সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার শেষ ভরসা। অসুস্থতা নিয়ে সেখানে গিয়ে একজন রোগী চান সময়মতো চিকিৎসকের দেখা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, হাসপাতালের অপরিচ্ছন্নতা, ওষুধ ও চিকিৎসা-সামগ্রীর সংকটসহ নানা অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অনিয়মের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষ, যাদের কাছে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য থাকে না।
ফলে সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনাকে কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা ভাবলে চলবে না, এটি নাগরিকের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতা এবং জনস্বার্থ রক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দায়িত্বে অবহেলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চিকিৎসাসেবার মান নিশ্চিত করার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সরকারি হাসপাতালের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা যেমন বলে আসছেন। তার প্রতিফলন হিসেবে বিভিন্ন হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শন, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি যাচাই এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তিনি স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বার্তা দিয়েছেন। তবে তার এসব পদক্ষেপকে ঘিরে চিকিৎসকদের একটি অংশের সমালোচনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে গত ১৭ অক্টোবর রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অব্যবস্থাপনা প্রত্যক্ষ করা এবং তার নির্দেশে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তের ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আগের উদ্যোগগুলোকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। একই সঙ্গে এটি সামনে এনেছে একটি মৌলিক প্রশ্নÑস্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অভিন্ন নীতিগত অবস্থানের প্রতিফলন, নাকি বিচ্ছিন্ন কিছু পদক্ষেপের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকবে? কারণ, হাসপাতাল পরিদর্শনে অনিয়ম শনাক্ত করা কিংবা তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় স্থায়ী পরিবর্তন আনা।
প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপের পর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আগের হাসপাতাল পরিদর্শন ও অনিয়মের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এর আগে গত ৭ মার্চ নরসিংদীর পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে গিয়ে নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরে ২৬ জুলাই সাতক্ষীরার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করে অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে দুই চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেন তিনি। এসব ঘটনায় তার অবস্থান ছিলÑ সরকারি দায়িত্বে অবহেলা করলে জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতসহ সংশ্লিষ্ট মহলে সমালোচনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি প্রতিমন্ত্রী তার বিভিন্ন বক্তৃতায় সরকারের নীতিনির্ধারকদের হাসপাতালে প্রবেশ করা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। অন্যদিকে চিকিৎসকদের একটি অংশের সমালোচনাকে পুরো চিকিৎসক সমাজের অবস্থান হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই বলে অনেকে মনে করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক পদক্ষেপের তাৎপর্য এখানেই, সরকারি হাসপাতালের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নটি শুধু একজন মন্ত্রীর উদ্যোগে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরকারের জবাবদিহি ও জনস্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করার বৃহত্তর প্রশ্ন।
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন উদ্যোগগুলো তার নির্দেশে নেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তবে চিকিৎসকদের মধ্যে কোনো সংগঠিত সিন্ডিকেটের কারণে এসব উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি না, তা নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করা দরকার।
তবে একটা প্রশ্ন মাথায ঘুরপাক খাচ্ছে, হাসপাতালে চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা, ওষুধ সরবরাহ ঠিক রাখা এবং রোগীদের যথাযথ সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার কতটা কার্যকর ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিতে পারে?
কারণ, হাসপাতাল পরিদর্শন কিংবা সাময়িক বরখাস্তই শেষ কথা নয়। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবেÑ সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হচ্ছে কি না, তার ওপর।
সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা দূর করা এবং চিকিৎসাসেবায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। স্বাস্থ্য খাতের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তখনই কার্যকর হবে, যখন তা ব্যক্তি বা পদনির্ভর না হয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা, নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহির ধারাবাহিক ব্যবস্থায় পরিণত হবে। কোনো চিকিৎসক বা কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নিতে হবে। চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং হাসপাতাল প্রশাসনের প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
এ ক্ষেত্রে শুধু আকস্মিক পরিদর্শন কিংবা সাময়িক বরখাস্তের মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি, রোগীদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা থাকলে তা দূর করা জরুরি। চিকিৎসকদের কোনো অংশের বিরোধিতা বা সমালোচনাকে পুরো চিকিৎসক সমাজের অবস্থান হিসেবে বিবেচনা না করে, অনিয়মের অভিযোগগুলো তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। কোনো সংগঠিত গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী মহল সংস্কার কার্যক্রমে বাধা দিচ্ছে কি না, এমন অভিযোগ থাকলেও তা অনুমাননির্ভর না রেখে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, স্বাস্থ্য খাতে সরকারের সাফল্য বিচার করতে হবে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। একজন রোগী হাসপাতালে গিয়ে সময়মতো চিকিৎসক পাচ্ছেন কি না, জরুরি বিভাগে প্রয়োজনীয় সেবা মিলছে কি না, বিনা প্রয়োজনে তাকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে কি না, কিংবা ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে কি নাÑ এসব প্রশ্নের উত্তরেই প্রকৃত অগ্রগতি প্রতিফলিত হবে। প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্যোগ এই বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী আপনাদের এই উদ্যোগ ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। বদলে যেতে পারে দীর্ঘদিন অনিয়মে জর্জরিত এই খাতটি। আপনাদের সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যথায় কয়েকটি পরিদর্শন, কিছু প্রশাসনিক নির্দেশনা এবং সাময়িক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সংবাদে আলোচনার জন্ম দিলেও স্বাস্থ্যসেবার কাক্সিক্ষত পরিবর্তন অধরাই থেকে যাবে।
অতএব, এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের পরিবর্তে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, যেখানে দায়িত্বে অবহেলার বিরুদ্ধে থাকবে দৃঢ় অবস্থান, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে থাকবে স্বচ্ছতা এবং সেবার কেন্দ্রে থাকবে রোগী। সরকারি হাসপাতালকে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনাই হওয়া উচিত এই উদ্যোগগুলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য।
