ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে সাতক্ষীরা শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের ৭৪.৯ শতাংশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ‘অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্র ২০২১’ গ্রহণের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এর সুফল বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনে যথাযথভাবে পৌঁছায়নি। ফলে নিরাপদ আবাসন, পর্যাপ্ত খাদ্য, কর্মসংস্থান ও সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেক পরিবার।
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকাল ১০টায় সাতক্ষীরার রয়েল গ্লাস কনভেনশন হলরুমে আয়োজিত ‘সহনশীলতার সূচনা নিজের ঘর থেকেই’ শীর্ষক বহুপক্ষীয় সংলাপে এসব তথ্য ও উদ্বেগ তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি), পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রান) এবং উন্নয়ন সংস্থা ‘স্বদেশ’ যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে। এর আগে একটি বন্যা র্যালি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে অনুষ্ঠানস্থলে এসে শেষ হয়।
সংলাপে বক্তারা বলেন, সিডর ও আইলার মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্ব হারিয়ে বহু মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে সাতক্ষীরা শহরে এসে বসবাস শুরু করেছেন। কিন্তু বাস্তুচ্যুত হওয়ার পরও তাঁদের খাদ্য, বাসস্থান ও জীবিকার নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বক্তাদের মতে, বাস্তুচ্যুতির পর খাদ্য অনিরাপত্তা কোনো সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমনের ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য ব্যর্থতার প্রতিফলন।
তাঁরা আরও বলেন, বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে শুধু আশ্রয়ের ব্যবস্থা করলেই হবে না; তাঁদের খাদ্যের অধিকার, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। ভাতা ও খাসজমি বন্দোবস্তের আশ্বাস, সংলাপে উপস্থিত সরকারি কর্মকর্তারা জানান, বস্তিতে বসবাসরত যাঁরা এখনো বয়স্ক বা বিধবা ভাতার আওতায় আসেননি, তাঁদের তালিকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিলে দ্রুত ভাতার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ছাড়া পৌরসভার বাইরের প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারগুলো আবেদন করলে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে পরিবারপ্রতি সর্বোচ্চ দুই একর পর্যন্ত কৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। সরকারি কর্মকর্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয়। যেসব বস্তিবাসী বয়স্ক বা বিধবা ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাঁদের তালিকা পাওয়ার পর ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি পৌর এলাকার বাইরের প্রকৃত ভূমিহীনদের আবেদনের ভিত্তিতে নীতিমালা অনুযায়ী কৃষি খাসজমি বন্দোবস্তের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংলাপে প্রশাসন, উন্নয়নকর্মী ও সাংবাদিকরা, উন্নয়ন সংস্থা ‘স্বদেশ’-এর নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্তের সভাপতিত্বে সংলাপটি সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট উন্নয়ন গবেষক ও সিইপিআর-এর নির্বাহী পরিচালক গৌরাঙ্গ নন্দী। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রশাসক শেখ মঈনুল ইসলাম মঈন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত, সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান, সমাজ উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান, জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. হযরত আলী এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মো. জাহিদ পারভেজ।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক ও ডেইলি স্টারের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি কল্যাণ ব্যানার্জি, এখন টেলিভিশনের আহসান রাজীব, সময় টেলিভিশনের মমতাজ আহমেদ বাপী, দক্ষিণের মশাল-এর সম্পাদক আশিক ইলাহী, বাংলা ট্রিবিউনের আসাদুজ্জামান সরদার, দৈনিক ভোরের বাণীর মো. মোকাররাম বিল্লাহ ইমনসহ স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সংলাপে উঠে আসা তথ্য ও আলোচনায় বাস্তুচ্যুত মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, নিরাপদ আবাসন, জীবিকার সুযোগ এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বক্তারা মনে করেন, দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারানো মানুষের পুনর্বাসনের পাশাপাশি তাঁদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
The post ঘরহারা সাতক্ষীরার বাস্তুচ্যুত মানুষের ৭৪.৯ শতাংশই তীব্র খাদ্য সংকটে: খানি appeared first on ভোরের চেতনা.
