি। গত ২২ সেপ্টেম্বর সিলেটের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল নোমান স্বপ্রণোদিত হয়ে একটি মামলা করেন। পরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)।
কয়েক মিনিটেই শেষ টিকিট, কালোবাজারির অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, সিলেট থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর উপবন, কালনী, জয়ন্তিকা ও পারাবত এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন ট্রেনের টিকিট নিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তির কথা সামনে এসেছে। এছাড়া ঢাকা-কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন রুটের টিকিট না পেয়ে অনেক যাত্রীকে বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে টিকিট সংগ্রহের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অনলাইনে টিকিট প্রকাশের পর এত দ্রুত সেগুলো শেষ হয়ে যাওয়ার পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে দ্রুত টিকিট সংগ্রহ করছেন।
টিকিট কালোবাজারির অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগে গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে অবৈধভাবে টিকিট সংগ্রহ করে বিক্রির অভিযোগে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) দুই সদস্যকে আটক করে জেলা প্রশাসন। তাদের কাছ থেকে টিকিট সংগ্রহ ও বিক্রিতে ব্যবহৃত হয়েছে বলে সন্দেহ করা মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন আলামত জব্দের কথা জানানো হয়েছিল।
এর আগে ৭ অক্টোবর সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে অনলাইনে টিকিট ছাড়ার এক মিনিটের মধ্যেই কক্সবাজারগামী দুটি ট্রেনের সব টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও নাট্যকার আশফাক নিপুণ। টিকিট কালোবাজারি ও অদৃশ্য সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিষয়টিকে ‘কমার্স ফিকশন’ বলে অভিহিত করেন তিনি।
নিপুণ লেখেন, ‘ঘড়ির কাঁটা ঠিক আটটায় পৌঁছাতেই সার্চ অপশনে ক্লিক করি। চোখের সামনে সারি সারি খালি সিট ভেসে ওঠে। কিন্তু ৮টা বাজতেই টিকিট কাটার প্রক্রিয়া শুরু করার পর ৮টা ১ মিনিটে দেখি দুটি ট্রেনের সব টিকিট শেষ! চোখের পলকে একদম সব ফাঁকা!’
একজন নিয়মিত ট্রেনের যাত্রী হিসেবে স্বাভাবিক টিকিট কাটার গাণিতিক হিসাব তুলে ধরে নির্মাতা প্রশ্ন তোলেন, ‘একটি টিকিট নির্বাচন, ওটিপি প্রদান, পেমেন্ট গেটওয়ের তথ্য দিয়ে রিকনফার্ম করতেও তো অন্তত সাড়ে ছয় থেকে সাত মিনিট সময় লাগে। সবার দ্রুতগতির ইন্টারনেট থাকলেও সব টিকিট বিক্রি সম্পন্ন হতে ন্যূনতম ৮টা ৭ মিনিট বাজার কথা। সেখানে এক মিনিটে পুরো দুটি ট্রেনের সব টিকিট কীভাবে শেষ হয়ে যায়? জুল ভার্ন লিখেছিলেন সায়েন্স ফিকশন ‘৮০ দিনে বিশ্ব ভ্রমণ’, আর আমাদের রেলওয়ে লিখলো ‘এক মিনিটে দুই ট্রেন গায়েব’র মতো কমার্স ফিকশন!’
রেলওয়ের শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে দায়ী করে নিপুণ আরও লেখেন, ‘সরকার বদল হলেও এই সিন্ডিকেটের কোনো পরিবর্তন হয় না। কোনো আমলেই সাধারণ মানুষ সহজে টিকিট পায় না। যে সরকারই আসুক না কেন, এই টিকিট চক্রের ক্ষমতা এতটাই প্রবল যে তাদের কাছে কোনো নিয়মনীতি কার্যকর হয় না।’
এছাড়া গত কয়েক দিনে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন ফেসবুকে বেশ কয়েকটি স্ট্যাটাস দেন। এসব স্ট্যাটাসে তিনি রেলের টিকিটিং কার্যক্রমের বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরেন।
নড়েচড়ে বসেছে রেল কর্তৃপক্ষ
অনলাইন টিকিট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার পর নড়েচড়ে বসেছে রেল কর্তৃপক্ষ। স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করা হচ্ছে বলে বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ব্লক করা টিকিট অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সাধারণ যাত্রীদের কাছে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সহকারী, উপপরিচালক (টিসি), পরিচালক (বাণিজ্যিক) এবং যুগ্ম মহাপরিচালক (অপারেশন) ওই নথিতে স্বাক্ষর করেন।
রেলওয়ের ওই নথিতে ট্রেনের ই-টিকেটিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘পিপি-২৯’ শিরোনামের নথিতে ‘bookmyrailbd.com’ নামে একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে ট্রেনের টিকিট ব্লক ও কালোবাজারি-সংক্রান্ত কার্যক্রমের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, ওয়েবসাইটটি পরিচালনাকারীরা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বট ব্যবহার করে বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকেটিং সিস্টেম থেকে টিকিট বিক্রি শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বিপুল সংখ্যক টিকিট ব্লক করে রাখছে।
নথি অনুযায়ী, পরবর্তীসময়ে এসব ব্লক করা টিকিট অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সাধারণ যাত্রীদের কাছে অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে সাধারণ যাত্রীরা ন্যায্যমূল্যে টিকিট পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি রেলওয়ের ই-টিকেটিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
রেলওয়ের নথিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের ইন্টিগ্রেটেড টিকেটিং সিস্টেম (BRITS) পরিচালনার জন্য সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির নিরাপত্তা-সংক্রান্ত শর্তের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
নথি অনুযায়ী, চুক্তির দরপত্রের Section VI: Technical Requirements-এর F.14, Security Requirements অংশের SEC-16 ধারায় অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ অবস্থায় স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করার অভিযোগ ই-টিকেটিং ব্যবস্থার নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।
সহজের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রস্তাব
নথির শেষাংশে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পত্র পাঠানো যেতে পারে। এজন্য ১১ অক্টোবর স্বাক্ষরিত চিঠিতে তিন কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সহজের বক্তব্য
অননুমোদিতভাবে টিকিট ব্লকের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সহজ লিমিটেড লিখিত বক্তব্যে জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের ইন্টিগ্রেটেড টিকেটিং সিস্টেমে (BRITS) বটসহ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহার করে অননুমোদিতভাবে টিকিট ব্লক ও কালোবাজারির অভিযোগের বিষয়ে তারা বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এ ধরনের কার্যক্রম শনাক্ত ও প্রতিরোধে সহজ শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরিচালনা করছে এবং চলতি বছর থেকে অতিরিক্ত শনাক্তকরণব্যবস্থা জোরদার করেছে। বিষয়টি যথাযথভাবে মোকাবিলা ও যাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সহজ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে।
চিঠি দেওয়ার বিষয়ে জানেন না রেল কর্মকর্তা
নথিতে স্বাক্ষরকারীদের একজন বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালক ট্রাফিক (বাণিজ্যিক) মো. মিজানুর রহমান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওইটা তো অলরেডি বন্ধ হইছে।’
সহজকে চিঠি দেওয়া হয়েছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কে বলছে আপনাকে চিঠি দেওয়ার কথা, যে বলছে তার কাছে ফোন দেন।’
এই প্রতিবেদকের কাছে এ বিষয়ক নথি আছে জানালে তিনি বলেন, ‘কীসের? আমি তো জানি না। যে বলছে তার কাছে যান। আমাকে সিদ্ধান্তের কপিটা পাঠান। আর এটা তো অফিসিয়াল বিষয়। সিদ্ধান্ত কী, কী চিঠি দেবে!’
নথিতে যে কয়েকজন কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেছেন, তাদের মধ্যে আপনিও একজন- এ কথা জানালে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘কই, আমাকে পাঠান তো হোয়াটসঅ্যাপে, আমি তো জানি না। পাঠান আমাকে, আমি একটু দেখি।’
এই প্রতিবেদক রেলের ওই কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি তো বিষয়টি জানেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনিও তো জানেন।’
পরে এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (অপারেশন) শহিদুল ইসলামকে একাধিকবার কল এবং হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।
জাগোনিউজ-০১/ওয়াইএফ-০১
