রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন ঘিরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এবারের পূজা আয়োজনের জন্য ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা বাজেট নির্ধারণ করেছে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি ও বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ। প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপের সাজসজ্জা, নিরাপত্তা এবং ছয় দিন প্রসাদ বিতরণসহ বিভিন্ন কাজে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বিজ্ঞাপন ও অনুদানের মাধ্যমে বাজেটের অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এবারের দুর্গাপূজার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব দুর্গাপূজা। পূজা উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণ সাজানো, মণ্ডপ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার এবং দর্শনার্থীদের চলাচল সুশৃঙ্খল রাখতে বিভিন্ন কাজ চলছে। একই সঙ্গে মন্দির মেলাঙ্গনে স্থাপন করা হচ্ছে ৬৪টি সিসি ক্যামেরা।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস জানান, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে দুর্গাপূজার জন্য ১ কোটি ৫২ লাখ টাকার বাজেট করা হয়েছে। প্রতিমা নির্মাণ, সাজসজ্জা, প্রসাদ বিতরণসহ পূজার আনুষঙ্গিক বিভিন্ন কাজে এই অর্থ ব্যয় হবে। বাজেটের পুরো অর্থ বিজ্ঞাপন ও অনুদানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হচ্ছে।
দেড় মাস ধরে তৈরি হচ্ছে প্রতিমা
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরি করে আসছেন শিল্পী সুকুমার পাল। এবারও তার হাতেই তৈরি হচ্ছে পূজার প্রতিমা। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় মাস আগে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিমা নির্মাণের শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে।
এবার প্রতিমা তৈরিতে ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। প্রতিমা নির্মাণের মূল কাজ শেষ হলেও চূড়ান্ত রঙের কাজসহ কিছু প্রস্তুতি বাকি রয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা। তাদের আশা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিমা ও মণ্ডপের সব কাজ শেষ হবে।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে দুর্গাপূজার আয়োজন করে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি ও বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ। পূজা উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপ সাজানো এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
প্রসাদ বিতরণে বাড়তি আয়োজন
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ জানান, এবার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রসাদ বিতরণের পরিমাণ বাড়ানো হবে। এ কারণে অন্যান্য খাতের পাশাপাশি প্রসাদ বিতরণেও তুলনামূলক বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পূজার ছয় দিন প্রসাদ বিতরণ করা হবে। অষ্টমীতে প্রসাদ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার।
এবারের পূজা উপলক্ষে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসবেন বলেও জানান গোপাল চন্দ্র দেবনাথ।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে দুর্গাপূজার জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ১০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান দিয়েছেন ৫ লাখ টাকা।
মণ্ডপের কাজ প্রায় শেষ
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের ফটক রঙিন সাজে সাজানো হয়েছে। ফটকে লেখা হয়েছে শারদীয় শুভেচ্ছা। মন্দিরের দেয়ালেও লাগানো হয়েছে দেবী দুর্গার পোস্টার। মণ্ডপের বিভিন্ন অংশে রং করার কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি মণ্ডপের পেছনে স্থাপনের জন্য কৈলাস পর্বতের ছবি-সংবলিত পোস্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
মণ্ডপের সামনে দর্শনার্থীদের চলাচল সুশৃঙ্খল রাখতে বাঁশের বেড়া তৈরির কাজ চলছে। এ জন্য মাটি খুঁড়ে বাঁশের খুঁটি বসানো হচ্ছে। পরে খুঁটির সঙ্গে বাঁশ বেঁধে বেষ্টনী তৈরি করা হবে।
এ কাজে নিয়োজিত শ্রমিক শাহ আলী জানান, ভক্ত ও দর্শনার্থীরা যাতে পূজা দেখতে এসে সুশৃঙ্খলভাবে চলাচল করতে পারেন, সে জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তারা ছয়জন মিলে সাত থেকে আট দিন ধরে মঞ্চ তৈরি, প্যান্ডেল স্থাপন ও বেড়া দেওয়ার কাজ করছেন। পূজা শুরুর আগেই সব কাজ শেষ করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
অন্যদিকে, মণ্ডপে ওয়েল্ডিংয়ের কাজও চলছে। এ কাজে নিয়োজিত হাবিবুর রহমান জানান, কয়েক দিন ধরে তাঁরা ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করছেন। দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।
মন্দির প্রাঙ্গণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন স্থাপনের কাজও চলছে। এ কাজে নিয়োজিত মো. হামিদুল ইসলাম জানান, পিলার তৈরি করে বিজ্ঞাপন স্থাপন করা হচ্ছে। এ কাজ শেষ করতে আরও প্রায় তিন দিন লাগতে পারে।
আয়োজকেরা জানান, প্রতিমা ও মণ্ডপের সাজসজ্জাসহ বাকি প্রস্তুতি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। দুর্গাষষ্ঠীতে প্রতিমা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
নিরাপত্তায় বসছে ৬৪টি সিসি ক্যামেরা
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সারা বছরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে সেই নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হচ্ছে। এবার মন্দির মেলাঙ্গনে ৬৪টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। পাশাপাশি থাকবে পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস জানান, দুর্গাপূজা উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের কাছ থেকে তাঁরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন। নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের কোনো অভাববোধ নেই বলেও জানান তিনি।
পূজায় বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগমের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মন্দির প্রাঙ্গণে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মন্দির ও মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৩৫৫। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় এবার দেশে ৪৯৬টি বেশি মন্দির ও মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এবার ঢাকা মহানগরে ২৫৭টি মন্দির ও মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছর ঢাকা মহানগরে পূজার সংখ্যা ছিল ২৫৯টি। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এবার ঢাকা মহানগরে দুটি মণ্ডপ বা মন্দিরে পূজা কম হচ্ছে।
আয়োজকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গত বছর সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়নের দুর্গাপূজাও ঢাকা মহানগরের হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এবার ওই ইউনিয়নকে ঢাকা মহানগরের তালিকায় রাখা হয়নি। এ কারণে সংখ্যায় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
দুর্গাপূজায় সরকারি ছুটি পাঁচ দিন
দুর্গাপূজা উপলক্ষে ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি ছুটি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পরের দুই দিন ২৩ ও ২৪ অক্টোবর যথাক্রমে শুক্রবার ও শনিবার। সব মিলিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা পাঁচ দিনের ছুটি পাচ্ছেন।
দুর্গাপূজা উদ্যাপনের জন্য হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে চার কোটি টাকা অনুদান চেয়েছিল। বিশেষ বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া দুর্গাপূজায় ঘরমুখী যাত্রীদের সুবিধাজনক ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে তিন জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে। যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে পাঁচটি ট্রেনের সাপ্তাহিক বন্ধের দিনও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
দুর্গাপূজার পূজার্চনার সূচি
মহালয়ার মধ্য দিয়ে ১০ অক্টোবর থেকে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবর দুর্গাষষ্ঠী, ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাঅষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী পালিত হবে।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপের সাজসজ্জা, প্রসাদ বিতরণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রস্তুতি ঘিরে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ করে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য পূজামণ্ডপ উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
