স্বামীহারা লুৎফা বেগমের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন তার ছেলে সৈয়দ মো. আল আমিন। নরসিংদীর শিবপুরের এই মায়ের স্বপ্নজুড়ে ছিল একমাত্র সন্তান। ইউরোপে উন্নত জীবনের আশায় ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল ছেলে। কিন্তু দালালদের মিথ্যা আশ্বাসে দুবাই হয়ে তাকে নেওয়া হয় লিবিয়ায়।
এরপর ছেলেকে বাঁচাতে নিজের গয়না, এমনকি নাকফুলটিও বিক্রি করেছেন মা। বিক্রি করেছেন জমিজমা, করেছেন ধারদেনা। সব মিলিয়ে খরচ করেছেন ৪২ লাখ টাকা। তবু কাটেনি দুর্ভোগ, ঘোচেনি ছেলেকে হারানোর শঙ্কা।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার পর অবশেষে আল আমিনের সন্ধান মিলেছে মিশরে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার তবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রাবারের নৌকায় যাত্রা করা ৪৬ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মধ্যে ছিলেন তিনি। ভূমধ্যসাগরে মিশরের সিদি বারানি উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের উদ্ধার করে।
গত ১১ অক্টোবর মিশরের আল-আমাইন পুলিশ স্টেশনে আল আমিনের সঙ্গে দেখা করেন কায়রোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ও শ্রম কাউন্সিলর। শ্রম কাউন্সিলরের মুঠোফোনে ছেলের সঙ্গে কথা বলে তার বেঁচে থাকার খবর পান লুৎফা বেগম। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর ছেলের জীবিত থাকার খবর পেয়ে স্বস্তি ও কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন তিনি। ধন্যবাদ জানান দূতাবাসের কর্মকর্তাদেরও।
বিজ্ঞাপন
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলতে গিয়ে লুৎফা বেগম তুলে ধরেন ছেলের ইউরোপযাত্রার স্বপ্ন, দালালদের নানা প্রতিশ্রুতি, লিবিয়ায় আটকেপড়া, অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ এবং সন্তানকে বাঁচাতে একজন মায়ের সর্বস্ব হারানোর কাহিনি।
লুৎফা বেগম জানান, মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল আমিন আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়নি। ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছেলে প্রায়ই তাকে বলত, বাংলাদেশে থাকতে চায় না; বিদেশে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চায়। প্রথমে মা ছেলেকে দেশে থেকেই পড়াশোনা শেষ করার পরামর্শ দেন। তার স্বামীও বিদেশে থাকতেন। তিনি চেয়েছিলেন, ছেলে লেখাপড়া শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াক। কিন্তু পরিচিত এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ইতালিতে যাওয়ার প্রস্তাব পাওয়ার পর আল আমিনের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
মায়ের অভিযোগ, ওই পরিচিত ব্যক্তি তাকে বোঝান, তার স্বামী অসুস্থ এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। ছেলেকে পড়াশোনা করানোর চেয়ে ইতালিতে পাঠাতে পারলে তার ভবিষ্যৎ ভালো হবে। পরিচিত লোকজনের মাধ্যমে বৈধ ভিসায় সরাসরি ইতালি পাঠানোর আশ্বাসও দেওয়া হয়। আত্মীয়তার সম্পর্ক ও পরিচিত মানুষের কথায় বিশ্বাস করে শেষ পর্যন্ত ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে রাজি হন তিনি।
বিজ্ঞাপন
লুৎফা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, ছেলেকে ইতালি পাঠানোর জন্য প্রথমে ১৬ লাখ টাকা দাবি করা হয়। এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয় জানালে ১৪ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। বাকি দুই লাখ টাকা ইতালিতে পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল। মায়ের অভিযোগ, শিপন নামের এক ব্যক্তি ছেলেকে নিরাপদে ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। তার সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ভয় না পাওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।

চুক্তি অনুযায়ী টাকা দেওয়ার পর ছেলেকে নিয়ে ঢাকার বিমানবন্দরে যান লুৎফা বেগম। কিন্তু যাত্রার সময় তাকে জানানো হয়, আল আমিনকে দুবাই হয়ে যেতে হবে। প্রথমে বিষয়টিকে স্বাভাবিক ট্রানজিট মনে করলেও পরে জানতে পারেন, ছেলেকে দুবাইয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
একপর্যায়ে আল আমিনকে লিবিয়ায় নেওয়ার কথা জানতে পেরে আপত্তি জানান তিনি। তার দাবি, লিবিয়া হয়ে ছেলেকে পাঠাতে চান না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন। সরাসরি ইতালি যাওয়ার ব্যবস্থা না হলে ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু সেই অনুরোধ উপেক্ষা করেই আল আমিনকে লিবিয়ায় নেওয়া হয় বলে অভিযোগ তার।
লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রায় এক সপ্তাহ ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি লুৎফা বেগম। পরে আল আমিন ফোন করে জানায়, তাকে লিবিয়ায় নিয়ে আসা হয়েছে। খবরটি শুনে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেন। কিন্তু শিপন আশ্বাস দিলেও ছেলেকে ফেরানোর ব্যবস্থা করেননি। একপর্যায়ে তার ফোন নম্বর ব্লক করে দেওয়া হয়।
পরে খাইরুল নামের আরেক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তিনিও আল আমিনকে নিরাপদে পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। ছেলেকে ফেরত পাওয়ার জন্য বারবার হাতজোড় করে অনুরোধ করেছিলেন বলে জানান লুৎফা বেগম। এমনকি টাকা ফেরত না পেলেও আপত্তি নেই, শুধু ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে দিতে হবে এমন আকুতিও জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার দাবি, একের পর এক আশ্বাসের পরও ছেলেকে ফেরানো হয়নি। বরং একপর্যায়ে তাকে জানানো হয়, আল আমিনকে মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ছেলেকে উদ্ধারের আশায় আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে নতুন করে যোগাযোগের চেষ্টা করেন লুৎফা বেগম। একপর্যায়ে বোনের জামাইয়ের সহায়তায় আরও টাকা জোগাড় করেন। তার দাবি, আল আমিনকে মুক্ত করার আশ্বাসে তিনি ও তার বোনের জামাই মিলে আরও ২৪ লাখ টাকা দেন। এই টাকা জোগাড় করতে নিজের গয়না বিক্রি করেন তিনি। এমনকি বিক্রি করে দেন নাকফুলটিও। পরিবারের অন্যদের না জানিয়ে মেয়ের জামাইকে সঙ্গে নিয়ে গয়না বিক্রির ব্যবস্থা করেছিলেন বলে জানান তিনি।
মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে আল আমিন ফোন করে জানায় তাকে মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং মুক্তির জন্য ২০ লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। ছেলের মুখে এমন কথা শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। তার বর্ণনা অনুযায়ী, খবরটি শোনার পর জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। একজন মা হিসেবে ছেলেকে বাঁচানোর তাগিদে নিজের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করতে দ্বিধা করেননি লুৎফা বেগম। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও ছেলেকে দেশে ফেরানোর নিশ্চয়তা পাননি।
লুৎফা বেগমের অভিযোগ, খাইরুল ও রাশেদ নামের আরও কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তিনি প্রতারিত হয়েছেন। তারা আল আমিনকে বিমানে তুলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই আশায় অপেক্ষা করছিলেন মা। কিন্তু একপর্যায়ে ছেলে ফোন করে জানায়, তাকে দেশে পাঠানোর পরিবর্তে আবারও মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ছেলেকে বাঁচানোর জন্য বারবার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। তার দাবি, সব মিলিয়ে প্রায় ৪২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। একপর্যায়ে জমিজমা বিক্রি করেও অর্থের সংস্থান করতে হয়েছে। এত টাকা খরচ করেও ছেলেকে দেশে ফেরাতে না পেরে তিনি কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েন। একদিকে সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে ঋণের বোঝা ও আর্থিক সংকট সব মিলিয়ে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে তার জীবন।
লুৎফা বেগমের বর্ণনা অনুযায়ী, লিবিয়ায় আটকে পড়ার পর আল আমিনকে উদ্ধার করা হলেও দ্রুত বাংলাদেশে ফেরানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় সেখানে থাকার পর আবারও ইউরোপে যাওয়ার প্রলোভন দেখানো হয় তাকে। তখন আল আমিনের বয়স ছিল প্রায় ১৯ বছর। বর্তমানে তার বয়স ২১ বছর। ইব্রাহিম নামের এক ব্যক্তি কম খরচে গ্রিসে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। সেখানে পৌঁছাতে পারলে কাজ করে ঋণ শোধ করা যাবে বলেও তাকে আশ্বস্ত করা হয়।
বিজ্ঞাপন
আগের যাত্রায় বিপুল অর্থ খরচ করে সর্বস্ব হারানোর পর নতুন করে টাকা দেওয়া লুৎফা বেগমের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু ছেলের বারবার অনুরোধ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আশ্বাসে শেষ পর্যন্ত মেয়ের জামাইয়ের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা ধার নেন তিনি। সেই টাকা ইব্রাহিমের দেওয়া ব্যাংক হিসাবে জমা দেন বলে দাবি তার। এরপর আবারও ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে দিনরাত উৎকণ্ঠায় কাটছিল লুৎফা বেগমের। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৭ থেকে ১৮ দিন আল আমিনের কোনো খোঁজ পাননি। ফোন বন্ধ, দালালদের সঙ্গে যোগাযোগও অনিশ্চিত। প্রতিদিন নামাজ পড়ে ছেলের নিরাপত্তার জন্য দোয়া করতেন তিনি। এরই মধ্যে ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বহনকারী একটি নৌকাডুবির খবর পান। সংবাদমাধ্যমে সেই খবর দেখে তার মনে ভয় জাগে ছেলেও কি ওই নৌকায় ছিল?
ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু তার অভিযোগ, কেউ ফোন ধরেননি, কেউ নম্বর বন্ধ করে দেন। ছেলের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানতে না পেরে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছিল তার।
দীর্ঘ উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার পর অবশেষে আল আমিনের সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি আরও ৪৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর সঙ্গে মিশরের মাতরুহ পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ২১ অক্টোবর তাদের দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হতে পারে বলেও জানান তিনি।
ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় সর্বস্ব হারানো এই মায়ের কাছে এখন অর্থসম্পদ কিংবা আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেয়ে বড় বিষয় হলো—ছেলে যেন জীবিত ও নিরাপদে দেশে ফিরে আসে। যে সন্তানকে ঘিরে ছিল তার জীবনের সব স্বপ্ন, তার ফিরে আসার অপেক্ষাতেই এখন দিন গুনছেন তিনি।
আল আমিনের ঘটনা কেবল একটি পরিবারের দুর্ভোগের কাহিনি নয়; এটি অনিরাপদ অভিবাসনের পথে প্রতারণা, মানবপাচারের ঝুঁকি এবং একটি পরিবারের সর্বস্ব হারানোর নির্মম বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি।
ইউরোপে উন্নত জীবনের আশায় অনেক তরুণ দালালদের প্রলোভনে পড়ে বিপজ্জনক পথে যাত্রা করছেন। বিভিন্ন ঘটনায় কেউ নিখোঁজ হচ্ছেন, কেউ আটক হচ্ছেন, আবার কেউ অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠছে।
আল আমিনের মায়ের উত্থাপিত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মিশরে পুলিশের হেফাজতে থাকা আল আমিনসহ অন্য বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ দ্রুত সম্পন্ন হবে এমন প্রত্যাশা তাদের পরিবারের।
ছেলেকে বাঁচাতে একজন মা নিজের গয়না বিক্রি করেছেন, নাকফুল খুলে দিয়েছেন, জমিজমা বিক্রি করেছেন, ঋণ করেছেন। এত কিছুর পরও তার চাওয়া একটাই সন্তান যেন আবার তার কাছে ফিরে আসে। ছেলেকে ফিরে পেলে হয়তো হারানো সম্পদ আর ঋণের বোঝার মধ্যেও নতুন করে বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজে পাবেন তিনি।
এমআরএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
