প্রাকৃতিক গ্যাস সংকটে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এক সময় গৃহস্থালির রান্নার কাজে ব্যবহৃত হলেও এখন শিল্পকারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও যানবাহনেও বাড়ছে এ জ্বালানির নির্ভরতা। পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ না পাওয়া এবং বিদ্যমান সংযোগে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না মেলায় বিকল্প হিসেবে এলপিজির দিকে ঝুঁকছেন ভোক্তা ও উদ্যোক্তারা। বর্তমানে দেশে বছরে এলপিজির চাহিদা প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ মেট্রিক টন। প্রতিবছর গড়ে ১০ শতাংশ হারে চাহিদা বাড়ছে। খাতসংশ্লিষ্টদের পূর্বাভাস, ২০৩৫ সাল নাগাদ এ চাহিদা ৪০ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছাতে পারে।
চাহিদা বাড়লেও এলপিজির আমদানি, সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থায় সরকারের অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বাজারে সরকারি খাতের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বাকি ৯৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেসরকারি খাতনির্ভর। ফলে আমদানি থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ ও ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ— পুরো ব্যবস্থাই মূলত বেসরকারি অপারেটরদের ওপর নির্ভরশীল। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, আমদানিতে বিঘ্ন কিংবা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে দেশের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় এলপিজি এখন আর শুধু রান্নার বিকল্প জ্বালানি নয়, শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সচল রাখার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব বাড়ছে। কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমদানি, মজুদ ও সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাজার স্থিতিশীল রাখার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে। এলপিজির বাজারে সরকারের অংশগ্রহণ
বাড়াতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিলেও সেগুলো অত্যন্ত ধীরগতির। প্রায় এক দশক ধরে বিপিসি বৈঠক আর গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাথমিক পর্যায় পড়ে আছে। চাহিদা প্রতিবছরে প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়লেও সেই অনুপাতে আমদানি ও সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো, মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সংকট মোকাবিলায় সরকারের নিজস্ব কার্যকর ব্যবস্থা কতটা গড়ে উঠেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাজারে দাম বাড়লে বা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে সভা-সমাবেশ, কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও সরবরাহ বাড়ানোর নির্দেশনার বাইরে সরকারের কার্যকর বিকল্প কতটুকু রয়েছে, সেটিও এক প্রশ্ন। প্রায় দুই দশক ধরে দেশে এলপিজির বাণিজ্যিক ব্যবহার ও বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারিত হলেও আমদানি, কৌশলগত মজুদ এবং বাজারে জরুরি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের নিজস্ব সক্ষমতা কেন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বললে তিনি আমাদের সময়কে বলেন, বিপিসি বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে একটি বিদেশি কোম্পানি এবং দেশি কোম্পানি জেএমআইর সঙ্গে চুক্তি করেছে। আপাতত প্রথম চালান হিসেবে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি ও বাজারজাত করা হবে। একই সঙ্গে মহেশখালী চ্যানেল ব্যবহার করে এলপিজি আমদানি করা যায় কিনা সেটা নিয়ে সিঙ্গাপুরের একটি কোম্পানির মাধ্যমে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হচ্ছে। এ ছাড়া মোংলা ও চট্টগ্রামের এলপিজি টার্মিনাল বা স্টোরেজ নির্মাণ নিয়ে যে প্রকল্পগুলো আছে, সেগুলোর কাজও দ্রুত এগিয়ে নিতে কাজ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ২০১৬ সালেও এলপিজির চাহিদা ছিল খুব কম। ফলে এলপিজি নিয়ে সরকারের খুব একটা ভাবনার বিষয় ছিল না। তবে এখন দ্রুত এলপিজির বাজার বড় হওয়ায় সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এলপিজির বাজারে বেসরকারি উদ্যোক্তরা তাদের ইচ্ছেমতো চালাতে না পারে। সরকার তাদের সমাগ্রিক সহযোগিতা করবে, বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে।
দেশে এলপিজির বর্তমান বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ মেট্রিক টন বলে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জ্বালানি বিভাগে একটি উপস্থাপনায় দেখিয়েছেন। বছরে গড়ে ১০ শতাংশ চাহিদা বৃদ্ধির হিসাব ধরে আগামী বছরগুলোয় এই বাজার আরও বড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে হিসাবে ২০৩৫ সালের মধ্যে বার্ষিক চাহিদা ৪০ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে।
এলপিজির চাহিদা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি। দেশে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, বিদ্যমান শিল্পে উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাইপলাইনের গ্যাসের পর্যাপ্ততা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। গৃহস্থালি পর্যায়েও পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, এলপিজির মোট ব্যবহারের প্রায় ৮০ শতাংশ গৃহস্থালি, ১২ শতাংশ বাণিজ্যিক, ৫ শতাংশ যানবাহনে এবং বাকি ৩ শতাংশ অন্যান্য খাতে ব্যবহার হচ্ছে। অর্থাৎ এখনও গৃহস্থালি খাতই এলপিজির প্রধান বাজার। তবে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহার বাড়লে ভবিষ্যতে চাহিদার ধরনেও পরিবর্তন আসবে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য বলছে, দেশের এলপিজি বাজারে সরকারি খাতের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতের অংশ প্রায় ৯৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ফলে আমদানি থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ ও পরিবেশক-ডিলারের মাধ্যমে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রায় পুরো ব্যবস্থাই বেসরকারি অপারেটরদের ওপর নির্ভরশীল।
এদিকে জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এই খাতের সম্প্রসারণ ঘটলেও এর সঙ্গে একটি কাঠামোগত ঝুঁঁকিও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম, জাহাজভাড়া, আমদানির অর্থায়ন, ডলারের বিনিময় হার কিংবা কোনো কোম্পানির আমদানি সক্ষমতায় সমস্যা দেখা দিলে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। আমদানির পাশাপাশি পর্যাপ্ত মজুদ ও বিকল্প সরবরাহের ব্যবস্থা দুর্বল হলে সেই চাপ আরও বাড়ে। ফলে সরকারের একটা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারকে বেসরকারি খাতের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি কার্যকর অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর আমদানিসংক্রান্ত একটি নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশে মোট এলপিজি আমদানির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার ১২৯ দশমিক ৮ মেট্রিক টন। এতে ইউনাইটেড, আইগ্যাস এলপিজি, যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার, বিএম এনার্জি, ওমেরা পেট্রোলিয়াম, মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি ও পেট্রোম্যাক্স এলপিজিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমদানি করেছে।
তথ্যানুযায়ী, ইউনাইটেড, আইগ্যাস এলপিজির আমদানি প্রায় ৩৫ হাজার ২৩২ মেট্রিক টন এবং যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চারের আমদানি প্রায় ৩৩ হাজার ৮০৪ মেট্রিক টন। এ ছাড়া বিএম এনার্জি, ওমেরা পেট্রোলিয়াম, মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি, সান গ্যাস, প্রিমিয়ার এলপি গ্যাস, এসকেএস এলপিজি ও টিএমএসএস এলপিজিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাজারে সক্রিয় রয়েছে। অক্টোবরের ১ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত আমদানির আরেকটি হিসাবে দেখানো হয়েছে মোট ৪২ হাজার ৬৮৪ দশমিক ৩৩১ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে কোম্পানিগুলোকে আমদানি বাড়ানো, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে এলপিজির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চলতি অক্টোবরের ৩ তারিখে একটি সভায় বিদ্যমান সরবরাহ ও মেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী আমদানি অব্যাহত রাখা এবং সক্ষম অপারেটরদের প্রয়োজনে অতিরিক্ত আমদানির উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে বিইআরসিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এলপিজি আমদানি ও বাজারজাতকরণে সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি কী, কোন কোম্পানি কতটুকু আমদানি করেছে, কতটুকু বাজারে সরবরাহ করেছে এবং ঘাটতি থাকলে তার কারণ কী— এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও মনিটর করতে বলা হয়েছে।
এলপিজির দাম নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগও বাড়ছে। জ্বালানি বিভাগের এক বৈঠকে ১২ কেজির সিলিন্ডারের বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত খুচরা দাম এক হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও কোথাও কোথাও বিক্রয়মূল্য এক হাজার ৮৫০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রতি সিলিন্ডারে ১৩ থেকে ২৬৩ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার চিত্র রয়েছে সরকারি হিসাবে। তবে এলাকাভেদে সেটা ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে গত ১৪ অক্টোবর এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক হয়। সেখানে এলপিজি ব্যবসায়ী অপারেটররা পরিবেশক ও ডিলারদের কমিশন, কোম্পানির সরবরাহ, মূল্য সমন্বয় এবং পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে একাধিক সমস্যা তুলে ধরেন। ব্যবসায়ীদের দাবির মধ্যে রয়েছে, পরিবেশকদের কমিশন পুনর্বিবেচনা করে বাড়ানো, কোম্পানিগুলোর মূল্য সমন্বয় বিইআরসির ঘোষণার মাধ্যমে করা, দীর্ঘদিন গ্যাস সরবরাহ করতে না পারা, কোম্পানির সিলিন্ডার অন্য অপারেটরের মাধ্যমে রিফিলের ব্যবস্থা করা এবং চালানে প্রকৃত মূল্য উল্লেখ নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া পরিবেশকের গুদামে কোম্পানি পণ্য পৌঁছে না দিলে গাড়িভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও সিলিন্ডারবাহী গাড়ির রেলিংসংক্রান্ত কারণে মামলা না করা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অযৌক্তিক জরিমানা বন্ধের দাবিও রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটের কারণে এলপিজি এখন আর কেবল রান্নার বিকল্প জ্বালানি নয়; এটি ক্রমেই গৃহস্থালি, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে বার্ষিক চাহিদা ৪০ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছানোর পূর্বাভাস বাস্তব হলে আমদানি, সংরক্ষণ ও বিতরণব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে। এ অবস্থায় শুধু সংকট দেখা দেওয়ার পর কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত এলপিজি নীতিমালা, বাস্তবভিত্তিক চাহিদা পূর্বাভাস, কোম্পানিভিত্তিক আমদানি ও সরবরাহের স্বচ্ছ হিসাব, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সক্ষমতা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা।
