দুর্গাপূজার ছুটিতে সাজেক ভ্যালি বন্ধ থাকায় পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে বান্দরবানের পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে। বিশেষ করে বগালেক, কেওক্রাডং ও সুনসং পাড়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। তবে দুর্গম পাহাড়ি পথ, গাইডের অতিরিক্ত খরচ এবং যাতায়াত ভাড়া নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগও উঠেছে।
দুর্গাপূজার ছুটি কাটাতে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকেরা কক্সবাজার ও রাঙামাটির পাশাপাশি বান্দরবানের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ভিড় করছেন। জেলার নীলাচল, নীলগিরি, শৈলপ্রপাত, স্বর্ণমন্দির, মেঘলা, দেবতাখুম ও রেমাক্রিসহ থানচি ও রুমা উপজেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েছে। বিশেষ করে বগালেক, দার্জিলিং পাড়া, কেওক্রাডং ও সুনসং পাড়া এখন ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। এসব এলাকায় মোটরসাইকেল ও স্থানীয় চাঁদের গাড়িতে করে পর্যটকেরা যাতায়াত করছেন।
লোহাগাড়া থেকে ‘সকালবেলা এক্সারসাইজ’ নামের একটি বাইক দলের সদস্যরা ঘুরে এসেছেন সুনসং পাড়া। দলটির সভাপতি ও টিম লিডার সোহেল ইকবাল তাঁদের দুই দিনের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, লোহাগাড়ার মাশাবি রেস্তোরাঁর সামনে থেকে যাত্রা শুরু করে তাঁরা টংগাবতী সড়ক হয়ে চিম্বুক ওয়াই জংশনে পৌঁছান। সেখানে সকালের নাশতা শেষে বান্দরবানের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে রুমা উপজেলা সদরে যান। সেখান থেকে মিন্টু নামের একজন স্থানীয় গাইড তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন।
রুমা বাজারে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা ও বিজিবির রিপোর্টিং শেষে দলটি দুপুর ১টার দিকে বগালেকে পৌঁছায়। সেখানে গোসল ও দুপুরের খাবার শেষে তাঁদের গন্তব্য ছিল কেওক্রাডং হয়ে সুনসং পাড়া। পাহাড়ের দুর্গম পথ পেরিয়ে সুনসং পাড়ায় পৌঁছে তাঁরা মুগ্ধ হন প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে। তবে পাহাড়ি সড়কের খাড়া ঢাল ও বিপজ্জনক বাঁক বাইকারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
সোহেল ইকবালের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, এসব পথে চলাচলের জন্য দক্ষ বাইকার হওয়া জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় গাইডের নির্দেশনা মেনে চলা এবং সন্ধ্যার আগেই দুর্গম এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে ফিরে আসা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের দল গাইডের নির্দেশনা অনুযায়ী সন্ধ্যার আগে সুনসং পাড়া থেকে বগালেকে ফিরে রাত কাটায়।
বান্দরবানের রুমা উপজেলায় কেওক্রাডং পাহাড়ের কাছে অবস্থিত বগালেক পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। বগা লেক, বগাকাইন লেক ও ড্রাগন লেক নামেও পরিচিত এই জলাশয়টি পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য সুপরিচিত।
বগালেকের সৃষ্টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা লোককথা প্রচলিত রয়েছে। একটি লোককথা অনুযায়ী, লেকের নিচে ড্রাগনের বসবাস ছিল এবং তার অভিশাপে একটি গ্রাম ডুবে গিয়ে লেকের সৃষ্টি হয়। এ কারণেই অনেকে একে ড্রাগন লেক বলেন। অন্যদিকে, এর সৃষ্টি সম্পর্কে ভূতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ বা উল্কাপিণ্ডের আঘাতের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এসব ব্যাখ্যার কোনোটিকেই নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
পরদিন সকালে বগালেক থেকে রওনা দিয়ে দলটি রুমা বাজারে ফিরে আসে। সেখান থেকে সাঙ্গু নদীপথে নৌকায় পৌঁছায় রিজুক ঝরনায়। রুমা বাজার থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার নদীপথে অবস্থিত এই ঝরনা পাহাড়ের বুক চিরে সাঙ্গু নদীতে নেমে এসেছে। ঝরনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি সেখানে গোসল করেন পর্যটকেরা।
স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি নৌকার ভাড়া সাধারণত ৬০০ টাকা বলা হলেও গাইড ও নৌকাচালকদের যোগসাজশে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বেড়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে পর্যটকদের অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে। রিজুক ঝরনা ঘুরে রুমা বাজারে দুপুরের খাবার শেষে লোহাগাড়ার মাশাবি রেস্তোরাঁয় ফিরে তাঁদের দুই দিনের ভ্রমণ শেষ হয়।
বগালেক ও সুনসং পাড়ায় ঘুরতে আসা কয়েকজন বাইকারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুর্গম পথের কারণে স্থানীয় গাইড ছাড়া সুনসং পাড়া ভ্রমণ করা কঠিন। তবে গাইডদের কেউ কেউ থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন পর্যটকেরা।
পর্যটন মৌসুমে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব খরচের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্ধারিত ও স্বচ্ছ ভাড়া চালু করা গেলে ভ্রমণ আরও স্বস্তিদায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেওক্রাডং বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত পাহাড়ি চূড়া। বিভিন্ন পরিমাপ ও সূত্রে এর উচ্চতা নিয়ে ভিন্নতা থাকলেও পর্যটকদের কাছে এটি দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয় গন্তব্য। এর আশপাশের পাহাড়ি জনপদ সুনসং পাড়াও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্রমণপ্রেমীদের নজর কেড়েছে।
প্রকৃতি, পাহাড়ি পথ ও নিরিবিলি পরিবেশের কারণে সুনসং পাড়া এখন নতুন পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। দুর্গাপূজার ছুটিতে সেখানে পর্যটকদের উপস্থিতি বৃদ্ধিও সেই জনপ্রিয়তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যাঁরা ঢাকা বা দেশের অন্য জেলা থেকে বান্দরবান ভ্রমণে যেতে চান, তাঁরা প্রথমে বান্দরবান সদরে গিয়ে স্থানীয় পরিবহন ও প্রয়োজনীয় অনুমতির বিষয়ে খোঁজ নিতে পারেন। তবে রুমা ও আশপাশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যাওয়ার আগে চলমান নিরাপত্তা নির্দেশনা, অনুমোদিত রুট, গাইডের ব্যবস্থা এবং যাতায়াতের নিয়ম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছ থেকে সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়া জরুরি।
পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নিরাপদ ভ্রমণ, স্থানীয় মানুষের প্রতি সম্মান এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে সচেতন থাকলে বান্দরবানের এসব পর্যটনকেন্দ্র আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
The post সাজেক বন্ধ ঘোষনায় পর্যটকের ভিড় এখন বান্দরবানের সুনসং পাড়ায় appeared first on ভোরের চেতনা.
